বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগেই অর্থাৎ পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত দেশ পাওয়ার আগেই আমরা আমাদের জাতীয় পতাকা পেয়েছি। প্রাথমিক পর্যায়ে লাল সূর্যের বুকজুড়ে দেশের হলুদ মানচিত্র অঙ্কিত লাল-সবুজ পতাকা পেয়েছিলাম। স্বাধীনতার পর বিস্তীর্ণ সবুজ জমিনে রক্তিম সূর্য উদিত লাল-সবুজ রঙের পতাকা পেয়েছি। পরিমার্জিত এ লাল-সবুজ রঙের জাতীয় পতাকা কষ্টার্জিত স্বাধীন দেশের মতোই আমাদের প্রাণপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আমার কিশোর মনে লাল-সবুজের পতাকার রেখাপাতের এক ছোট্ট ঘটনা সহৃদয় পাঠকের সঙ্গে ভাগাভাগি করতে চাই।
১৯৭১ সালের এপ্রিল মাস। আমি তখন অষ্টম শ্রেণিতে পড়ি। টাঙ্গাইল শহরে আমার বাবা দোকান করতেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে ওই দোকানে মাঝেমধ্যে (পাকিস্তানি বিশেষ দিবসে) চাঁদ-তারাখচিত পতাকা উত্তোলন করতে দেখেছি। একাত্তরের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণের পর থেকে চাঁদ-তারা মার্কা পতাকার পরিবর্তে বাংলাদেশের মানচিত্রখচিত লাল-সবুজ রঙের একটি পতাকা নতুন বাঁশের লাঠিতে বেঁধে উত্তোলন করা হলো। প্রতিদিন সকালে দোকান খোলার সঙ্গে সঙ্গে বাছিদ কাকা (দোকানের কর্মচারী) পতাকাটি উত্তোলন করতেন এবং রাতে দোকান বন্ধ করার সময় লাঠিসমেত পতাকাটি তুলে রাখতেন।
৩ এপ্রিল ১৯৭১ পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী টাঙ্গাইল শহর আক্রমণ করে। সেদিনও সকালে যথারীতি বাছিদ কাকা নতুন পতাকাটি উত্তোলন করেছিলেন। কিন্তু দুপুরে হানাদারদের শহর আক্রমণের খবর পাওয়া মাত্রই তড়িঘড়ি করে পতাকাটি নামিয়ে দোকান বন্ধ করে বাড়ি চলে আসতে বাধ্য হন। সঙ্গে নতুন পতাকাটি ভাঁজ করে নিয়ে আসেন। ৩ এপ্রিলের পর পাকিস্তানি মিলিটারিদের ভয়ে আবার যেদিন দোকান খোলা হলো সেদিন সেই চাঁদ-তারা মার্কা পতাকাটি লাঠির মাথায় বাঁধা হলো। কিন্তু এবার রাতে দোকান বন্ধ করা হলেও চাঁদ-তারা মার্কা পাকিস্তানি পতাকাটি লাঠিসমেত দোকানেই বাঁধা থাকত। বাছিদ কাকা ইচ্ছা করেই আর ওই পতাকাটিতে হাত দেননি। ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে যুদ্ধজয়ের খবর শুনে এক দিন ওই চাঁদ-তারা মার্কা পতাকাটি নামিয়ে ফেললেন বাছিদ কাকা। এদিকে আমি ৩ এপ্রিলের পর থেকে বাছিদ কাকার ভাঁজ করে বাড়িতে আনা নতুন দেশের নতুন পতাকাটি হাতে পাওয়ার জন্য মনে মনে ছটফট করছিলাম। গোপনে হন্যে হয়ে খুঁজছিলাম। পাওয়া না গেলেও মুখ ফুটে কাউকে বলতে পারছিলাম না! বাছিদ কাকার যেদিন দরকার হলো, সেদিন চুপি চুপি তার পিছু নিয়ে দেখলাম সে তার ঘরে কাউকে কিছু না বলে মাচায় মাটির একটি হাঁড়ি থেকে অনেক কসরত করে সেই পতাকাটি বের করলেন। ঝাড়া দিয়ে পতাকাটি মেলে ধরেই বাছিদ কাকার উজ্জ্বল মুখটি হঠাৎ মলিন হয়ে গেল! বিষাদে তার চেহারা করুণ হয়ে গেল!
এ সময় আমি তার কাছে গিয়ে ‘এইটা কোন দেশের পতাকা কাকা’? বলে জানতে চাইলাম। বাছিদ কাকা আমার দিকে এক পলক তাকিয়ে বললেন, ‘এইটা আমাগো নতুন দেশের নতুন পতাকা! কিন্তু দ্যাখ পতাকার রংটা জ্বইলা গেছে। মিলিটারির চোখ যাতে না পড়ে তার জন্য মাটির হাঁড়িতে রাখছি তো ম্যালা দিন...। যাক, কী আর করা। খাজা খলিফারে দিয়া নতুন পতাকা বানাইয়া নিমু। বিজয় হইছে। পতাকার রং ফ্যাকাশে হইলে চলব না! তোর বাবার কাছ থাইকা টাকা নিয়া উজ্জ্বল রঙের নতুন পতাকা বানামু। খাজা খলিফারে কমু, আমাগো গায়ের মাঠঘাটের, দেশের রং যেমন সবুজে ভরা, সেই সবুজ জমিনে ভোরবেলার লাল সূর্যের একটা ছবির মতো পতাকা সেলাই কইরা দিতে! লাল ‘আর সবুজ রং যেন কিছুতেই ফ্যাকাইশ্যা ধরনের না হয়’এই বলে বাছিদ কাকা ফ্যাকাশে হয়ে যাওয়া পতাকাটি আমাকে দিয়ে দিলেন! বললেন, ‘সাবধান! এইটা কাউরে দেখাবি না। মিলিটারিরা ভাগলেও রাজাকার-আলবদররা ঘাপটি মাইরা আছে। তোর হাতে পতাকাটা দেখলেই সর্বনাশ!’ আমি বাছিদ কাকার কথায় সায় দিয়ে মাথা নাড়লাম। তারপর পতাকাটি ভাঁজ করে হাফপ্যান্টের পকেটে ঢোকালাম।
একাত্তরের বিজয়ের মাসে বাছিদ কাকার কাছ থেকে পতাকার প্রতি আমার যে সমীহ ভাব জেগেছে তা বৃদ্ধ বয়সেও অটুট রয়েছে। পরবর্তীকালে জাতীয় পতাকার প্রতি, স্বাধীন দেশের প্রতি ভালোবাসা, আন্তরিক শ্রদ্ধা আরও গভীর হয়েছে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক আদর্শ থেকে।
যা হোক আমার কৈশোরিক ভাবাবেগ পরের ৫০ বছরেও মলিন হয়নি। কিন্তু আমাদের প্রাণপ্রিয় লাল-সবুজ জাতীয় পতাকার রং আর পতাকার প্রতি সমীহ ভাব যত্রতত্র উপেক্ষিত হচ্ছে! সরকারি, বেসরকারি, ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কিংবা রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্বশীল আনুষ্ঠানিকতায়ও বাঙালি জাতিসত্তার পরিচয় বহনকারী উড্ডীন পতাকার রঙে বিকৃতি আর অবয়বে বিকৃতি লক্ষ করা যায়! পতাকার সবুজ জমিন কখনো নবুজাভ-নীল, কালো, নীলচে, কালচে, ধূসর, মলিন ইত্যাদি নানান রঙে চরম অবজ্ঞায়, অবহেলায় উত্তোলিত হতে দেখা যায়!
আমরা সাধারণ মানুষ। রাজনীতিকদের ভাষায় ‘জনগণ’! আমরা শুধু জাতীয় পতাকা নয়, রাঙালি জাতিসত্তাকেও কদর করতে গড়িমসি করি। তাই বলে আমাদের দেশের প্রতি, জাতীয় পতাকার প্রতি বীতশ্রদ্ধা, অবজ্ঞা রয়েছে তা মেনে নেওয়া যায় না। হয়তো আমাদের যথাযথ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা, সামাজিক-রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার অভাব থেকে পতাকার রঙে বিকৃত অবয়ব মূল্যায়নের সুযোগ কম। কিন্তু অন্যদিকে আমাদের জাতিসত্তার হেফাজতকারী সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বকারী, নাগরিকদের দায়িত্ব কর্তব্য পালনে দিকনির্দেশনাকারী গোষ্ঠী বা প্রতিষ্ঠানসমূহ জাতীয় পতাকার রঙে বিকৃতি রোধে আদৌ সচেষ্ট কি? আমরা শুধু রাষ্ট্রের সমস্যা তো বটেই, সামাজিক নগণ্যতম সমস্যা সৃষ্টি হলেই প্রধানমন্ত্রীর মুখাপেক্ষী হয়ে পড়ি। কিন্তু স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী এমনকি জাতীয় অগ্রগতির অগ্রপথিক যারা, তারা তো নিজেদের দায় প্রধানমন্ত্রীর কাঁধে চাপিয়ে নির্ভার হতে পারেন না।
আমার কৈশোরিক মনে জাতীয় পতাকার লাল-সবুজ রংটি এখনো জ্বলজ্বল করছে। একাত্তরে বাছিদ কাকা পতাকার রং একটু ফ্যাকাশে হওয়ায় নতুন পতাকা উত্তোলনের আবেগ-উচ্ছ্বাস দমন করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমি আমার মনে ‘জ্বলজ্বল’ করা পতাকার পরিবর্তে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ‘ফ্যাকাশে’ সবুজ রঙের পতাকা দেখে দেখে নিরাবেগ থাকার চেষ্টা করছি! কিন্তু বাছিদ কাকারা অথবা আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই ‘ফ্যাকাশে’ ধূসর রঙের জাতীয় পতাকার অসম্মান, অপব্যবহার দেখলে নিজেরা নিরাবেগ থাকতে পারতেন কি?
লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট
