চ্যালেঞ্জ জয় করে পদ্মা সেতুর স্বপ্ন পূরণের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার নতুন দুয়ার খুলেছে বাংলাদেশ। নদীর দুই তীরে দুই শহরের স্বপ্ন পূরণের কাছাকাছি পৌঁছে গেছে কর্ণফুলীর তলদেশ দিয়ে টানেল করার মধ্য দিয়ে। আজ বুধবার নগর পরিবহনে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে বৈদ্যুতিক ট্রেনের যুগে প্রবেশ করে।
সরকারের অগ্রাধিকারভিত্তিক বড় প্রকল্পগুলোর অন্যতম মেট্রোরেল। এ প্রকল্পের আওতায় ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-৬-এর আওতায় উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত নির্মাণ হবে ২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার উড়াল রেলপথ। উত্তরার দিয়াবাড়ী (উত্তরা উত্তর) থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার পথ থেকে ট্রেন উদ্বোধন হবে আজ।
মেট্রোরেল চালুর মধ্য দিয়ে রাজধানীর মানুষ পাবে যানজটের দুর্ভোগ থেকে মুক্তির পাওয়ার স্বস্তির বার্তা। সেই সঙ্গে যানজটে আটকা পড়ে কর্মঘণ্টা নষ্টের যে আর্থিক ক্ষতি সেটা কেটে যাবে। কমবে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর কার্বন নিঃসরণের মাত্রা। আবাসনসহ বিভিন্ন খাতের ব্যবসার প্রসারে অর্থনীতিতেও প্রাণ সঞ্চার হবে। জীবনযাপনে আসবে ইতিবাচক পরিবর্তন।
যোগাযোগ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রাজধানীর বড় একটা অংশের যাত্রীদের এই মেট্রোরেলে চড়াতে পারলে নগর পরিবহনে সুফল পাওয়া যাবে। আর যানজটের শহরে নিরাপদ একটি বাহন হবে মানুষের জন্য।
মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। রাষ্ট্রায়ত্ত এ কোম্পানি নিজের আয়ে চলার কথা।
ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন ছিদ্দিক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেট্রোরেল শহরের যোগাযোগে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।’
বৈদ্যুতিক ট্রেনের যুগে প্রবেশ : স্বাধীন বাংলাদেশের বায়ান্ন বছরে এসে যোগাযোগের নতুন ব্যবস্থা চালু হচ্ছে। এমআরটি লাইন-৬-এর পর আরও পাঁচটি মেট্রোরেল আসছে।
ডিএমটিসিএল সূত্র জানায়, ২০৩০ সালের মধ্যে ছয়টি মেট্রোরেল নির্মাণকাজ তিন পর্যায়ে শেষ করা হবে। প্রথম পর্যায়ে ২০২৪ সালের মধ্যে এমআরটি লাইন-৬ বা উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্যায়ে ২০২৬ সালের মধ্যে এমআরটি লাইন-১ এবং ২০২৮ সালের মধ্যে এমআরটি লাইন-৫ : নর্দান রুটের নির্মাণকাজ শেষ করা হবে। তৃতীয় পর্যায়ে ২০৩০ সালের মধ্যে এমআরটি লাইন-৫ : সাউদার্ন রুট, এমআরটি লাইন-২ এবং এমআরটি লাইন-৪ নির্মাণকাজ শেষ করা হবে।
এমআরটি লাইন-৬-এর উত্তরা-আগারগাঁও রুটে ট্রেন উদ্বোধনের পরদিন অর্থাৎ ২৯ ডিসেম্বর থেকে চড়তে পারবেন সাধারণ যাত্রীরা। উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত ৯টি স্টেশন। শুরুতে মেট্রোরেল চলবে দিনে চার ঘণ্টা। সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত ট্রেন। উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত চলার সময় ট্রেনগুলো মাঝপথে কোথাও থামবে না। সাপ্তাহিক বন্ধ থাকবে মঙ্গলবার। ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে সর্বনিম্ন ২০ টাকা। উত্তরা-আগারগাঁও ৬০ টাকা। আর মতিঝিল পর্যন্ত ১০০ টাকা।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, শুরুতে ১০ সেট ট্রেন চললেও ধীরে ধীরে মেট্রোরেল চলাচলের সময় ও ট্রেন সংখ্যা বাড়ানো হবে। ২৪ সেট রেল নিয়ে মতিঝিল পর্যন্ত পুরোদমে চলবে দেশের প্রথম উড়াল রেল। ডিএমটিসিএলের তথ্যমতে, মেট্রোরেল ছুটবে সর্বোচ্চ ১০০ কিলোমিটার গতিতে। শুরুর দিকে রাজধানীর উত্তরা উত্তর স্টেশন থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত সময় লাগবে প্রায় ২০ মিনিট। পরে যাত্রার সময় ১৬ থেকে ১৭ মিনিটে নেমে আসবে। উত্তরা উত্তর ও আগারগাঁও স্টেশনে যাত্রী পরিবহনে থাকছে শাটল বাস সার্ভিস।
উত্তরা থেকে কমলাপুর পর্যন্ত ১৭টি স্টেশনের মধ্যে তিনটি আইকনিক স্টেশন। জাপানের আদলে তৈরি হচ্ছে এসব স্টেশন। নান্দনিক এসব স্টেশনে থাকছে যাত্রীদের অত্যাধুনিক সেবার সব সুবিধা। স্থায়ী পাস ব্যবহারকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেওয়ারও পরিকল্পনা রয়েছে কর্তৃপক্ষের। অন্য স্টেশনগুলোতে থাকছে বিপণিবিতান, সময় কাটানোর হোটেল, রেস্টুরেন্ট, কফিশপ ও বিনোদন কেন্দ্র। অসুস্থ এবং প্রতিবন্ধীদের ওঠানামার জন্য থাকছে লিফট, সঙ্গে এক্সেলেটরও। ভ্রমণের জন্য থাকছে স্থায়ী ও অস্থায়ী দুই ধরনের র্যাপিড পাস।
মেট্রোরেল চলবে বিদ্যুতে। তবে গ্রিড বিপর্যয় হলেও তাতে বন্ধ হবে না। ট্রেন চলাচলের জন্য নিজস্ব বিদ্যুৎ-ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। এর জন্য উত্তরার ডিপোয় সাবস্টেশন স্থাপন করা হয়েছে। এ ছাড়া উত্তরার দিয়াবাড়ীতে মেট্রোরেল ডিপোতে একটি পরিচালন নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র (ওসিসি) স্থাপন করা হয়েছে। সেখানে ট্রেন কোথায় কখন থামবে অথবা কত গতিতে চলবে এসব স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ঠিক করে দেওয়া হবে।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সহকারী পরিচালক ও যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ সাইফুন নেওয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেট্রোরেল একটি পরীক্ষিত যাতায়াতমাধ্যম। এটিকে বহুল ব্যবহৃত করতে চাইলে ভাড়া নির্ধারণের বিষয়টি একটু বিবেচনা করা উচিত। এখন যে ভাড়া আছে সেটি যারা প্রাইভেট কারে যাতায়াত করে তাদের জন্য ঠিক আছে। কিন্তু শুধু প্রাইভেট কারের যাত্রীরা যদি এটি ব্যবহার করে, অন্য মাধ্যমে যারা যাতায়াত করে তারা না চড়লে যানজটের সমস্যা সমাধান হবে না।’ তিনি মনে করেন, মোটরসাইকেলের যাত্রীদের টার্গেট করা উচিত। এ বাহনটি ৬০ শতাংশ মানুষ ব্যবহার করে। তাদের দিক বিবেচনা করে হলেও যদি ভাড়া সমন্বয় করে কিছুটা কমানো যায় তাহলে ভালো হয়।
তিনি আরও বলেন, ‘মেট্রোরেলের স্টেশনগুলোর আশপাশে যেন অন্য যানবাহনের যানজট লেগে না থাকে সেগুলোও মনিটরিং করা দরকার। সব স্টেশনে চলন্ত সিঁড়ি ব্যবহার করা উচিত। তাহলে সব বয়সীর মানুষ এ মেট্রোরেলে যাতায়াত করতে পারবে।’
বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মেট্রোরেল চালু হলেও পুরো কাজ না শেষ করে অর্ধেক চালুর ফলে সেভাবে সুফল পাওয়া যাবে না। তাছাড়া সরকারের উচিত মেট্রোরেলের ভাড়া কমানো। তাহলে বেশিরভাগ যাত্রী চড়বে। তাহলে যানজটও কমবে।’
প্রকল্প : ২০১২ সালে মেট্রোরেল প্রকল্প নেওয়া হয়। জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার সঙ্গে ঋণচুক্তি হয় পরের বছর। মূল কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালে। প্রথমে উত্তরা (দিয়াবাড়ী) থেকে মতিঝিল পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছিল ২১ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা। এরপর কমলাপুর পর্যন্ত যুক্ত হওয়ায় এর ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৩ হাজার ৪৭২ কোটি টাকায়। এর মধ্যে জাইকা ১৯ হাজার ৭১৯ কোটি টাকা দিচ্ছে আর সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে খরচ করবে ১৩ হাজার ৭৫৩ কোটি টাকা।
উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল প্রকল্পের মেয়াদ ছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে মতিঝিল ছাড়িয়ে মেট্রোরেলের রুট কমলাপুর পর্যন্ত বর্ধিত করায় কাজ শেষ করতে আরও প্রায় এক বছর সময় বেশি লাগতে পারে বলে জানাচ্ছে কর্তৃপক্ষ।
প্রকল্পের কাজের অগ্রগতি : গত মাস (নভেম্বর) শেষে এমআরটি লাইন-৬ প্রকল্পের সার্বিক গড় অগ্রগতি হয়েছে ৮৪.২২ শতাংশ। প্রথম পর্যায়ে নির্মাণের জন্য নির্ধারিত উত্তরা থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত পূর্ত কাজের অগ্রগতি ৯৫ শতাংশ। দ্বিতীয় পর্যায়ের নির্মাণের জন্য নির্ধারিত আগারগাঁও থেকে মতিঝিল অংশের পূর্ত কাজের অগ্রগতি ৮৫.৭৬ শতাংশ। ইলেকট্রিক্যাল ও মেকানিক্যাল সিস্টেম এবং রোলিং স্টক (রেলকোচ) ও ডিপো ইকুইপমেন্ট সংগ্রহ কাজের সমন্বিত অগ্রগতি ৮৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
