মেট্রো হচ্ছে আধুনিক নগরীর বাহন। এটার প্রভাব পড়ে অনেক জায়গায়। শহরের ভূমি ব্যবহার কেমন হবে, তা মেট্রোই নির্দিষ্ট করে দেয়। বিশেষ করে মেট্রো স্টেশনের আশপাশে। সেখানে ভূমির ঘনত্ব বেড়ে যায়। মেট্রো হলো একধরনের ‘ফ্যাটাল অ্যাট্রাকশন’। মানুষজনের মধ্যে মেট্রোকেন্দ্রিক আগ্রহটা মারাত্মক রকমের বেশি। এখন যেমন অভিভাবকরা ছেলেমেয়েদের স্কুলের আশপাশে বাসা নেওয়া বা থাকাটা প্রাধান্য দেন; তেমনি গ্লোবাল অভিজ্ঞতায় বলে যে, মেট্রো হওয়ার পর মানুষ যখন এর নির্ভরযোগ্যতা, দ্রুতগামিতা এবং আরামদায়কতা দেখে, তখন সে মেট্রোর আশপাশে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করে। এর ফলে মেট্রোর পাশের যে ভূমি মালিকের দোতলা বাড়ি ছিল, তিনি তা ২০ তলা বানিয়ে ফেলেন। ভাড়ার চাহিদা এত বেড়ে যায় যে, এরপরও তার নিজেকে বোকা মনে হতে পারে।
মেট্রো হওয়ার কিছুদিন পরেই দেখা যায়, স্টেশনের পাশে ভূমির ব্যবহারের ঘনত্বটা বাড়তে বাড়তে ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণের দিকে চলে যায়। তবে ঢাকার মতো আনপ্ল্যানড সিটিগুলোর ক্ষেত্রে এটা সমান্তরালভাবে পেরিফেরিতে আনুভূমিক ও অনিয়ন্ত্রিতভাবে বাড়ে। এটা এত বড় হয়ে যায় যে, সেটায় আর নিয়ন্ত্রণ থাকে না যেটা আসলে ম্যানেজেবল না। কিন্তু স্মার্ট সিটির ডেফিনেশনই হলো সংক্ষিপ্ত জায়গার। সিঙ্গাপুর, হংকংয়ের মতো ছোট জায়গায় ছোট শহরে যেমনটা হয়েছে ইকোনমিক, ভাইব্রেন্ট অ্যাক্টিভিটি। মেট্রো স্টেশনের পাশে যতই ঊর্ধ্বমুখী যাওয়া যাক না কেন কোনো যানজট হয় না। মানুষ স্টেশনের পাশে থেকে হাঁটার দূরত্বে মেট্রো ধরবে। ভূমি ব্যবহারটা এমন হতে হয় যে, মেট্রো স্টেশনের সামনে থাকে অফিসপাড়া, বাণিজ্যিক এলাকা; এর পেছনে থাকে সার্ভিস; তার পেছেনে থাকে আবাসিক এলাকা। এরকম তিন-চারটা রিং করে কেবলাটা দেওয়া হয় মেট্রো স্টেশনমুখী। সবকিছু আধা কিলোমিটারের দূরত্বে হবে, সবাই সমান দূরত্বে। এই মেট্রো কেবলাকে বলে সাবজেন। মানুষ তখন এই মেট্রোসংশ্লিষ্ট চিন্তাভাবনা করে দিনযাপন করে। মানে, এই অফিসের উদ্দেশে বাসা থেকে কখন বের হবে, আধাঘণ্টা আগে না এক ঘণ্টা পরে রওনা করবে বা সপ্তাহের কোন বার, ভিড় হবে কিনা এসব হিসাবনিকাশ করতে হবে না। সে কেবল মেট্রো আসার ঠিক পাঁচ মিনিট আগে স্টেশনে পৌঁছাবে। এই যে সে হেঁটে স্টেশনে চলে গেল, তার গাড়ি লাগল না, বাসে উঠতে হলো না, বাস-গাড়ি লাগছে না, সরকারকেও রাস্তা বানাতে হচ্ছে না। অন্যদিকে জ¦ালানি তেলও বেঁচে গেল। মেট্রোর ফলে এভাবে একটা নগরী স্মার্ট হয়ে ওঠে। মেট্রোর উদ্দেশ্যও এটাই।
মেট্রোর ক্ষেত্রে আমরা যে গণপরিবহনের কথা বলছি, সেটা আমাদের ক্ষুদ্র বুদ্ধি দিয়ে বলছি। মেট্রোর ব্যাপকতাটা এরকম যে, শহরকে যদি আমরা স্মার্ট করতে চাই; তাহলে মেট্রোকে মেরুদ- করে শহরটাকে মেট্রো স্টেশনকেন্দ্রিক করতে হবে। এটা করা গেলে ব্যক্তিগত গাড়ি, গণপরিবহনের সংখ্যা কমে যাবে, দূষণ কমে যাবে, যানজট কমে যাবে। অন্যদিকে, এখন যাতায়াতের ক্ষেত্রে মানুষের কর্মঘণ্টার যে ১২ বিলিয়ন ডলারের মতো প্রতিবছর লস হচ্ছে, সেটা লস না হয়ে জিডিপিতে যোগ হবে। এ ছাড়া, এখন যে ভাঙাচোরা গণপরিবহনে বাদুড়ঝোলা হয়ে অফিসে যায় মানুষ, এতে তো সে যাত্রাপথেই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তার শক্তি তো অফিসে পৌঁছাতে পৌঁছাতেই শেষ, কাজের শক্তি সে পাবে কোথায়! যাত্রাপথের এই ভোগান্তিতে তার প্রোডাক্টিভিটি কমে যায়। তো মেট্রোতে যারা চলবেন তারা এসব ঝঞ্ঝাট এড়িয়ে পুরো শক্তি নিয়ে সজীবতা নিয়ে অফিসের কাজে নিজের সবটুকু দিতে পারবেন। এমনকি কাজ শেষে বাসায় ফেরার পরও সজীবতা নিয়ে ফিরবেন, পরিবারকে কোয়ালিটি টাইম দিতে পারবেন। এজন্যই কিন্তু মেট্রো এত ক্যাপিটাল ইনটেন্সিভ বা ব্যয়বহুল হওয়ার পরও পৃথিবীতে এটাকেই ভিত্তি করে নতুন নতুন শহরগুলো হচ্ছে।
এসব বিবেচনায় মেট্রোকে যদি আমরা একটু সার্বিক বিবেচনায় বানাতে পারতাম, তাহলে এতক্ষণ যে কথাগুলো বললাম, সেগুলো আমাদের অর্জন হতো। কিন্তু আমরা ভূমি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে এর সমন্বয়ই করিনি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) এখানে অনুপস্থিত। রাজউক যে একটা স্পেশাল ড্যাপ দেবে, সেটা কীভাবে? এখন যে শেওড়াপাড়া, সেনপাড়া, মিরপুরে ৬ তলার বেশি আবাসিক ভবন করতে দেওয়া হয় না, মেট্রোর পর তা কি বদলাবে? অন্যান্য দেশে এই মেট্রোর আশপাশে এবং মেট্রো যেই করিডরে থাকে সেখানে পথচারীদের চলাচলের জন্য ফুটপাথগুলো চওড়া থাকে। যাতে লোকজন হাঁটাচলা করতে পারে, স্টেশনে আসতে পারে, যাত্রীরা একসঙ্গে ওঠানামা করতে পারে। স্টেশনের আশপাশে ছোট ছোট গাড়িতে, যেমন রাইড শেয়ার, রিকশা, মাইক্রো, সিএনজি ইত্যাদি যাত্রী নামাতে আসবে; এগুলো যেন মূল সড়কে না দাঁড়ায়, ট্রান্সফার ফ্যাসিলিটিজ দিয়ে মূল রাস্তার থেকে ভেতরের দিকে লোক নামায় সে ব্যবস্থা থাকতে হবে। অন্যান্য দেশের সরকার অধিগ্রহণের দিকে যায় না। এটা সেকেলে হয়ে গিয়েছে। মনে রাখতে হবে মেট্রো হওয়ার পর আশপাশের ভূমির ভ্যালু কিন্তু অনেক বেড়ে যায়। তো এখন যেটা করে সরকার ল্যান্ড ভ্যালুকে ক্যাপচার করে উইন উইন সিচুয়েশন তৈরি করে ভূমির মালিককে গিয়ে বলে ‘তুমি আছ প্লটে, চলো আমরা ব্লকে চলে যাই। তুমি জায়গাটা দাও, তোমার আড়াই কাঠার সাথে আমি আরও সাড়ে তিন কাঠা জোড়া লাগিয়ে ঊর্ধ্বমুখী সম্প্রসারণ করে আমরা পার্টনার হয়ে যাই।’ আমিও ইনকাম করব, তুমিও করবে এবং জনগণের জন্য হাঁটার চাহিদা, ট্রান্সফারের চাহিদা মিটিয়ে, কমার্শিয়াল অ্যাক্টিভিটি করে ইনকাম করব। কেবল মেট্রোর ভাড়া থেকে খরচটা তুলব না। স্টেশনের আশপাশের বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনা করে নন-অপারেশনাল কিছু করে কিছু রেভিনিউ কালেকশন করব। আর মেট্রো ভাড়াকে পানির মতো সস্তা করে দেব। দেখলে মনে হবে যে ফ্রি দেওয়া হচ্ছে। দেউলিয়া হচ্ছি। কিন্তু আসলে তা না। আমি ইনকামের জন্য শুধু যাত্রীর দিকে তাকিয়ে থাকিনি। অভিজ্ঞতা বলছে বাণিজ্যবিতান, বাজার থেকে শুরু করে অফিস, ব্যবস্থাপনা মেট্রো স্টেশনমুখী করলে, সেখান থেকে টাকা ইনকাম সম্ভব। আর সেই টাকা হিসাবে ধরে মেট্রো ভাড়া কমিয়ে মানুষের ওপর চাপ কমানো যায়। আর ভাড়া একদম কমিয়ে রাখলে মানুষও ব্যক্তিগত গাড়ি, অন্যান্য গণপরিবহনের চেয়ে মেট্রোতে চড়তে বেশি আগ্রহী হবে। তখন দেখা যাবে যে নিচের রাস্তা ফাঁকা পড়ে আছে। এজন্য মেট্রোতে চড়ার ভাড়া কমিয়ে সাধারণ মানুষের নাগালে আনার জন্য ভূমির সমন্বিত ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় ঘটাতে হবে। কিন্তু আমরা এটি করিনি। তাই ব্রেকইভেনে আসতে প্রথমেই যাত্রীর থেকে আশপাশের দেশগুলোর চেয়ে বেশি ভাড়া আদায় করার কথা ভাবছি।
আশপাশের দেশগুলোর মধ্যে যারা ২০১৯/২০/২১ সালে মেট্রো উদ্বোধন করেছে আমরা তাদের থেকে প্রায় দুই-তিনগুণ বেশি ভাড়া ধার্য করলাম। যারা এই ভাড়া ঠিক করেছেন তারা যদি একটু আশপাশের দেশগুলোর দিকে তাকাতেন, তাহলে ভালো করতেন। কিন্তু তারা তো সেটা করবেন না। কারণ অন্যদের দিকে তাকালেই দেখতে পারবেন যে, তাদের অদক্ষতার জন্য নির্মাণের সময় এবং খরচ দুটোই বেড়ে গেছে। দেখা যাচ্ছে, অদক্ষতার জন্য বাড়তি খরচ করলাম, মানুষকে ‘উন্নয়ন যন্ত্রণা’ দিলাম, আবার যে বাড়তি খরচ হলো, সেটাও জনগণের ওপর চাপিয়ে দিলাম। ওনারা মাঝে মাঝে সিএনজি অটোরিকশা ভাড়া বা কম্ফোর্টের কথা বলেন। কিন্তু তারা একবারও ভাবেন না যে, মেট্রো মানুষকে ডোর টু ডোর ফ্যাসিলিটি দেবে না। তাহলে বাসা থেকে ফিডার হিসেবে বাহন খরচ ব্যয় করে সে মেট্রো স্টেশনে আসবে। মেট্রো থেকে নামার পরও তার গন্তব্যে যেতে আবার অন্য বাহন নিতে হতে পারে। এখানে একটা ট্রিপের মধ্যে সময় এবং তিনটা ভাড়া খরচের হিসাব প্রতিদিনের জন্য ধরতে হবে। এখন স্বল্প বা নির্দিষ্ট আয়ের মানুষ তাদের কাছে তো দ্রুতগতি ও কম্ফোর্টের চেয়ে প্রতিদিনের খরচের হিসাবটা তো অত্যন্ত জরুরি। এজন্য মেট্রোর ভাড়াটা কৌশলগতভাবে অনেক কমিয়ে রাখা হয়। এজন্য সাবসিডি বা ভর্ভুকি লাগে না।
পাশাপাশি নির্মাণ খরচটাও আমরা অনেক বেশি করে ফেলেছি। জাইকার লোনে পাশের দেশের কলকাতার ইস্ট-ওয়েস্টে যে মেট্রো হলো, সেটাতে ৫৭ মিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছে পার কিলোমিটার করতে। আর আমরা প্রতি কিলোমিটারে খরচ করেছি ১৫৪ মিলিয়ন ডলার। পাকিস্তান আমাদের পরে কাজ শুরু করে প্রায় পৌনে এক বছর আগে তারা মেট্রোর উদ্বোধন করেছে। তাদের প্রতি কিলোমিটারে খরচ হয়েছে ৬৭ মিলিয়ন ডলার। এসব তথ্য এটাই বলে যে, আমরা বেহিসাবিভাবে উন্নয়ন করেছি। এর দায় তো ভাড়া বাড়িয়ে মানুষের ওপর চাপানো ঠিক নয়।
এর ফলে মেট্রোর যে মূলমন্ত্র আমজনতাকে মেট্রোতে তুলে নিচের রাস্তা ফাঁকা করে আমি যানজট কমাব, সেটাই তো হবে না মনে হয়। এটা ঠিক যে, মেট্রো দিয়ে সবার ট্রিপ হবে না, যাত্রাপথ মিলবে না। কিন্তু নিচে যারা থাকবেন তারাও কিন্তু মেট্রো দ্বারা উপকৃত হবেন বলে আশা করা হয়। এখন যেহেতু স্টেশন সমন্বিত হয়নি, রাইড শেয়ারের জন্য আলাদা জায়গা নেই, ফলে বর্তমানে রাজধানীর সড়কগুলোতে বাসগুলো যেমন জটলা পাকিয়ে একটা বটলনেক তৈরি করে, তেমনি প্রতিটি মেট্রো স্টেশনে একটা করে বটলনেক তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে যা ভোগান্তি বাড়াবে। আমি একজনকে কম্ফোর্ট দিতে গিয়ে আরেকজনকে ক্ষতিগ্রস্ত করব, মেট্রোর উদ্দেশ্য তো তা নয়। আমি বলব এখানে অনেক কিছু আশপাশের দেশগুলো থেকে শিখতে হবে। পাকিস্তানের মেট্রো ড্রাইভারলেস। ওদের চেয়ে বেশি খরচে, বেশি সময়ে আমরা যে মেট্রো করলাম সেখানে ড্রাইভার তৈরি, নিয়োগ, প্রশিক্ষণের আরেক বোঝা মাথায় নিলাম।
আসলে এখানে সরকার ও কর্তৃপক্ষের ভাবনাচিন্তার ব্যাপার আছে। আগামীতে আমরা আরও ৫টি মেট্রো করব। এখানে করাটা বড় না, কত টাকায় করলাম; যেহেতু ফেয়ার বা ভাড়ার সঙ্গে রিলেটেড, এটা তো ফ্লাইওভার না যে করে হাত গুটিয়ে নেব তা সম্ভব নয়। যা করলাম তার মাশুল যদি যাত্রীদের ওপর গিয়ে পড়ে, সেটা কাম্য নয়। স্মার্টলি করতে পারলে, কম খরচে, কম সময়ে করতে পারলে তখনই আমজনতা এর সুফল পাবে। সেই জায়গায় এই মেট্রো-৬ একটি সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করছে। সেটা হচ্ছে যারা এটি বানালেন তারা যেন এটার মূল্যায়ন ও বিশ্লেষণ করে পরের প্রকল্প বাস্তবায়ন করেন।
লেখক: যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক
