নিষিদ্ধ থাকার পরও দেশের সব কটি কারাগারেই দেদার মোবাইল ফোনে কথা বলছে বন্দিরা। অপরাধী ও জঙ্গিরা কারাগারের ভেতর থেকেই তথ্য ফাঁস করে দিচ্ছে। মাসখানেক আগে প্রকাশ্যে আদালত থেকে দুই জঙ্গিকে ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে, যাদের এখন পর্যন্ত খুঁজে পায়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কীভাবে আদালত থেকে ছিনিয়ে নিতে হবে, সেই কৌশল মোবাইল ফোনে সহযোগীদের দিয়ে চূড়ান্ত করে জঙ্গিরা। এ ঘটনার পর সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কারাগারে জ্যামার আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশির ভাগ কারাগারেই জ্যামার থেকেও না থাকার মতো অবস্থা। চারটি কেন্দ্রীয় কারাগারে ৮৮টি জ্যামার থাকলেও ৭০টিই বিকল হয়ে আছে। অভিযোগ উঠেছে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জ্যামারগুলো বিকল করে রেখেছে অসাধু কারারক্ষীরা। কারা এসব অপকর্ম করছে তা বের করতে কাজ করছে গোয়েন্দারা। এ ছাড়া ওই সব জ্যামার সচল করার পাশাপাশি নতুন আরও স্থাপন করতে সম্প্রতি কারা অধিদপ্তরকে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
জানতে চাইলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কারাগারে যাতে কোনো ধরনের অনিয়ম না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি কারাগারে জ্যামার সচল রাখতে কারা অধিদপ্তরকে বলা হয়েছে। গোপনে কোনো বন্দি যাতে মোবাইলে কথা বলতে না পারে, সে জন্য নজরদারি করা হচ্ছে।’
গত ২০ নভেম্বর দুুপুরে ঢাকার সিএমএম আদালতে শুনানি শেষে প্রিজন ভ্যানে তোলার আগমুহূর্তে ফাঁসির দ-প্রাপ্ত দুই জঙ্গি মইনুল হাসান শামীম ও আবু সিদ্দিক সোহেলকে ছিনিয়ে নেন তার সহযোগী জঙ্গিরা। ছিনিয়ে নেওয়া দুই জঙ্গি ২০১৫ সালের ৩১ অক্টোবর ঢাকার শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটে জাগৃতি প্রকাশনীর মালিক ফয়সাল আরেফিন দীপন হত্যা মামলার মৃত্যুদ-প্রাপ্ত আসামি। পালিয়ে যাওয়ার পর দুই জঙ্গিকে ধরিয়ে দিতে ১০ লাখ করে ২০ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে সারা দেশে রেড এলার্ট জারি করে পুলিশ সদর দপ্তর। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় মামলার পর তদন্তের দায়িত্ব পায় পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ইউনিট। ঘটনার তদন্তে মন্ত্রণালয় ও পুলিশের পক্ষ থেকে কমিটি গঠন করা হয়। দুই কমিটিই তদন্তের একপর্যায়ে দেখতে পায় কারাগারে বসেই জঙ্গিরা মোবাইল ফোনে তাদের সহযোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলত। এ ঘটনার আগে গত বছরের জুলাই মাসে ডেসটিনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) রফিকুল আমীন কারাগারের অধীন হাসপাতাল থেকে মোবাইল ফোনে জুম মিটিংয়ে অংশ নেন। বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হওয়ার পর ব্যাপক আলোচনায় আসে। ওই ঘটনায় আট কারারক্ষীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় কারা কর্তৃপক্ষ। শুধু এ দুটি ঘটনাই নয়, প্রায়ই কারাগারে বন্দিদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। অভিযোগের পর কিছুদিন ঠিকমতো সবকিছু চললেও ধীরে ধীরে তা ফিরে যায় আগের অবস্থায়। কিন্তু ঢাকা কেন্দ্রীয় ও কাশিমপুরের চার কারাগারে শক্তিশালী জ্যামার বসানোর পরও কীভাবে বন্দিরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
কারাগার সূত্র জানায়, ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার, কাশিমপুর পার্ট-১, পার্ট-২ ও হাই সিকিউরিটি, নারায়ণগঞ্জ কেন্দ্রীয় কারাগারে কয়েক বছর আগে ৮৮টি জ্যামার বসানো হয়। ওই যন্ত্র দিয়ে মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক নিষ্ক্রিয় করা সম্ভব। কিন্তু মাত্র চার বছরের মাথায় এসব যন্ত্র্রের মধ্যে ৭০টি নষ্ট হয়ে গেছে। ১৭টি জ্যামারের মধ্যে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে ১৩টি সচল রয়েছে। কাশিমপুরের হাই সিকিউরিটি কারাগারে দুটি ও নারায়ণগঞ্জ জেলায় দুটি জ্যামার সচল রয়েছে। কিন্তু তাও নিয়মমতো ব্যবহার হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে।
কারাগারের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বর্তমান কারাগার হবে সংশোধনাগার। এমন সেøাগানের কারণে কারাগার থেকে বন্দিদের স্বজনদের সঙ্গে দুদিন পর পর কথা বলার সুযোগ দেওয়া হয়। আর ওই সময়ে বন্ধ রাখা হয় জ্যামার। আর এই সুযোগে কিছু অসাধু কারারক্ষী বন্দিদের অন্য মোবাইলে কথা বলার সুযোগ করে দেয়। অনেক বন্দি তাদের কক্ষেই মোবাইল ফোন রাখে এমন অভিযোগও রয়েছে। তারা প্রভাবশালী হওয়ার কারণে অনেক সময় তাদের কক্ষ তল্লাশি করার সাহস দেখায় না কারা কর্তৃপক্ষ। বিনিময়ে তারাও বাড়তি সুবিধা নিয়ে থাকেন। সম্প্রতি জঙ্গি ছিনতাইয়ের ঘটনায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দপ্তর থেকে দুটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। এর আগে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি প্রিজন ও কাশিমপুর কারাগারের জেল সুপারকে বদলি করা হয়।
তিনি আরও বলেন, তদন্তে দেখা গেছে জঙ্গিরা তাদের কক্ষে নিয়মিত টিভি দেখত এবং মোবাইল ফোনে কথা বলত। আদালতে হাজিরা দেওয়ার আগের দিন তারা সবকিছু অন্য বন্দির কাছে বিক্রি করে দেয়। কারাগারে মোবাইল ফোন ব্যবহার করা নিয়ে খোদ কমিটির সদস্যরাই চিন্তায় পড়ে যান। এরই মধ্যে স¦রাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাদের প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেখানে দেশের কারাগারগুলোয় মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন কিংবা ইলেকট্র্রনিক ডিভাইস ব্যবহার বন্ধ করাসহ একাধিক সুপারিশ করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের গঠিত তদন্ত কমিটি। কারাগারগুলোর জ্যামার সার্বক্ষণিক সচল রাখার পাশাপাশি কোনো আসামিই যাতে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, স্মার্টফোন কিংবা ইলেকট্র্রনিক ডিভাইস সঙ্গে রাখতে না পারে, সে ব্যাপারে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
পুলিশের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারাগারের অধিকাংশ দুর্ঘটনার সঙ্গে একশ্রেণির অসাধু কারা কর্মকর্তা-কর্মচারী, কর্তব্যরত পুলিশের কিছু সদস্য জড়িত থাকেন। বন্দি আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু পুলিশ সদস্য ওই সময় বন্দিদের মাদক, মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন অবৈধ দ্রব্য দিয়ে থাকেন বলে তারা তথ্য পেয়েছেন। কারাগারে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে অপরাধীরা তাদের সহযোগীদের আগাম তথ্য পাচার করে দিয়ে থাকে, এমন তথ্য পাওয়া গেছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারা নিরাপত্তা আধুনিকায়নের আওতায় কারাগারভিত্তিক কম্প্রিহেনসিভ মোবাইল ফোন জ্যামার বসানোর উদ্দেশ্যে একটি কমিটি করা হয়েছে। তা ছাড়া জ্যামারের টেকনিক্যাল স্পেসিফিকেশন নতুনভাবে প্রণয়নের জন্য অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শকের নেতৃত্বে আরেকটি কমিটি করা হয়েছে। উন্নতমানের জ্যামার কারাগারগুলোতে বসানো হবে। এগুলো কারা অধিদপ্তর থেকে মনিটর করা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় কারাগারেও মনিটরিং সিস্টেম থাকবে। বর্তমানে সরকারিভাবে মোবাইল ফোনে বন্দিদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলার যে নিয়ম চালু করা হয়েছে, সেটি অব্যাহত থাকবে। নির্দিষ্ট কক্ষ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্দিরা সরকারি মোবাইল ফোনে কথা বলতে পারবেন। এই কক্ষ জ্যামারের আওতামুক্ত থাকবে।
