আয়োজনে অনন্য মরুর বিশ্বকাপ

আপডেট : ২৩ ডিসেম্বর ২০২২, ০৫:৫০ এএম

১৮ ডিসেম্বর ছিল স্বপ্নের এক রাত। দোহার লুসাইল আইকনিক স্টেডিয়ামে অনেক নাটকের পর কাক্সিক্ষত বিশ্বকাপ উঠেছে আর্জেন্টিনার মহানায়ক লিওনেল মেসির হাতে। গতবারের চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে টাইব্রেকারে হারিয়ে আর্জেন্টাইনদের শেষটা হয়েছে সোনায় মোড়ানো। এমন একটা শেষের প্রত্যাশাই ছিল আয়োজক কাতারের। নইলে যে এতদিনের সব চেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যেত। অনেক বিতর্ক, অনেক সমালোচনা সয়ে মরুর ধু ধু প্রান্তরে ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ আয়োজন করে বিশ্বকে চমকে দিয়েছে তারা। বিশ্বকাপের মতো মহাযজ্ঞের সফল আয়োজনে সব বিতর্ক, সমালোচনা উড়িয়ে দিয়েছে কাতার। আয়োজনে বলুন, আর মাঠের খেলা নির্দ্বিধায় বলা যায় মরুর বিশ্বকাপ অনন্য।

ফুটবলের সর্বোচ্চ সংস্থা ফিফার শীর্ষ কর্তাদের ভজিয়ে হোক, কিংবা পেট্রো ডলারের জোরে, ২০১০ সালে কাতার ঠিকই আয়োজক স্বত্ব জিতে নিয়েছিল বিশ্বকাপের। ২০১০-এর দোহা আর এখনকার দোহার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে ধু ধু মরুভূমিতে ডলারের বন্যা বইয়ে দিয়েছিল কাতার। দোহায় প্রায় ২৬ বছর ধরে বাস করেন বাংলাদেশের আব্দুর সাত্তার। পেশায় উবার চালক। তার কাছ থেকে জেনেছিলাম নতুন দোহার গড়ে ওঠার গল্প, ‘দোহা শহরে তেমন কিছু ছিল না ১০ বছর আগেও। সাগরতীরে শহরতলি মিশেররেবের যেখানে হাজার হাজার মানুষ দেখতে পেয়েছেন, সেখানে একটা সময় ছিল টিন-কাঠের বিপণি বিতান। অথচ বিশ্বকাপ আয়োজক হওয়ার পরেই বিশাল কর্মযজ্ঞ হাতে নেয় সরকার। দোহার প্রতিটি প্রান্তে কাজ হয়েছে। এই যে এত বড় বড় রাস্তাঘাট, সুউচ্চ দালান-কোঠা, আধুনিক হোটেল, শপিং মল, অফিস-আদালত দেখছেন, তার কিছুই ছিল না। বিশ্বকাপের জন্য এরা আসলে অসম্ভবকে সম্ভব করেছে।’

পশ্চিমা গণমাধ্যমগুলো শুরু থেকেই পেছনে লেগেছিল কাতারের। বিশেষ করে প্রবাসী শ্রমিকদের মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগটা ফলাও করে প্রচার করেছে। তাছাড়া রক্ষণশীল কাতার ফুটবল পর্যটকদের জন্য সুবিধের হবে না বলেও নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করে গেছে। তবে যতটা তারা বলেছে, ততটা হয়নি। ঠিকই ফুটবল আনন্দে মাততে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে এসেছে মানুষ। সংখ্যাটা প্রত্যাশা অনুযায়ী না হলেও আফসোস নেই আয়োজকদের। দুই লাতিন পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল এই বিশ্বকাপ নিজেদের করে নিয়েছিল। এটা ঠিক মিডিয়ার অপপ্রচারের কারণে ইউরোপিয়ানদের উপস্থিতি ছিল কম। পশ্চিমাদের বেশিরভাগই আস্তানা গেড়েছিল পাশের দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতে। সেখানে সব কিছু সহজলভ্য ছিল বলেই তারা সেখান থেকে বিমানে যাতায়াত করে খেলা দেখেছেন। তবে লাতিনরা দোহায় থেকেই উপভোগ করেছে বিশ্বকাপ। বিশেষ করে আর্জেন্টাইনরা। দলের পুরো অভিযানেই হাজার হাজার আর্জেন্টাইন গলা ফাটিয়েছেন স্টেডিয়ামের ভেতর, বাহির থেকে সবখানে। আটটি স্টেডিয়াম তো ছিলই। উৎসবের প্রাণকেন্দ্রে রূপ নিয়েছিল নতুন গড়ে ওঠা মেট্রো স্টেশনগুলো। এছাড়া সাগরতীরে বেশ কিছু ফ্যানজোন মাতিয়ে রেখেছে দেশ-বিদেশ থেকে আসা ফুটবল পর্যটকরা। ম্যাচের দিনগুলোতে গ্যালারির চেয়েও বেশি সমাগম ছিল বাইরে। হাজার হাজার মানুষ শেষ মুহূর্তে টিকিট পাওয়ার আশায় ভিড় জমিয়েছিল স্টেডিয়ামের বাইরে।  সেটা না মিললেও ভিড়েই নেচে-গেয়ে বড় স্ক্রিনে খেলা দেখে উৎসবে যোগ দিয়েছে অনেকে।

সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিশ্বকাপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। শেষ দিন পর্যন্ত নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ ছিল না কারও। মানুষ নির্বিঘেœ যেখান মন চায় সেখানে যেতে পেরেছেন। নিরাপত্তা বিভাগের শীর্ষ এক কর্মকর্তা জায়েদ আল কাওয়ারি ফাইনালের দিন বলেছিলেন, ‘শুরুতেই নিরাপত্তার একটা মহাপরিকল্পনা করা হয়। সেভাবেই ধাপে ধাপে এগিয়েছি। আজ (১৮ ডিসেম্বর) আমাদের স্বাধীনতা দিবস। এ দিনটায় এমনিতেই মানুষের সমাগম বেড়ে যায় শহরে। তার ওপর বিশ্বকাপের ফাইনাল। আমাদের সর্বোচ্চ সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে হয়েছে। এই বিশ্বকাপের জন্য পার্শ্ববর্তী অনেক দেশ থেকে আমরা লোক নিয়োগ দিয়েছি নিরাপত্তা বিভাগে। আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে কোথাও কোনো প্রশ্ন ওঠেনি। এটা অনেক বড় প্রাপ্তি।’

তারপরও কিছু কিছু ঘাটতি মন ভরাতে পারেনি পশ্চিমা মিডিয়াকে। বিশেষ করে অ্যালকোহলে নিষেধাজ্ঞা ও ব্যয়বহুল আবাসন নিয়ে তাদের প্রশ্ন ছিল। তবে ঘাটতি যা কিছু ছিল তা পুশিয়ে দিয়েছে মাঠের খেলা। বিশেষ করে এটাকে নিজের বিশ্বকাপে রূপ দিয়ে আয়োজন সফল করতে বড় ভূমিকা রাখেন মেসি। অসামান্য ফুটবলে সবাইকে মাঠমুখী হতে বাধ্য করেছিলেন বাঁ পায়ের জাদুকর। ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের প্রধান আর্সেন ওয়েঙ্গারের কথায়, ‘মেসিই সুরটা বেঁধে দিয়েছিল বিশ্বকাপের।’ শেষটাও নিজের মতো রাঙিয়েছেন শতাব্দীর সেরা ফুটবলার। আসর সার্থক করতে বড় ভূমিকা রেখেছেন ফরাসি তারকা কিলিয়েন এমবাপ্পেরও। তাই অনেক বিতর্ক সত্ত্বেও বিশ্বকাপ আয়োজনে লেটার মার্কস পেয়ে যাচ্ছে কাতার। যা তাদের দেখাচ্ছে অলিম্পিক আয়োজনের মতো বড় স্বপ্ন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত