১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হওয়ার পর ঢাকায় মুসলিম লীগের রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ করতেন মওলানা মোহাম্মদ আকরম খাঁ ও খাজা নাজিমুদ্দিন। হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী-আবুল হাশেমের নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক মুসলিম লীগের উদারপন্থি নেতারা অবহেলিত হয়ে পড়তে থাকেন। অবহেলিত অংশের নেতারা পুরান ঢাকার ১৫০ নম্বর মোগলটুলীর ছোট্ট একটি বাড়িতে কিছু কর্মী নিয়ে বসতে শুরু করেন। কলকাতা থেকে ঢাকায় এসে শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা করেন ছাত্রলীগ।
এ তথ্য দেশ রূপান্তরকে জানান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাগ্নে জাতীয় পার্টির (জেপি) চেয়ারম্যান শেখ শহীদুল ইসলাম।
আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদ সদস্য তোফায়েল আহমেদ তার একটি লেখায় বলেন, ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয়। কেন ২৩ জুন? এ সম্পর্কে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতারা ২৩ জুন ইতিহাস থেকে বেছে নেন। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর আম্রকাননে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। তাই ২৩ জুনকে বেছে নেওয়া হয়।
শেখ শহীদুল ইসলাম বলেন, আওয়ামী মুসলিম লীগ নামে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার ছয় বছরের মাথায় ১৯৫৫ সালে মুসলিম শব্দটি বাদ দেওয়া হয়। অসাম্প্রদায়িক চেতনায় জন্ম নেওয়া দলটিকে সাম্প্রদায়িক খোলস থেকে বের করে আনতেই বাদ দেওয়া হয় মুসলিম শব্দটি।
মোগলটুলীর বাড়ি থেকে কোথাও স্থান না পেয়ে ঢাকার রোজ গার্ডেনে আওয়ামী মুসলিম লীগের জন্ম হয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে। এ সম্পর্কে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ গ্রন্থে বঙ্গবন্ধু লিখেছেন, সকলে একমত হয়ে নতুন রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান গঠন করলেন; তার নাম দেওয়া হলো আওয়ামী মুসলিম লীগ। মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী সভাপতি, জনাব শামসুল হক সাধারণ সম্পাদক এবং আমাকে করা হল জয়েন্ট সেক্রেটারি। খবরের কাগজে দেখলাম, আমার নামের পাশে লেখা আছে ‘নিরাপত্তা বন্দী’ (পৃষ্ঠা : ১২০-১২১)।
শেখ শহীদুল জানান, রোজ গার্ডেন, পুরান ঢাকার ৯১ নবাবপুর, ১১২ কাকরাইল সার্কিট হাউজ রোড থেকে ১৯৮২ সালে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের স্থায়ী কার্যালয় হয়। এ কার্যালয় থেকেই দেশের অন্যতম প্রাচীন রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ পরিচালিত হচ্ছে সভাপতি শেখ হাসিনার নেতৃত্বে।
প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই বিভিন্ন বাঁকে আওয়ামী লীগের পথ চলতে হয়েছে। পাকিস্তানের অংশ থেকে জন্ম নেওয়া দলটি বাংলাদেশ বিনির্মাণ করছে। দেশের প্রতিটি অর্জনে লড়াই-সংগ্রাম করতে হয়েছে আজকের আওয়ামী লীগকেই।
তোফায়েল আহমেদ লেখেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর বঙ্গবন্ধু হৃদয় দিয়ে উপলব্ধি করেন, ‘এই পাকিস্তান বাঙালিদের জন্য হয় নাই। একদিন বাংলার ভাগ্যনিয়ন্ত্রক বাঙালিদেরই হতে হবে।’ গণবিচ্ছিন্ন নেতৃত্বের স্থলে জনসম্পৃক্ত নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ৪৭-এর শেষে বঙ্গবন্ধু সতীর্থ-সহযোদ্ধাদের নিয়ে ১৫০ নম্বর মোগলটুলীতে ‘ওয়ার্কার্স ক্যাম্প’ সংগঠিত করেন এবং ৪৮-এর ৪ জানুয়ারি ‘ছাত্রলীগ’ প্রতিষ্ঠা করেন। একই বছরের ১১ মার্চ বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ছাত্রলীগের উদ্যোগে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে সফল ধর্মঘটের মাধ্যমে সূচিত হয় রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন।
গবেষক-লেখক মহিউদ্দিন আহমদ একটি লেখায় বলেছেন, ‘১৯৫২ সালে আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক শামসুল হক অসুস্থ হয়ে পড়লে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পান জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পরের বছর ঢাকার মুকুল সিনেমা হলে পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী মুসলিম লীগের সাধারণ সম্মেলনে তাকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে ১৯৫৭ সালে দলটিতে ভাঙন দেখা দেয়।’
তবে আওয়ামী লীগের পুরনো নেতাদের সঙ্গে কথা বলে প্রথম ভারপ্রাপ্ত হওয়ার সময় একটি অপ্রীতিকর ঘটনা জানা যায়। তৈরি হয়েছিল তুমুল উত্তেজনা। ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক ইস্যুতে ঢাকা গ্রুপ ও কলকাতা গ্রুপ দুটি দলে বিভক্ত হয়। ঢাকা গ্রুপে নেতৃত্বে ছিলেন আবদুস সালাম খান-শামসুল হকসহ অনেকে। তারা বঙ্গবন্ধুকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক দায়িত্ব দেওয়ার বিরোধিতা করেন। অন্যদিকে সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে কলকাতা গ্রুপটি বঙ্গবন্ধুকে দায়িত্ব দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়। উভয় গ্রুপ একমত না হওয়ায় একটি কার্যনির্বাহী সংসদের জরুরি সভা ডাকা হয়। সেখানে শামসুল হক অসংলগ্ন বক্তব্য দিতে শুরু করলে তার অপ্রকৃতিস্থ আচরণ টের পেয়ে উভয়পক্ষই বঙ্গবন্ধুকে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিতে সম্মত হয়।
মহিউদ্দিন আহমদ তার লেখায় বলেন, ‘তখন আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের সরকারে। সে সময় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পাকিস্তানের কয়েকটি সামরিক চুক্তি হয়। সিয়াটো ও সেন্টো সামরিক জোটে পাকিস্তান সদস্য ছিল।’
মওলানা ভাসানী এবং দলের মধ্যে থাকা বামপন্থিরা চাপ দিচ্ছিলেন যাতে আওয়ামী লীগ মার্কিন সামরিক জোট থেকে বেরিয়ে আসে। সোহরাওয়ার্দীকে মার্কিন চুক্তির সমর্থক বলে মনে করা হতো। পাকিস্তান-মার্কিন সামরিক চুক্তি বাতিলের দাবি করছিলেন মওলানা ভাসানী; কিন্তু তাতে রাজি হননি প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দী।
বিরোধের একপর্যায়ে টাঙ্গাইলের কাগমারিতে দলের যে সম্মেলন হয়, সেখানে মওলানা ভাসানীর প্রস্তাব ভোটাভুটিতে হেরে যায়। ১৮ মার্চ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগ করেন মওলানা ভাসানী।
ওই বছর ২৫ জুলাই ভাসানী ঢাকার রূপমহল সিনেমা হলে ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) গঠন করেন। আওয়ামী লীগ থেকে বেরিয়ে অনেক নেতা তার নতুন দলে যোগ দেন, যাদের মধ্যে ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ইয়ার মোহাম্মদ খানও।
তখন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হন মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে থাকেন শেখ মুজিবুর রহমান।
১৯৬৪ সালে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর মৃত্যুর পর আওয়ামী লীগকে আবার পুনর্গঠিত করা হয়।
লেখক মহিউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘১৯৬৪ সালের কাউন্সিল সভায় মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশকে পুরোপুরি সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। শেখ মুজিবুর রহমান সাধারণ সম্পাদক থেকে যান।’
কিন্তু ১৯৬৬ সালে ছয় দফা কর্মসূচি ঘোষণা করার পর মাওলানা তর্কবাগীশসহ অনেকেই তার বিরোধিতা করেন।
ওই বছর মার্চ মাসে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল মিটিংয়ে শেখ মুজিবুর রহমান প্রথম আওয়ামী লীগের সভাপতি নির্বাচিত হন। সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন তাজউদ্দীন আহমদ। ছয় দফার বিরোধিতা করে অনেকেই আওয়ামী লীগ ছেড়ে চলে যান।
ছয় দফার পক্ষে অবস্থান নিয়ে পূর্ব বাংলা সফর করে সমর্থন আদায় করেন বঙ্গবন্ধু। সেই পথ ধরেই ধীরে ধীরে মুক্তিসংগ্রামের প্রস্তুতি নিতে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ। এ পথেই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে (পরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) মুক্তিপাগল জনতার সামনে স্বাধীনতার ডাক দেন তিনি। তার আগে ১৯৬৬ সালে আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবিতে বঙ্গবন্ধুর ছয় দফাকে ‘স্বাধীনতা অর্জনের মাইলফলক’ আখ্যা দেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ পূর্ব পাকিস্তানের জনপ্রিয় দলে পরিণত হয়। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে জেলে নেওয়াসহ পশ্চিম পাকিস্তান সরকারের অন্যায় অত্যাচারে বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগ জনপ্রিয়তার শীর্ষে পৌঁছায়। সত্তর সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিপুল বিজয় লাভ করে।
বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ তোফায়েল আহমেদ বলেন, ৫৩-এর ১৪ নভেম্বর ময়মনসিংহে অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগের বিশেষ কাউন্সিলে ২১ দফার ভিত্তিতে যুক্তফ্রন্ট গঠনের সিদ্ধান্ত হয়। ৫৪-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ‘যুক্তফ্রন্ট’ ভূমিধস বিজয় অর্জন করে এবং যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভার সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে বঙ্গবন্ধু ১৫ মে সমবায়, ঋণ ও গ্রামীণ পুনর্গঠনবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। তিনি বলেন, কিন্তু কায়েমি স্বার্থবাদী গোষ্ঠী অন্যায়ভাবে ৯২-ক ধারা জারি করে যুক্তফ্রন্ট সরকারকে বরখাস্ত ও বঙ্গবন্ধুকে কারারুদ্ধ করে।
তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, ৫৫-এর ২১, ২২ ও ২৩ অক্টোবর অনুষ্ঠিত কাউন্সিলে দলের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি প্রত্যাহার করে আওয়ামী লীগ সব ধর্মের মানুষের এবং অসাম্প্রদায়িক-গণতান্ত্রিক দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ৫৬- তে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে বঙ্গবন্ধু বাণিজ্য, শ্রম ও শিল্পমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। ৫৭-এর ৮ আগস্ট মন্ত্রিত্ব ত্যাগ করে দলের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব গ্রহণ করে বঙ্গবন্ধু ইতিহাস তৈরি করেন। তার কাছে দলের দায়িত্ব মন্ত্রিত্বের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
তোফায়েল আহমেদ বলেন, ৬৬-তে ছয় দফা দেওয়ার পর বঙ্গবন্ধু আমাদের বলতেন, ‘সাঁকো দিলাম, এই সাঁকো দিয়েই একদিন আমরা স্বাধীনতায় পৌঁছাব।’
শোষিত-বঞ্চিত মানুষের পাশে থেকে সারাজীবন সংগ্রাম করেছেন বঙ্গবন্ধু। স্বাধীনতার সাড়ে তিন বছরের মাথায় এদেশীয় মুষ্টিমেয় কুলাঙ্গার বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে। দেশে নেমে আসে, আওয়ামী লীগে নেমে আসে অমানিষার অন্ধকার। ১৯৭৫-পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ আবার দ্বিধাবিভক্ত হয়ে পড়ে। ১৯৮১ সালে দলের নেতৃত্ব নিয়ে দেশে ফিরে আসেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগকে ঐক্যবদ্ধ করেন। ছন্দপতন থেকে আওয়ামী লীগকে তুলে আনেন ছন্দে। এখন আওয়ামী লীগের কোটি কোটি কর্মী-সমর্থকের ভেতরে সভাপতি পদে বিকল্পহীন তিনি। শুধু তাই নয়, দক্ষ-সফল রাষ্ট্রনায়ক হিসেবেও খ্যাতি রয়েছে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার।
দলের দায়িত্ব হাতে নেওয়ার পর সভাপতি পদ ছাড়তে বহুবার উদ্যোগ নিয়েছেন তিনি। কিন্তু তাকে ছাড়তে চান না একজন নেতাকর্মীও। ১৯৮১ সালে সভাপতি হওয়ার পর নয়টি সম্মেলন হয়েছে। সাধারণ সম্পাদক পদে পরিবর্তন থাকলেও সভাপতি পদে নেতাকর্মীরা তার বিকল্প কাউকে ভাবতে পারেন না।
আজ ২৪ ডিসেম্বর দলটির ২২তম জাতীয় সম্মেলন। সাধারণ সম্পাদক পদ নিয়ে ব্যাপক আগ্রহ-কৌতূহল সবার মধ্যে। তবে স্পষ্ট কোনো ধারণা নেই কারোর ভেতরে। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা দলকে খাদের কিনারা থেকে তুলে এনে ১৯৯৬ সালে প্রথমবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় নিয়ে আসেন। দল ও দেশ পরিচালনায় সমান দক্ষ সংগঠকের মর্যাদা ও সুনাম রয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার। ২০০৮ সাল থেকে টানা তিনবার দেশ পরিচালনা করছেন তিনি।
