নির্বাচনের ঢেউ আপাতত শেষ। কাজেই আমরা এখন হয়তো ‘পাকিস্তান-অধিকৃত কাশ্মীর দখল করে নিতে ভারত প্রস্তুত’এ ধরনের বাগাড়ম্বর কম শুনব। তবে পরবর্তী দফা ভোটের জন্য অপেক্ষা করুন। সেই বুলি আবারও ফিরে এলো বলে! এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, নয়াদিল্লি গোটা জম্মু ও কাশ্মীর ভারতের অংশ করবে বলে সংকল্প নিয়েছে। তা সে পাক-অধিকৃত কাশ্মীর বা চীন নিয়ন্ত্রিত আকসাই চীন যেটাই হোক। তবে পাক-অধিকৃত কাশ্মীর দখলের চেষ্টার কী পরিণতি হতে পারে তা বোঝার জন্য আরও সূক্ষ্ম বিশ্লেষণের প্রয়োজন।
ভারতীয় সংসদের উভয় কক্ষে গৃহীত ১৯৯৪ সালের একটি প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সমগ্র জম্মু ও কাশ্মীর এবং লাদাখ ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভারতের সরকারি মানচিত্রেও দেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে পুরো কাশ্মীর অঞ্চলকে দেখানো হয়। তবে কাগজে যাই হোক, বাস্তবে পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন। ভূখণ্ডগুলো চীন এবং পাকিস্তানের দখলে রয়েছে। তাই অতি উত্তেজনা বাদ দিয়ে নাগরিকদের প্রকৃত পরিস্থিতি জানানোর এটাই সময়। সোজাসাপ্টা ভাষায় বলতে গেলে, ভারত এইরকম পরিস্থিতিতে চীন এবং পাকিস্তানের একজোট হওয়ার হুমকির মুখে পড়বে। পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে ভারতের পদক্ষেপ চীনের হস্তক্ষেপ ডেকে আনতে পারে। সেখানে চীনের ব্যাপক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ অঞ্চলটির কিছু অংশকে প্রায় চীনা উপনিবেশে পরিণত করেছে। ‘এটা যুদ্ধের যুগ নয়’ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির এ বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। পাকিস্তান ১৯৬৩ সালে ভারতের দখলে নেওয়া শাক্সগাম উপত্যকা (সিয়াচেন হিমবাহের উত্তরে অবস্থিত) ছেড়ে দেয়। এটি পাকিস্তান ও চীনের কারাকোরাম হাইওয়ের পথ প্রশস্ত করে। সিয়াচেন হিমবাহের পশ্চিমে অবস্থিত গিলগিট-বালতিস্তান অঞ্চল বা পাকিস্তানের নিয়ন্ত্রণাধীন উত্তরাঞ্চল। আর ভারতের জম্মু ও কাশ্মীরের পশ্চিমে অবস্থান পাকিস্তানের ‘আজাদ কাশ্মীর’-এর।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে এখানে চীনের অনেক স্বার্থ জড়িয়ে। কারণ দেশটি চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরকে (সিপিইসি) সম্প্রসারিত করতে চায় যা অধিকৃত কাশ্মীরের ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে যাবে। ‘সিপিইসি’ হচ্ছে চীন ও পাকিস্তানের মধ্যে একটি দ্বিপাক্ষিক প্রকল্প। এর মধ্যে আছে তিন হাজার কিলোমিটার জুড়ে বিস্তৃত অঞ্চলে সড়ক, রেলপথ এবং পাইপলাইনের এক বিশাল নেটওয়ার্ক। এটি চীন ও পাকিস্তানসহ এ অঞ্চলের অন্যান্য দেশের মধ্যে বাণিজ্যকে সহজতর করবে।
‘সিপিইসি’ প্রকল্পের লক্ষ্য পাকিস্তানের অবকাঠামো উন্নত করা এবং চীনের শিনজিয়াং প্রদেশকে পাকিস্তানের গোয়াদার ও করাচির মতো বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করা, যা দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যকে এগিয়ে নেবে। ‘সিপিইসি’ প্রকল্পকে এতটাই গুরুত্ব দেওয়া হয় যে, এর কাজে পাহারা দেওয়ায় নিয়োজিত রয়েছে অনেক চীনা সেনা। বিভিন্ন সময় এরকম ছবি উঠে এসেছে প্রচার মাধ্যমে।
চীনের শিনজিয়াংয়ের সঙ্গে ভারতের লাদাখের সীমানা রয়েছে। অন্যদিকে চীন-পাকিস্তান অর্থনেতিক করিডর অগ্রসর হয়েছে পাকিস্তান অভিমুখী কৌশলগত কারাকোরাম পর্বতমালার মধ্য দিয়ে। ১৩০০ কিলোমিটার দীর্ঘ কারাকোরাম মহাসড়ক কারাকোরাম পর্বতের ভেতর দিয়ে চীন এবং পাকিস্তানকে সংযুক্ত করেছে। এটি গোটা বিশ্বের মধ্যেই ভূপৃষ্ঠের সর্বোচ্চ স্থানে নির্মিত আন্তর্জাতিক পাকা সড়ক। কারাকোরাম পাসের অবস্থান লাদাখের উত্তরে। গিরিপথটি ভারত ও চীন উভয়ের জন্য কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ, এটি ভারতের লাদাখ অঞ্চল এবং চীনের শিনজিয়াং অঞ্চলের সীমানার মধ্যে পড়ে। ভারতীয় নিয়ন্ত্রণাধীন গুরুত্বপূর্ণ সিয়াচেন হিমবাহ পড়েছে কারাকোরাম পর্বতমালার পূর্বাঞ্চলে। চীনের শিনজিয়াং সীমান্তবর্তী অন্য দেশগুলো হচ্ছে আফগানিস্তান, তাজিকিস্তান, কিরগিজস্তান, কাজাখস্তান, রাশিয়া এবং মঙ্গোলিয়া। চীন-পাকিস্তান অর্থনেতিক করিডরের আনুষ্ঠানিক সূচনা হয়েছিল আজ থেকে সাত বছরের মতো আগে। ২০১৫ সালের ২০ এপ্রিল পাকিস্তানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফ এবং চীনা প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং সেদিন এ সংক্রান্ত ৫১টি চুক্তি এবং সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছিলেন। এগুলোর আর্থিক মূল্য ছিল ৪ হাজার ৬শ কোটি ডলার। চীন তখন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্প সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছিল। ‘বিআরআই’ চীন-পাকিস্তান অর্থনেতিক করিডরের প্রধান প্রকল্প। আগের ‘ওবিওআর’ (ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড) এর নতুন নাম ‘বিআরআই’। এ সংক্রান্ত ‘করিডর’গুলোর আওতায় ৬৫টির বেশি দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কাজ চলছে। অর্থনৈতিক করিডর কর্র্তৃপক্ষের ওয়েবসাইট অনুসারে, এসব অঞ্চলে বসবাস বিশ্বের জনসংখ্যার ৬০ শতাংশের। আর এ অঞ্চল থেকে আসে বৈশ্বিক জিডিপির ৪০ শতাংশ।
আফগানিস্তান থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার এবং তালেবানের আবার ক্ষমতা দখল চীনকে কাবুল পর্যন্ত ‘সিপিইসি’ সম্প্রসারিত করার দীর্ঘলালিত স্বপ্নকে এগিয়ে নিতে সহায়তা করবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে স্মরণ করা যায়, ভারতীয় বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান আরকেএস ভাদাউরিয়া ২০২০ সালে এক অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেওয়ার সময় বলেছিলেন, পাকিস্তান চীনা নীতিতে একটি দাবার ঘুঁটি হয়ে উঠছে। মার্কিন বাহিনীর তড়িঘড়ি প্রস্থানের পরে চীনারা আফগানিস্তানে প্রবেশের জন্য পাকিস্তানকে ব্যবহার করতে পারে।
আরকেএস ভাদাউরিয়া বলেন, ‘আফগানিস্তান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্থান চীনের জন্য এই অঞ্চলে নানা ধরনের ভূমিকা রাখার পথ করে দিয়েছে। সরাসরি এবং পাকিস্তানের মাধ্যমে উভয় পথেই। এটি চীনকে মধ্য এশিয়া অঞ্চলে প্রবেশের সুযোগ করে দিয়েছে। দীর্ঘকাল ধরেই অঞ্চলটি নজরে রয়েছে তাদের।’ আফগানিস্তানের ঘটনাপ্রবাহের বিষয়ে চীনের প্রতিক্রিয়া ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে ভারত। বিভিন্ন সূত্র বলছে, বেইজিং যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিতে তার প্রভাব বাড়ানোর জন্য পাকিস্তানকে কাজে লাগানোর সুযোগ খুঁজছে। আর ভারতের নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর পর্যালোচনা অনুসারে, আফগানিস্তান পর্যন্ত চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের সম্প্রসারণ হিসেবে পেইচিং আবারও পেশোয়ার-কাবুল মহাসড়ক নির্মাণের প্রস্তাব দিয়েছে।
পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে চীনের এ ধরনের শক্তপোক্ত উপস্থিতি থাকলে তারা যে এই অঞ্চলে ভারতের কোনো সামরিক অভিযান হাত গুটিয়ে বসে বসে দেখবে না তা চোখ বুজেই বলে দেওয়া যায়। পূর্ব লাদাখে চীনা আগ্রাসন অন্যকিছুর পাশাপাশি ভারতকে কারাকোরাম মহাসড়কে প্রভাব বিস্তারের কোনো সুযোগ না দেওয়ার পরিকল্পনারই অংশ। ২০২০ সালের মে মাস থেকে পূর্ব লাদাখের ঘটনাপ্রবাহ চীনা অভিপ্রায়ের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত। আর এটি নিশ্চয়ই আকসাই চীনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না।
লেখক : ইন্ডিয়া টুডে গ্রুপের প্রকাশনা
‘মেইল টুডে’-এর জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক। ইন্ডিয়া টুডে অনলাইন থেকে ভাষান্তর: আবু ইউসুফ
