চীনে হঠাৎ করেই করোনার সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় ও ভারতে নতুন ভ্যারিয়েন্ট দেখা দেওয়ায় করোনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা চীনের ঘটনায় আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে নতুন সতর্কতা জারি করেছে। একইভাবে ভারত সরকার পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে বেরিয়ে না যায়, সেটা নিশ্চিত করতে ভারতে সতর্কতা জারি করেছে। এমন অবস্থায় করোনা সংক্রমণ পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশেও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। এই দুই দেশের সংক্রমণ বৃদ্ধি বাংলাদেশে কতটা প্রভাব ফেলবে কিংবা বাংলাদেশে বিদ্যমান নিম্নমুখী করোনা পরিস্থিতির আবার ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার কোনো আশঙ্কা রয়েছে কি নাÑ তাও জানতে চায় মানুষ।
অবশ্য চীন ও ভারতের করোনা পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশে খুব বেশি জরুরি উদ্বেগের কিছু নেই বলে জানিয়েছেন সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, চীনে ও ভারতে করোনা বাড়লেও সেটা বাংলাদেশের জন্য অতটা জরুরি উদ্বেগজনক কিছু নয়। কিন্তু সতর্ক থাকতে হবে। কারণ তা আগামী ফেব্রুয়ারি-মার্চ নাগাদ আবার ছড়াতে পারে। দুই বছরের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, আমাদের এখানে ফেব্রুয়ারি-মার্চের দিকে করোনা একটু বাড়ে। শীতের সময় অতটা বাড়ে না। বাড়লেও আবার কমে যায়। আর শীতপ্রধান দেশে শীতের সময় বাড়ে। ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, বৈজ্ঞানিকভাবে অযথা উদ্বেগ নেই। কিন্তু করোনা মহামারী তো আছে। মহামারী তো চলছে। সুতরাং সংক্রমণ যদি বাড়ে রোগী বেড়ে যাবে। ১০০ জনে যদি একজন হাসপাতালে যায়, সেখানে ১০ হাজার সংক্রমিত হলে হাসপাতালে রোগীর সংখ্যা ১০০ হয়ে যাবে।
দেশের করোনার বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, এই মুহূর্তে সংক্রমণ সর্বনিম্ন। টিকা নেওয়ার হার ভালো। অনেকে সংক্রমিত হয়ে গেছেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলেছে, সারা বিশ্বে ৯০ শতাংশ লোক হয় টিকা অথবা সংক্রমিত হয়ে করোনা প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করেছে। আমাদের দেশে সেই হার ৯৫ শতাংশ। সারা বিশ্বের মধ্যে শুধু আফ্রিকার কয়েকটি দেশে টিকার অবস্থা ভালো নয়। বাংলাদেশে টিকার হার ভালো।
তবে বাংলাদেশে সতর্ক থাকতে হবে জানিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, এই ওমিক্রন ভ্যারিয়েন্ট যদি ছড়াতে থাকে, তা হলে সেটা আরও বেশি মিউটেশন বা পরিবর্তিত হয়ে আরও খারাপ হতে পারে। তিনি বলেন, এখন তো করোনার ধরন-উপধরন মিউটেশন হয়ে দ্রুত ছড়ানোর ক্ষমতা অর্জন করেছে। এখন শ্বাসতন্ত্রের উপরিভাবে সংক্রমণ হচ্ছে, নিচে যাচ্ছে না। নিচে গেলে খুব খারাপ অবস্থা হয়। কাজেই সতর্ক থাকতে হবে।
বাংলাদেশে সংক্রমণ এখন নিম্নমুখী। গত ৭ দিন ধরে করোনায় কোনো মৃত্যু নেই। পরীক্ষা অনুপাতে শনাক্ত হারও গত দুই সপ্তাহ ধরে এক শতাংশের নিচে অবস্থান করছে। দুই মাসেরও বেশি সময় ধরে দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ৫০ এর নিচে রয়েছে। সর্বশেষ গত ২৪ ঘণ্টায় দৈনিক শনাক্ত রোগীর সংখ্যা আরও কমে ৭ জনে নেমে এসেছে। এ নিয়ে এখন পর্যন্ত দেশে মোট শনাক্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২০ লাখ ৩৭ হাজার ১৮ জনে। মোট মারা গেছেন ২৯ হাজার ৪৩৮ জন।
চীনে চলতি ডিসেম্বরের প্রথম ২০ দিনে ২৫ কোটি মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে গত মঙ্গলবার এক দিনেই ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষের দেহে করোনা শনাক্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে ব্লুমবার্গ ও ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে।
চীনে করোনা বাড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও। গত বুধবার এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান তেদরোস আধানম গেব্রিয়াসুস বলেন, চীনে বর্তমানে যে পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে, তা নিয়ে ডব্লিউএইচও খুবই উদ্বিগ্ন। ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের করোনার টিকা দেওয়ায় চীনকে সহায়তা করছে সংস্থাটি। এ ছাড়া দেশটির জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় সহায়তা করার প্রস্তাব দিয়ে যাবে ডব্লিউএইচও।
অন্যদিকে, চীনের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ভারতেও পাওয়া গেছে। গত কয়েক মাসে ভারতে মোট ৪ জন এই নয়া ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হয়েছেন। এদের মধ্যে দুজন গুজরাটের বাসিন্দা এবং দুজন উড়িষ্যার বাসিন্দা। শুধু তাই নয়, শোনা যাচ্ছে রাজধানী দিল্লিতে আরও বেশ কয়েকজন এই নয়া ভ্যারিয়েন্টে আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারে।
পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে বেরিয়ে না যায়, সেটা নিশ্চিত করতে গত বৃহস্পতিবারই ভারতের প্রধানমন্ত্রী জরুরি বৈঠক করেছেন। সে দেশের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনসুখ মাণ্ডবীয় সংসদে জানিয়েছেন, কেন্দ্রের পাশাপাশি রাজ্যগুলোকেও বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
চীন ও ভারতের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ভারত, চীন ও আমেরিকাতে করোনার যে ধরন পাওয়া গেছে, সেটা বাংলাদেশেও থাকতে পারে। জিনোম সিকোয়েন্স করা হলে পাওয়া যেতে পারে। এই ধারা এখনো বিপজ্জনক প্রমাণিত হয়নি। তবে যত ভ্যারিয়েন্ট হচ্ছে, সেগুলোর আগের ধরনের চেয়ে সংক্রমণ ক্ষমতা বেশি। এটুকুই উদ্বেগের।
বাংলাদেশে ফের করোনা সংক্রমণ বাড়তে পারে এমন আশঙ্কা প্রকাশ করে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, এই শীতের সময় না হলেও পরিবর্তীকালে ফেব্রুয়ারি-মার্চে সংক্রমণ আবার বাড়তে পারে। কাজেই যেখানে অনেক লোক আছে এমন বদ্ধ জায়গায় মাস্ক পরা, সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে প্রবেশ করা, জ্বর হলেই পরীক্ষা করা ও অবহেলা না করা, স্বাস্থ্যকর্মীদের পরামর্শ নেওয়া এগুলো করতে হবে। স্বাস্থ্য বিভাগ যেন কিছুতেই করোনা চলে গেছে এমন আত্মতুষ্টিতে না ভোগে, কারণ এখনো বিপদ আছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা মহামারী প্রত্যাহার করেনি। তারা আশা করছে আগামী বছরের কোনো এক সময় প্রত্যাহার করা হবে।
আইইডিসিআরের এই উপদেষ্টা বলেন, চীন ও ভারতে সংক্রমণ বেড়ে যাওয়া ও নতুন ভ্যারিয়েন্ট দেখা দেওয়ার বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য জরুরি উদ্বেগজনক নয়। কিন্তু যেহেতু চীন ও ভারতে ছাড়াচ্ছে, তাই আমাদের এখানেও আসবে। সেটা হয়তো শীতের পর। এ কারণে আইইডিসিআরের নেতৃত্বে যে সার্ভিলেন্স হয়, সেটা শিথিল করা যাবে না। আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোতে রোগীদের পরীক্ষা গুরুত্ব দিয়ে করতে হবে। ভারতে যদি সংক্রমণ বেড়ে যায়, তা হলে কভিড টিকার সনদপত্র প্রদর্শন ও কভিড পরীক্ষার ফল নেগেটিভ আছে কিনা, সে বিষয়গুলো আবার চালু করা লাগতে পারে, প্রস্তুতি রাখতে হবে।
