ডাক্তার ফজলে রাব্বি ছিলেন সেই বিরল মানুষদের অন্যতম পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে যিনি শত্রু-মিত্র বিভেদ করেননি। বিপদ আছে জেনেও তিনি যেমন বৈরী পরিবেশে রোগী দেখতে গেছেন তেমনি মুক্তিযোদ্ধাদের সর্বাত্মক সাহায্য করার জন্য আত্মগোপনও করেননি। মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে তিনি হেঁটেছেন ক্ষুরের ধারালো প্রান্তের ওপর দিয়ে। লিখেছেন আনোয়ার হোসেন
১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১। বাংলাদেশ শত্রুমুক্ত হয়েছে। চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত হয়েছে। একাত্তরের দিনগুলি বইয়ের ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১ শিরোনামে জাহানারা ইমাম লিখেছেন, আজও ভোরে বাসায় স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা তোলা হলো।...২৫ মার্চ যে ফ্ল্যাগপোলটায় বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে আবার নামিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছিলাম, সেই ফ্ল্যাগপোলটাতেই আজ আবার সেদিনের সেই পতাকাটাই তুললাম। ... আত্মীয়-বন্ধু ও পরিচিতজন কত যে আসছে সকাল থেকে স্রোতের মতো। তাদের মুখে শুনছি রমনা রেসকোর্সে সারেন্ডারের কথা, দলে দলে মুক্তিযোদ্ধাদের ঢাকায় আসার কথা, ইন্ডিয়ান আর্মির কথা, লোকজনের বিজয়োল্লাসের কথা। এরই মধ্যে রক্ত-হিম করা একটা কথা শুনছি। মুনীর স্যার, মোফাজ্জল হায়দার স্যার, ডা. রাব্বি, ডা. আলিম চৌধুরী, শহীদুল্লা কায়সার এবং অনেকেরই খোঁজ নেই।...’ জাহানারা ইমামের কাছে সেদিন যা ছিল আশঙ্কার কথা আজ তা আমরা নিশ্চিতভাবে জানি, বিজয়ের ঠিক পূর্ব মূহূর্তে এ দেশের কৃতী সন্তানদের বাসা থেকে তুলে নিয়ে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। এদের প্রত্যেকেই নিজেদের পরিণতি কী হতে পারে তা জানতেন, জেনে-শুনে-বুঝেই তারা দেশসেবার এ পথে পা বাড়িয়েছিলেন। প্রথিতযশা চিকিৎসক ডা. ফজলে রাব্বিও তার ব্যতিক্রম নন।
ফজলে রাব্বি ১৯৩২ সালে পাবনার হেমায়েতপুরে জন্মগ্রহণ করেন। কৃতিত্বের সঙ্গে ম্যাট্রিক ও ইন্টারমিডিয়েট পাস করার পর তিনি ১৯৫০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে এমবিবিএসে ভর্তি হন। এমবিবিএস ফাইনালে শীর্ষস্থান অধিকার করে স্বর্ণপদক লাভ করেন। ১৯৫০-৫৫ সাল পর্যন্ত ছাত্র থাকাকালে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে প্রসেক্টর হয়েছিলেন, সমগ্র পাকিস্তানে শীর্ষস্থান দখল করেছিলেন। অ্যাকাডেমিক পড়াশোনায় প্রচ- মেধাবী ডা. ফজলে রাব্বি ঢাকা মেডিকেলে অধ্যয়নকালে যোগ দিয়েছিলেন ভাষা আন্দোলনেও। প্রগতিশীল মানুষ হিসেবে মেডিকেলের সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের অগ্রভাগেই ছিলেন সর্বদা। চমৎকার বক্তৃতা ও কবিতা আবৃত্তি করতেন। বই পেলে ভুলে যেতেন সবকিছু। ডা. ফজলে রাব্বি ছিলেন ঢাকা মেডিকেলের এমবিবিএস চূড়ান্ত পরীক্ষায় সমগ্র পাকিস্তানে শীর্ষস্থান অধিকারী ছাত্র। মাত্র ৩০ বছর বয়সে লন্ডনের রয়্যাল কলেজ অব ফিজিশিয়ান থেকে দু-দুটি এমআরসিপি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। দেশে ফিরে যোগ দিয়েছিলেন ঢাকা মেডিকেল কলেজের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে।

রাজনীতি সচেতন মানুষ ফজলে রাব্বি শুধু চিকিৎসাশাস্ত্রেরই পাঠদান করতেন না শিক্ষার্থীদের, তাদের বুকে বুনে দিতেন দেশপ্রেম আর মুক্তচিন্তার বীজ। ১৯৭০ সালে ডা. ফজলে রাব্বি মনোনীত হন পাকিস্তানের সেরা অধ্যাপক হিসেবে। এত অল্পবয়সে এই স্বীকৃতি পাওয়ার ইতিহাস আর নেই। কিন্তু পূর্বপাকিস্তানের মানুষের প্রতি বৈষম্যকারী পাকিস্তানি শাসকদের এই পুরস্কার তিনি প্রত্যাখ্যান করেন।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ডা. ফজলে রাব্বি আহত মানুষের সেবা করেছেন অকাতরে। আহত মুক্তিযোদ্ধাদের পরিচয় গোপন রেখে চিকিৎসা করতেন, দিতেন প্রয়োজনীয় ওষুধ ও অর্থ সহায়তা। সাহায্যের জন্য মুক্তিযোদ্ধারা যেমন তার কাছে আসত তিনিও তেমনি নিজে গাড়ি চালিয়ে ওষুধ ও অর্থ পৌঁছে দিতেন। দেশকে ভালোবেসে মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্য করলেও অবাঙালিদের প্রতি কোনো বিদ্বেষভাব পোষণ করতেন না। ১৫ ডিসেম্বর সকালেও তিনি এক অবাঙালিকে চিকিৎসাসেবা দিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পুরান ঢাকায় যান। দুপুরে খাওয়া-দাওয়ার পর অন্য লেখক, শিক্ষক, চিকিৎসকদের নিখোঁজ সংবাদের কথা উল্লেখ করে তার স্ত্রী জাহানারা রাব্বি কয়েকদিনের জন্য আত্মগোপনের কথা বললে তিনি বলেন, ছেলেরা (মুক্তিযোদ্ধারা) এসে যদি ফিরে যায়? যুদ্ধাহত কোনো মুক্তিযোদ্ধা জরুরি প্রয়োজনে এসে যদি তাকে না পায় এই আশঙ্কায় তিনি আত্মগোপন করেননি, নিজের জীবন বাঁচানোর চেষ্টা করেননি।
সেদিন ৪টার সময় তাকে নিতে এসেছিল কিন্তু তার ছেলেরা না, কাদালেপা মাইক্রোবাসে অচেনা ছেলেরা। ১৮ ডিসেম্বর রায়েরবাজার বধ্যভূমিতে অসংখ্য মৃতদেহের মধ্যে পাওয়া যায় দেহ, বাঁ দিকে গালের হাড়ে এবং কপালের বাঁ পাশে বুলেটের চিহ্ন। সারা বুকে অজস্র বুলেটের নিশানা। মরদেহটির দুই চোখ উপড়ানো। সমগ্র শরীরজুড়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে আঘাতের চিহ্ন। দু-হাত পেছনে গামছা দিয়ে বাঁধা, আর লুঙ্গি উরুর ওপর আটকানো। হৃদপি- আর কলিজা ছিঁড়ে ফেলেছে আলবদর ও হানাদাররা। কার্ডিওলজির চিকিৎসক ছিলেন বলে পাকিস্তানিরা তার হৃৎপি- ছিঁড়ে ফেলেছে। শত্রুকেও যিনি চিকিৎসাসেবা দিয়ে পেশাদারি দায়িত্ব পালন করেছেন তার সঙ্গে এমনই পৈশাচিক আচরণ করেছে আলবদর ও হানাদাররা। পেশাদারিত্ব ও দেশপ্রেমের চরম পরাকাষ্ঠার মূর্তপ্রতীক ডা. ফজলে রাব্বি আজীবন আমাদের অনুপ্রেরণার শিখা অনির্বাণ হয়ে থাকবেন।
