স্যার

আপডেট : ২৭ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:১৬ এএম

অন্যের মুখে স্যার শুনতে প্রাণ আঁকু-পাকু করে। কিন্তু কোন যোগ্যতার কারণে স্যার সম্বোধিত হব? পদসোপানভিত্তিক আমলাতন্ত্রের দুরারোগ্য ‘স্যার স্যার’ ব্যাধি রাজনীতিবিদ থেকে শুরু করে পেশাজীবী অপেশাজীবী সবার মধ্যেই সংক্রমিত হয়েছে। এতে যদি উৎপাদনশীলতা বাড়ত চর্চাটা আরও বাড়িয়ে দেওয়া যেত। 

আমরা কাকে স্যার বলি?

১৯৪৩। সদ্য পাস করা ডাক্তার রামচন্দ্র কুলকার্নির বয়স মাত্র বাইশ, নিবাস ভারতের কর্নাটকের হুবলি শহরে। মহারাষ্ট্র ও কর্নাটক সীমান্তের ঘন বনে ঘেরা চান্দগড় গ্রামে একটি হাসপাতালে চাকরি নিলেন। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কিছু মানুষের অল্পকিছু ঘরবাড়ি।

জুলাইয়ের ঝড়ো রাত, প্রবল বৃষ্টি। ডাক্তার কুলকার্নি বই পড়ছিলেন। হঠাৎ দরজায় বড় ধাক্কা। ঝড়োরাতে কে আসতে পারে! একটু ভয়ও পেলেন। দরজা খুলে দেখেন পশমি কাপড় গায়ে চারজন পুরুষ, সবার হাতেই লম্বা লাঠি। মারাঠি ভাষায় তারা বললেন, ‘আপনার ব্যাগ তুলে নিন এবং আমাদের সঙ্গে চলুন।’ ডাক্তার বুঝতে পারলেন প্রতিবাদ করে লাভ নেই। চুপচাপ ব্যাগ নিয়ে তাদের অনুসরণ করে গাড়িতে উঠলেন। দেড় ঘণ্টা পর গড়ি থামল।

চারদিকে অন্ধকার। লাঠিওয়ালা মানুষগুলো তাকে একটি কাঁচা মাটির ঘরে নিয়ে গেল। একটি কক্ষে লণ্ঠন জ¦লছিল, চৌকির ওপর একজন গর্ভবতী নারী শুয়ে আছেন, পাশে এক বুড়ি। দৃশ্যটি দেখে ডাক্তার নিজেই ভেতর থেকে কেঁপে উঠলেন, কী ঘটতে যাচ্ছে বুঝতে পারছেন না। তাকে জানানো হলো গর্ভবতী নারীর সন্তান প্রসব করাতে তাকে এখানে আনা হয়েছে।

গর্ভবতী নারীটি কমবয়সী একটি মেয়ে। যেভাবে মেয়েটি গোঙাচ্ছে ডাক্তারের মন গলে গেল। এর আগে তিনি কখনো নারীর সন্তান প্রসবের কাজে অংশ না নিলেও ঝড়ের রাতে অসহায় মেয়েটিকে তিনি সাহায্য করবেন বলে স্থির করলেন।

জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কে? এখানে কেমন করে এলে?

বেদনার্ত কণ্ঠে মেয়েটি বলল, ডাক্তার সাহেব আমি আর বাঁচতে চাই না।

তারপর সে তার যন্ত্রণার পেছন কাহিনীটি শোনাল : আমি এখানকার একজন বড় মালিকের মেয়ে। গ্রামে কোনো হাইস্কুল না থাকায় বাবা-মা আমাকে দূরের শহরে পড়তে পাঠায়। আমি ক্লাসের একটি ছেলের প্রেমে পড়ি... সেখানে থেকেই গর্ভবতী হই। ব্যাপারটা যখন বুঝতে পারি আমি ক্লাসমেটকে জানাই। সে তখন আমাকে ছেড়ে পালিয়ে যায়। আমার বাবা-মা যখন জানতে পারে তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। সে জন্যই তারা আমাকে এখানে পাঠিয়ে দিয়েছে, যেন কেউ জানতে না পারে।

কাহিনীটা সংক্ষেপে শেষ করে তারপর সে হাউমাউ করে কাঁদতে শুরু করল। ডাক্তার কুলকার্নি মেয়েটির সন্তান প্রসবের আয়োজন করতে লাগলেন। একটি কন্যাসন্তানের জন্ম হলো। কিন্তু শিশুটি কাঁদল না।

তরুণী যখন বুঝতে পারলেন তার সন্তান কাঁদছে না তিনি বলতে শুরু করলেন ‘এটা তো মেয়ে। মরে যাক, তাকে মরতে দিন, নতুবা তার জীবনও আমার মতো দুর্ভাগ্যজনকই হবে।’

কিন্তু ডাক্তার কুলকার্নি সদ্যোজাত শিশুটিকে রক্ষা করতে চেষ্টা করলেন এবং তার ক্রমাগত চেষ্টার পর শিশুটি কেঁদে উঠল। ডাক্তার যখন সেই মাটির ঘর থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন তাকে ১০০ রুপি ভিজিট দেওয়া হলো। ডাক্তার কুলকার্নির তখন মাসিক বেতন ৭৫ রুপি। টাকাটা হাতে নেওয়ার পর ডাক্তারের মনে হলো, ব্যাগটা তো ও ঘরেই রয়ে গেছে আনা হয়নি। ব্যাগ আনার নাম করে আবার সেই ঘরে ঢুকলেন এবং সদ্য পাওয়া ১০০ রুপি মেয়েটির হাতে দিয়ে বললেন, ‘আনন্দ বলো বেদনা বলো এসব মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে কিন্তু তুমি সব ভুলে গিয়ে চাইলে নিজের ও শিশুটির যতœ নিতে পারো। যখন উঠে দাঁড়াতে এবং চলাচল করতে পারবে, পুনাতে নার্সিং কলেজে যাবে। সেখানে মিস্টার আপ্তে আমার বন্ধু। গিয়ে তার সাথে দেখা করবে এবং বলবে ডাক্তার কুলকার্নি তোমাকে পাঠিয়েছেন। তিনি নিশ্চয়ই তোমাকে সাহায্য করবেন। এটাকে তোমার একজন ভাইয়ের অনুরোধ বিবেচনা করবে। এই মুহূর্তে তোমার জন্য আমার কিছু করার নেই।’

বহু বছর পেরিয়ে গেছে। ডাক্তার রামচন্দ্র কুলকার্নি ধাত্রী বিষয়ক বিশেষজ্ঞ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন। একবার তিনি আওরঙ্গাবাদে একটি চিকিৎসা বিষয়ক সম্মেলন গিয়ে ডাক্তার চন্দ্রার সাবলীল ও মেধাদীপ্ত বক্তৃতা শুনে মুগ্ধ হলেন। সেই সম্মেলনেই পরিচিত একজন ডাক্তার কুলকার্নির নাম ধরে ডাকলে নামটি ডাক্তার চন্দ্রার কানে পৌঁছাল। তারও দৃষ্টি নিবদ্ধ হলো ডাক্তার কুলকার্নির ওপর।

ডাক্তার চন্দ্রা সরাসরি তার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, ‘স্যার, আপনি কি কখনো চান্দগড়ে ছিলেন?’

ডাক্তার কুলকার্নি বললেন, ‘হ্যাঁ বহু বছর আগে, চাকরিজীবনের শুরুতে।’

চন্দ্রা বললেন, ‘স্যার তাহলে আপনাকে আমার বাসায় আসতে হবে।’

ডাক্তার কুলকার্নি বললেন, ‘ডাক্তার চন্দ্রা, আপনার সাথে আমার আজই প্রথম দেখা হলো। আমি মুগ্ধ হয়ে আপনার বক্তৃতা উপভোগ করেছি। কিন্তু আজ আমার পক্ষে যাওয়া সম্ভব নয়, ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই যাওয়ার সুযোগ হবে।

কিন্তু চন্দ্রা পীড়াপীড়ি শুরু করলেন, বললেন, ‘স্যার সামান্য সময়ের জন্য হলেও আজ চলেন, আমি সারা জীবন আপনার কাছে কৃতজ্ঞ থাকব।’

এই আন্তরিক আমন্ত্রণ প্রত্যাখ্যান করা সম্ভব হলো না। শেষ পর্যন্ত ডাক্তার চন্দ্রা তার অতিথিকে নিয়ে বাড়িতে এলেন এবং সজোরে ডাকলেন, ‘মা দেখো, কে এসেছেন?’

ডাক্তার চন্দ্রার মা এলেন এবং নিজের সামনে ডাক্তার কুলকার্নিকে দেখে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। চোখ অশ্রু ভারাক্রান্ত হয়ে উঠল। নিজেকে সংবরণ করে আনত হয়ে তার পায়ের পাতা স্পর্শ করলেন।

ডাক্তার কুলকার্নি হতবুদ্ধি হয়ে পড়লেন এবং আতঙ্কগ্রস্তও। কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই নারী মুখ খুললেন, ‘ডাক্তার সাহেব, চান্দগড়ের গ্রামে আমি যখন প্রসব যন্ত্রণায় ছটফট করছিলাম, মধ্যরাতে আপনি সাহায্য করতে এসেছিলেন। তারপর আপনার পরামর্শে আমি পুনা গেলাম এবং স্টাফ নার্স হলাম। আমার মেয়েকে পড়াশোনায় আগ্রহী করে তুলে আপনাকে আদর্শ মেনে তাকে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ বানালাম। সে রাতে আপনার হাতে জন্ম নেওয়া চন্দ্রাই সেই মেয়ে।’

ডাক্তার কুলকার্নি অবাক হলেন এবং খুব খুশিও হলেন। তিনি চন্দ্রাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কিন্তু তুমি আমাকে চিনলে কেমন করে?’

 ডাক্তার চন্দ্রা বললেন, ‘স্যার আপনার নাম শুনে। আমি তো সারা বছরই আমার মাকে আপনার নাম নিতে শুনি।’

বিস্মিত চন্দ্রার মা বললেন, ‘স্যার আপনার নাম রামচন্দ্র। আপনার নাম থেকেই মেয়ের নাম রেখেছিলাম চন্দ্রা। আপনি আমাদের নতুন জীবন দিয়েছিলেন।’

ডাক্তার কুলকার্নি ইনফোসিস ইন্ডিয়ার প্রেসিডেন্ট সুধা মূর্তির বাবা। সুধা ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ঋষি সুনাকের শাশুড়ি। ডাক্তার চন্দ্রা তার আদর্শ রামচন্দ্র কুলকার্নির নামে একটি হাসপাতাল স্থাপন করেছেন। সুধা মূর্তির থ্রি থাউজেন্ড স্টিচেস গ্রন্থ থেকে এই এপিসোডটি অনূদিত হয়েছে।

আরও একজন স্যার

প্রকৃত লেখক কে জানি না। রিচার্ড স্ট্র্যাশাল নামের একজনের পোস্ট থেকে ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের একটি এপিসোড তুলে ধরছি।

এক যুবক এক বৃদ্ধের কাছে গিয়ে সবিনয়ে বলল, আপনি কি আমাকে চিনতে পেরেছেন?

বৃদ্ধ আপাদমস্তক দেখে বললেন, বুড়ো হয়েছি তো, চিনতে পারছি না।

যুবক বলল, আমি আপনার ছাত্র ছিলাম।

পরের প্রশ্ন, তাই নাকি, এখন কী করছো?

যুবক বলল, আমিও শিক্ষক হয়েছি।

বুড়ো বলল, খুব ভালো, আমার মতো?

যুবক বলল, আপনার মতো হতে পেরেছি কিনা জানি না, তবে আপনার মতো হওয়ার জন্য এক সময় আপনি আমাকে প্রেরণা দিয়েছেন।

কৌতূহলী বুড়ো যুবককে বললেন, আমি কবে কোন সময় তোমাকে শিক্ষক হওয়ার অনুপ্রেরণা দিলাম?

এবার যুবক তার কাহিনীটি শোনাতে শুরু করল : 

একদিন এক সহপাঠী খুব আকর্ষণীয় একটি নতুন ঘড়ি নিয়ে ক্লাসে এলো। আমার চোখ পড়ল ঘড়িটার ওপর, ঘড়িটা আমার চাই-ই। সুযোগের অপেক্ষা করতে করতে এক সময় তার পকেট থেকে ঘড়িটা বের করে লুকিয়ে ফেললাম। ঘড়িটা চুরি করলাম।

কিছু সময় পর সে টের পেল ঘড়িটা নেই, খোঁজাখুঁজি করে পেল না, দ্রুত ঘড়ি চুরির ব্যাপারটি আপনাকে বলল। আপনি তখন আমাদের ক্লাসে পড়াচ্ছিলেন।

আপনি পড়ানো বন্ধ করে ঘোষণা করলেন : ক্লাস চলাকালে তোমাদের বন্ধুর ঘড়ি চুরি হয়েছে। যেই চুরি করে থাকো ঘড়িটা দিয়ে দাও।

কেউ সাড়া দিল না। আর আমি তো ফেরত দেওয়ার জন্য ঘড়ি চুরি করিনি।

আপনি ক্লাসের দরজা বন্ধ করলেন। আমাদের দাঁড়াতে বললেন, জানালেন ঘড়ি না পাওয়া পর্যন্ত আপনি আমাদের পকেট চেক করবেন। তারপর আপনি সবাইকে দুচোখ বন্ধ করতে বললেন। সবার চোখ বন্ধ হলেই আপনি ঘড়ি খোঁজার কাজটা শুরু করবেন।

আমার চোখ বন্ধ করলাম আপনি এক পকেট থেকে অন্য পকেট, একজনের পর একজন করে চেক করতে শুরু করলেন।

আমার পকেটে হাত দিয়ে ঘড়িটা পেলেন এবং বের করে নিলেন। তারপরও পকেট অনুসন্ধান চালিয়ে গেলেন। সবার পকেট সার্চ করা শেষ হলে আপনি ঘোষণা করলেন, এবার চোখ খোলো, আমরা ঘড়িটা পেয়ে গেছি, এটা ক্লাসেই ছিল।

ঘড়িটা কার পকেটে পেয়েছেন বলেননি। ঘড়িটা প্রকৃত মালিককে ফেরত দিলেন। ঘটনাটি নিয়ে আপনি আমাকে কিছু বলেননি, কখনো বিষয়টা আপনাকে উল্লেখ করতেও শুনিনি। সেদিন আপনি আমার মর্যাদা রক্ষা করেছেন। নতুবা সেটা হতো আমার জীবনের সবচেয়ে লজ্জাজনক দিন।

কিন্তু সেটা হয়ে উঠল, আপনার কারণেই, আমার সম্মান রক্ষা করার দিন। একজন চোর এবং একজন বাজে মানুষ হওয়ার অপবাদ থেকে আপনি আমাকে বাঁচালেন। আপনি আমাকে কখনো কিছু বলেননি, কখনো আমাকে নীতিশিক্ষার কোনো বার্তাও দেননি। কিন্তু আমি বার্তাটি ঠিকই পেয়ে গেলাম।

আপনাকে অনেক ধন্যবাদ। আমি সেদিনই বুঝলাম সত্যিকারের শিক্ষক কাকে বলে? আমিও শিক্ষক হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলাম।

বুড়ো বললেন, ঘড়ি চুরি ও খুঁজে পাওয়ার ঘটনাটি মনে পড়ে। কিন্তু কার পকেটে ঘড়িটা পেয়েছিলাম সেটা বলা সম্ভব নয়। কারণ আমিও তো চোখ বন্ধ করে পকেট সার্চ করেছি। আমিও দেখতে চাইনি কে কাজটা করেছে, সবাই তো আমার ছাত্র।

আমরা কি ঠিক মানুষটিকে স্যার বলি?

লেখক: সরকারের সাবেক কর্মকর্তা ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত