কথা ছিল বাসের ছাদে চড়ে শহর প্রদক্ষিণ করবেন। দেশের মানুষের সামনে নিজের চেষ্টায় নিয়ে আসা ট্রফিটা তুলে ধরবেন। রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে রোদের আলোয় সোনালি ট্রফির আলো বিচ্ছুরণ ছড়াবে পুরো ওবেলিস্ক স্কয়ার জুড়ে। কিন্তু কিসের কি! এসবের কিছুই হয়নি। আর্জেন্টিনার স্মরণীয় সেরা ও বড় সমাগমের চাপে সব কিছু গেল ভেস্তে। আর্জেন্টিনা ফুটবল দলের বেস ক্যাম্প থেকে বুয়েনস এইরেস শহরের মোট ৩০ কিলোমিটার ঘুরে ওবেলিস্ক স্কয়ারে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু মানুষের ভিড়ে সেই বাস ৫ ঘণ্টায় ১০ কিলোমিটারও এগোতে পারেনি। মানুষের এমন চাপে শেষে পরিকল্পনা বাতিল করতে হয়েছে আর্জেন্টিনা পুলিশকে। মেসিদের বাস থেকে নামিয়ে হেলিকপ্টারে করে ওবিলিস্ক স্কয়ারে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আকাশ থেকে আকাশি সমুদ্র দেখেছেন মেসি। আশা অপূর্ণ থেকে গেল সমর্থকদের। মেসি এবং তার হাতে বিশ্বকাপ ট্রফি সামনে থেকে দেখার বদলে দূর থেকে মরীচিকার মতো দেখেই দুধের স্বাদ ঘোল মেটাতে হয়েছে।
একদিক থেকে ব্যাপারটি অন্যরকম। ক্যারিয়ারের সবকিছু জেতার পর মেসি যখন বিশ্বকাপও জিতলেন, বাকিদের সঙ্গে তার তুলনাই চলে না। এক রকম সবার ওপরে, ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন এই কিংবদন্তি। কাল আর্জেন্টিনায় এর প্রতীকী মঞ্চায়ন হলো যেন! মেসি কারও কাছে নন, দূর আকাশে সবার ওপরে। মঙ্গলবার দেশে ফিরে রাতে বিমানবন্দর থেকে জাতীয় দলের ক্যাম্পে যাওয়ার পথেও ছোটখাটো হুড খোলা বাসে সফর হয়েছিল মেসিদের। মূল আয়োজন তৈরি ছিল দিনের জন্য। সকালে ঘুম থেকে উঠে তৈরি হয়ে বাসে উঠেছিলেন মেসিরা। পরিকল্পনা ছিল পুরো শহর প্রদক্ষিণ করবেন। কিন্তু ৫ ঘণ্টা জুড়েই ও ৫ কিলোমিটার পার হতে পারেনি তাদের বহন করা বাস। এর ওপর এক রাস্তায় ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় আর্জেন্টিনার পাগুলে সমর্থকরা অবাক কা- করে বসেন। ফ্লাইওভার থেকে দুজন লাফিয়ে পড়েন বাসে। একজন বাসের দোতলায় নিজেকে ফেলতে সক্ষম হলেও আরেকজন পাশ দিয়ে নিচে পড়েন জনসমুদ্রের ওপর। এরপর আরও কিছু মানুষ বাসের পেছন দিয়ে ছাদে ওঠার চেষ্টা করেন। অবস্থা বেগতিক দেখে বাস সফর থামিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় আর্জেন্টিনা পুলিশ।
দেশটির সরকারি মুখপাত্র গ্যাব্রিয়েলা সেরুত্তি বলেন, ‘এত মানুষ ছিল যে বাস দিয়ে ওবিলিস্ক স্কয়ার পর্যন্ত পুরোটা রাস্তা কভার করা সম্ভব নয়। তাই আমরা রাস্তা দিয়ে ওবিলিস্ক স্কয়ারে যাওয়ার চিন্তাটা বাদ দিই।’ সরকারিভাবে জানানো হচ্ছে ৫ থেকে ৬ মিলিয়ন লোক বুয়েনস এইরেসের পুরো অংশজুড়ে বিস্তৃত ছিলেন। আরেক জায়গায় বলা হয়েছে ৪ মিলিয়ন (৪০ লাখ)। আর্জেন্টিনার সেমিফাইনাল প্রতিপক্ষ ক্রোয়েশিয়ার মোট জনসংখ্যাই ৪০ লাখ। মেসিদের যেই কেন্দ্রে যাওয়ার কথা সেই ওবিলিস্ক স্কয়ারের স্বাধীনতা স্তম্ভের এলাকার অবস্থা ছিল আরও করুণ। মানুষের জন্য সেখানে তিল ধারণের অবস্থা নেই। এর মধ্যে রাস্তার ল্যাম্প পোস্ট, বাড়ির রেলিং, বাসের জন্য যাত্রী ছাউনি বেয়ে ওপরে উঠে যায় মানুষ। এমনকি স্বাধীনতা স্তম্ভের একেবারে ওপর পর্যন্ত কীভাবে যেন চলে যান কিছু সমর্থক। এমন পাগুলে সমর্থকদের ভিড় ঠেলে তাই বাস আর এগোতে পারেনি। একটা সময় পর বাস বন্ধ করে দিয়ে মেসিদের ভিন্ন পথে কোনো একটি প্রাইভেট এরিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে মেসি, কোচ লিওনেল স্কালোনি, রদ্রিগো ডি পল ও এনজো পেরেজকে হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়া হয় শহর প্রদক্ষিণে। ওবিলিস্ক স্কয়ারের ওপর দিয়ে তাদের ঘুরিয়ে এনেই শেষ হয় বিশ্বকাপ ট্রফি ট্যুর উদযাপন। এরপর মেসি ও ডি মারিয়া আরেকটি হেলিকপ্টারযোগে নিজের শহর রোসারিওতে গিয়েছেন বলে জানা গেছে।
মেসিদের খুব কাছে দেখতে না পেরে হতাশা কাজ করেছে সমর্থকদের। তবে এই ভিড়ের জন্যই তারা পরিস্থিতি মেনে নিয়েছেন। পাওলো জাত্তেরা নামের ৪৩ বছর বয়সী এক সমর্থক এই উৎসবের অংশ হতে পেরেই খুশি। নিজের ৬ বছর বয়সে ডিয়েগো ম্যারাডোনার এনে দেওয়া বিশ্বকাপ উৎসব দেখেছিলেন তিনি, ‘আমি এই উৎসবের অংশ হতে পেরেই খুশি। আমি খুব ছোট থাকতে আর্জেন্টিনার দ্বিতীয় বিশ্বকাপ জয়ের অংশ ছিলাম। তখন কিছুই বুঝতাম না ফুটবলের ব্যাপারে। তবে আজ আমি জানি আর্জেন্টিনায় ফুটবল কী। তাই আমি মেসিকে দূর থেকে দেখছি না সামনে, কাপটা দেখতে পারছি কি না এসব কোনো মানে রাখে না। আমি এই উৎসবের অংশ হতে পেরেছি এটাই বড় কথা।’
