মস্কো ওয়াশিংটন কি পারমাণবিক যুদ্ধে জড়াবে

আপডেট : ২৯ ডিসেম্বর ২০২২, ১২:১০ এএম

ইউক্রেন যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার বিরোধ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই বিরোধ শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক যুদ্ধ ডেকে আনতে পারে। চূড়ান্ত পরিস্থিতিতে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার নিয়ে মস্কো ও ওয়াশিংটন একে অপরকে সতর্ক করে চলছে। শেষ পর্যন্ত এই দুই পরাশক্তি কি পারবে পরমাণু অস্ত্রের ব্যবহার বন্ধ করতে। লিখেছেন নাসরিন শওকত

কাজে আসেনি পুতিনের আহ্বান

কারও কারও বিশ্বাস, মস্কো ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার বিরোধ শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক যুদ্ধ ডেকে আনতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আশা করেন, এ ধরনের বিবৃতি ব্ল্যাকমেইল করা ছাড়া আর কিছুই নয়। দ্রুত বা দেরিতে যা হোক না কেন, এ ধরনের বক্তব্য জটিল পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।

২০০০ সালে ভøাদিমির পুতিন প্রথমবারের মতো রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেওয়ার প্রথম বছরেই পুতিন প্রস্তাব করেনরাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র তাদের পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনবে। যার মাত্রা হবে দেড় হাজার ইউনিট। তখন তিনি আরও উল্লেখ করেছিলেন, ক্ষেপণাস্ত্র কমিয়ে আনার কর্মসূচিটি ২০০৮ সালের মধ্যে শেষ করা বাস্তবসম্মত হবে। পুতিনের মতে, রাশিয়ার জন্য তার কৌশলগত আক্রমণাত্মক অস্ত্র আরও কমিয়ে আনতে কোনো বাধা নেই। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তবে এখন প্রধান কাজ হলো রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের একসঙ্গে চলা শুরু করা। অথবা দেরি না করে একসঙ্গে মিলে উল্লেখযোগ্য হারে পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা কমানো শুরু করা।’

প্রেসিডেন্ট পুতিনের এই ইতিবাচক প্রস্তাবে কখনোই মনোযোগ দেওয়া হয়নি। এরই মধ্যে কেটে গেছে ২২ বছর। স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (এসআইপিআরআই) তথ্য মতে, ২০২২ সালের শুরুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কাছে বিশে^র সর্ববৃহৎ পারমাণবিক অস্ত্রের মজুদ ছিল। এর মধ্যে সতর্কাবস্থার জন্য ১ হাজার ৭৭৭টি ওয়ারহেড ক্ষেপণাস্ত্রের ওপর স্থাপন করা হয়েছে। নয়তো বিভিন্ন ঘাঁটিতে অভিযান চালানোর জন্য মোতায়েন করা হয়। জল, স্থল ও আকাশেএই তিন দিকে উৎক্ষেপণযোগ্য পূর্ণাঙ্গ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের, যা নিয়ে গর্ববোধ করে থাকে তারা। এদিকে ফেডারেশন অব আমেরিকান সায়েন্টিস্টের (এফএএস) তথ্য মতে, রাশিয়ার মাত্র ১ হাজার ৫৮৮টি ক্ষেপণাস্ত্র মোতায়েন করা আছে। তবে দেশটির মজুদ ওয়াশিংটনের চেয়েও বেশি। রাশিয়ার রয়েছে ৫ হাজার ৯৭৭টি। সে তুলনায় ওয়াশিংটনের রয়েছে মাত্র ৫ হাজার ৪২৮টি ক্ষেপণাস্ত্র। অন্যসব পরমাণু রাষ্ট্রের সংগ্রহেও অল্পবিস্তর পারমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র রয়েছে। এসআইপিআরআইয়ের ২০২২ সালের তথ্য মতে, ফ্রান্সের কাছে আছে ২৯০টি ক্ষেপণাস্ত্র। যার মধ্যে ১০টি মোতায়েন করা আছে । অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের রয়েছে ২২৫টি। আর ৬০টি মোতায়েন করা আছে। চীনের পরমাণু অস্ত্র সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানা যায় না। বিশ^াস করা হয় যে, এ বছরের শুরুর দিকে চীনের ক্ষেপণাস্ত্রের সংখ্যা ছিল ৩৫০টিরও বেশি। আমেরিকান ফেডারেশন অব সায়েন্টিস্টের এক প্রতিবেদনের  শেষে বলা হয়েছে, পেইচিং তার পরমাণু অস্ত্র মজুদের সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, পারমাণবিক অস্ত্রের এই ক্লাবে মূল উত্তেজনা মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়াকে ঘিরে। অনেকের কাছেই পরিস্থিতি অস্থিতিশীল বলে মনে হয়। মস্কো ও ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে আসা ক্রমবর্ধমান সাংঘর্ষিক বিবৃতি এই অস্থিতিশীলতায় বিশেষ ভূমিকা রাখছে।

উত্তপ্ত পরিস্থিতি

ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরু হওয়ার প্রেক্ষাপটে বিশ^জুড়ে পারমাণবিক যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। এই আলোচনা প্রথম জোর পায় এ বছরের ২৭ ফেব্রুয়ারি। ওইদিন পুতিন তার বিভিন্ন বাহিনীকে বিশেষ যুদ্ধ সতর্কতায় থাকার নির্দেশ দেন। রাশিয়ার সশস্ত্র বাহিনীর যুদ্ধশক্তির মূল ভিত্তি তার কৌশলগত প্রতিরোধ বাহিনী। যে বাহিনীর মূল দায়িত্ব রাশিয়া ও তার মিত্রদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন চালানো যেকোন বাহিনীকে প্রতিহত করা। এর পাশাপাশি আগ্রাসী বাহিনীকে পরাস্ত করা ও পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সক্ষমতা বজায় রাখা। এখানে একটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে লক্ষ করা প্রয়োজন। মস্কো বারবার বলেছে, তার প্রতিরোধমূলক কোনো অভিযানে তাদের দেশের পরমাণু ব্যবহারের কোনো নীতি নেই। এমন নিশ্চয়তা খোদ তাদের প্রেসিডেন্ট পুতিনই দিয়েছেন। অর্থাৎ, যদি কোনো আগ্রাসী রাশিয়ার ভূখণ্ডে পারমাণবিক হামলা চালায়, অথবা কোনো চলমান হামলায় তার রাষ্ট্রের অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ে, শুধু তখনই পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার করা হবে।

পুতিনের এমন অভয়বাণীতেও আশ^স্ত হতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা। বারবার তারা সেই একই প্রশ্ন উত্থাপন করে চলেছেন যে, তবে কি রাশিয়া তার পরমাণু-সমৃদ্ধ প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে সত্যিকারের একটি পারমাণবিক যুদ্ধ হওয়া সম্ভব? এই প্রশ্নের শুরু এ বছরের আগস্টে। তৎকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রী প্রার্থী লিজ ট্রাস বলেছিলেন, প্রয়োজন হলে তিনি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করবেন। এর পরপরই মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিনকেন বলেন, শুধু জরুরি পরিস্থিতির উদ্ভব হলেই ওয়াশিংটন তার পরমাণু অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়টি বিবেচনা করবে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্র ও অংশীদারদের গুরুত্বপূর্ণ স্বার্থ রক্ষার প্রয়োজনে বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

এরপর আবার সম্ভাব্য পারমাণবিক সংঘাতের কথা উঠে আসে ২১ সেপ্টেম্বর। তখন পুতিন বলেন, রাশিয়া তার আঞ্চলিক অখণ্ডতার জন্য হুমকির সম্মুখীন হলে তা নিষ্পত্তির জন্য সব উপায় ব্যবহার করবে। এই মন্তব্যের মধ্য দিয়ে পুতিন এ বিষয়টির দিকে ইঙ্গিত করেছেন যে, রাশিয়ার ভূখণ্ডে যুদ্ধে ছড়িয়ে দিতে ওয়াশিংটন সরাসরি কিয়েভকে চাপ দিচ্ছে। পুতিন আরও উল্লেখ করেন, পশ্চিমা দেশগুলো প্রকাশ্যেই বলে যে, যুদ্ধক্ষেত্রে যেকোনো উপায়েই রাশিয়াকে পরাস্ত করা উচিত। এমনকি অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সাধারণভাবে যেকোনো সার্বভৌমত্ব থেকেই বঞ্চিত করা দরকার। প্রেসিডেন্ট পুতিনের তথ্য মতে, পশ্চিমারা পারমাণবিক ব্ল্যাকমেইল ব্যবহার করছেন। এ সময় তিনি রাশিয়ার বিরুদ্ধে গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা ও অনুমতি সম্পর্কে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোর উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের বক্তব্যের দিকে ইঙ্গিত করেন। তিনি বলেন, ‘আমি তাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে এমন বিবৃতি দিতে উৎসাহিত বোধ করছেন : ‘আমাদের দেশের সংগ্রহেও অসংখ্য গণবিধ্বংসী অস্ত্র রয়েছে এবং এর মধ্যে কিছু উপকরণ আছে, যা ন্যাটোর ওই দেশগুলোর চেয়েও আধুনিক। যদি আমাদের আঞ্চলিক অখণ্ডতা হুমকির মুখে পড়ে তাহলে সুনিশ্চিতভাবেই আমরা রাশিয়া ও তার জনগণকে রক্ষায় সব উপায়ের ব্যবহার করব। এটি কোনো ধাপ্পাবাজি নয়।’

পুতিনের এমন হুঁশিয়ারির পর যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা জেক সুলিভান মার্কিন টেলিভিশন সিবিএসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি বলেন, পারমাণবিক অস্ত্রের সম্ভাব্য ব্যবহার নিয়ে মস্কোকে জবাব দেবে ওয়াশিংটন। তিনি আরও উল্লেখ করেন, রাশিয়াকে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের বিপর্যয়কর পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছে হোয়াইট হাউজ।  গেল ৭ অক্টোবর। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলোনস্কি ন্যাটোকে রাশিয়ার ভূখণ্ডে প্রি-এম্পটিভ অভিযান চালানোর আহ্বান জানান। কিন্তু এর পরদিনই তিনি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের ইঙ্গিত করার কথা অস্বীকার করেন। এ প্রসঙ্গে তিনি ব্যাখ্যা করেন, ওই বিবৃতির মধ্য দিয়ে তিনি পরমাণু যুদ্ধ প্রতিরোধের জন্য পশ্চিমা দেশগুলোকে নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করার কথা বলেছিলেন। পরে জেলোনস্কি তার বিশ^াসের পুনরাবৃত্তি করে জানান, ইউক্রেন যুদ্ধে পুতিন পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার করবেন না বলে বিশ^াস করেন তিনি। ২৭ অক্টোবর পুতিন নিজেও বলেন, ইউক্রেনের ওপর পারমাণবিক হামলা চালানোর রাশিয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত না এর রাজনৈতিক বা সামরিক প্রয়োজন দেখা দেয়। তিনি রাশিয়ার পরমাণু নীতির ওপর জোর দেন। যেখানে তিনি পরিষ্কার করেন যে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার হতে পারে।

পারমাণবিক যুদ্ধ কি সম্ভব

তবে সুখের কথা হলো, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা ধারণা করেন, যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার পক্ষে প্রকৃত অর্থে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করার সম্ভাবনা কম, এমনকি কার্যত তা অসম্ভব। রাশিয়ান অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের সেন্টার ফর সিকিউরিটি স্টাডিজ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয় নিয়ে গবেষণা করেন। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান গবেষকদের একজন কনস্ট্যান্টিন ব্লোখিন। রাশিয়ার ওপর পারমাণবিক হামলার সম্ভাবনার বিবৃতিকে প্রত্যাখ্যান করে গবেষক ব্লোখিন বলেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র তথ্যগত ও মনস্তাত্ত্বিক চাপকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে ব্ল্যাকমেইল করছে। এর উদ্দেশ্য রাশিয়াকে একটি স্পষ্ট সংকেত পাঠানো যে, যদি সে তার বিশেষ সামরিক অভিযান বন্ধ না করে, তাহলে এবার তৃতীয় একটি বিশ^যুদ্ধ অর্থাৎ পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে। কিন্তু সমস্যা হলো, যদি শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধ বেধেই যায়, তাহলে তা হবে মানবজাতির ইতিহাসের সবশেষ যুদ্ধ। সভ্যতা আবার সেই প্রস্তর যুগে ফিরে যাবে। কনস্ট্যান্টিন ব্লোখিন রুশ সংবাদমাধ্যম আরটিকে বলেন, ‘এতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যেমন হারানোর কিছু আছে, তেমনি প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু হারানোর আছে। শেষ পর্যন্ত তারা কোনো যুদ্ধই শুরু করবে না এবং নিশ্চিতভাবেই ইউক্রেনের জন্য তো নয়ই। ইউক্রেন তাদের কাছে প্রতিরোধের একটি যন্ত্র মাত্র, আমাদের সীমান্তে উত্তেজনা জারি রাখার একটি জ¦লন্ত ক্ষেত্রের চেয়ে বেশি কিছু নয়।’

এ সময় তিনি প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রিগ্যানের সময়কার একই ধরনের একটি কর্মসূচির কথা তুলে ধরেন। ‘স্টার ওয়ার্স’ নামের ওই কর্মসূচির মাধ্যমে একটি বিশাল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল তখন। যার অংশ ছিল লেজারভিত্তিক সশস্ত্র স্যাটেলাইট, আকাশ ও স্থলপথে ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরোধব্যবস্থা এবং ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক রেইলগান। যার মূল লক্ষ্য ছিল ইউএসএসআর বা অন্য সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের দ্বারা উৎক্ষেপণ করা আন্তঃমহাদেশীয় ব্যালাস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা। তখন ওয়াশিংটনের প্রত্যাশা ছিল, ওয়াশিংটনের বিরুদ্ধে বড় আকারের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্র তার বিশাল প্রতিরক্ষাব্যবস্থা দিয়ে তা ধ্বংস করে দেবে। ইউএসএসআরকে সম্ভাব্য এই পরিণতির সত্যটি তারা মেনে নিতে বাধ্য করবে যে, একটি পারমাণবিক সংঘর্ষ বাধলে তাতে হতাশ হওয়া ছাড়া আর কিছু থাকবে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে গবেষক ব্লোখিন বলেন, ‘তখনকার পরিস্থিতির সঙ্গে আজকের পরিস্থিতির খুব সাদৃশ্য রয়েছে। কিন্তু সেই সময় যুক্তরাষ্ট্র যা বোঝাতে চেয়েছিল, আমরা তা বিশ^াস করেছিলাম। আর এখন লক্ষ্য হলো, আমাদের ভয় দেখানো যাতে রাশিয়া তার কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেয়। মোদ্দা কথা হলো, কোনো পক্ষই শুধু ইউক্রেনের জন্য পারমাণবিক যুদ্ধ শুরু করবে না।’

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ওপর গবেষণা করে থাকে রাশিয়ান অ্যাকাডেমি অব সায়েন্সের ইউএস অ্যান্ড কানাডিয়ান স্টাডিজ বিভাগ। ইনস্টিটিউটির জ্যেষ্ঠ গবেষক ভøাদিমির ভাসিলিয়েভের মতে, এভাবে প্রকাশ্যে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের বিষয় উত্থাপন করা হলে তা হবে অনাহূত তাড়াহুড়ো ও এক ধরনের পাগলামি। এখানে মূল প্রশ্ন হলো, কিউবার ক্ষেপণাস্ত্র সংকটের লাইন ধরে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা কতটুকু। ভাসিলিয়েভের মতে, ‘আমেরিকার প্রত্যাশা, রাশিয়ার এই সামরিক অভিযান কিয়েভ ও পশ্চিমা জোটের পক্ষেই কাজ করবে। সেই সঙ্গে ইউক্রেনে পাঠানো কোটি কোটি ডলার সহায়তা রাশিয়াকে কৌশলগত পরাজয়ের দিকে নিয়ে যাবে। যার কোনো যুক্তিই নেই।’ রুশ গবেষক ভøাদিমির ভাসিলিয়েভ আরটিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, এরই পরিপ্রেক্ষিতে তুলনামূলক একটি শান্ত বা স্থবির পরিস্থিতির প্রশ্ন ওঠে। প্রকৃতপক্ষে পশ্চিমারা প্রত্যাশা করছে, এই পরিস্থিতি অদূর ভবিষ্যতে আরও উত্তেজনা বাড়াতে সক্ষম হবে এবং শেষ পর্যন্ত তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাতে পারে। আর যখন তা ঘটবে, তখন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারই হবে শেষ অবলম্বন।’ তিনি আরও বলেন, যদি পশ্চিমারা ইউক্রেনে রাশিয়ার শীতকালীন অভিযানকে সফল বলে মনে করে, তবেই তারা এই হুমকির আশ্রয় নেবে। তবে পশ্চিমারা এতে কীভাবে প্ররোচিত হবে, তা সঠিকভাবে বলা মুশকিল। কিন্তু বিশ^কে একটি পারমাণবিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দেওয়া, একটি নির্দিষ্ট গুণগত পর্যায়ে সংঘাতটিকে নিয়ে যাওয়া এবং রাশিয়াকে পিছু হটতে বাধ্য করার বিষয়টি এখন আলোচনা করা উচিত। তিনি আরো উল্লেখ করেন, ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেনে যখন সামরিক আক্রমণ শুরু হয়েছিল, তখন থেকে এই সংঘাতের মৌলিক কোনো পরিবর্তন হয়নি। এখন ইউক্রেনকে সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের সুযোগও কমে আসছে। ইউক্রেনের আর্থিক অবকাঠামো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে এবং সংঘাতও সংকর হয়ে উঠছে। এমন প্রেক্ষাপটে একটি পারমাণবিক পিস্তল তাক করার পশ্চিমা চেষ্টা খুব সম্ভাবনাময় হয়ে উঠেছে।

রুশ গবেষক ভøাদিমির ভাসিলিয়েভ আরও বলেন, ‘পশ্চিমারা এটি দেখতে বিশ^কে একটি বৈশি^কে সংঘাতের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে পারে যে, কে প্রথমে জ¦লে ওঠে এবং এ ঘটনাকেই ইউক্রেনে বিশেষ সামরিক অভিযানের কৌশলগত দিক পরিবর্তনের উপাদান হিসেবে তারা ব্যবহার করতে পারে। সম্ভবত পশ্চিমারা সত্যিকার অর্থেই এ ধরনের পরিকল্পনাকে এখন বিবেচনা করছে। যার পেছনে কাজ করছে জটিল অর্থনৈতিক সমীকরণ।’

নিরস্ত্রীকরণের সম্ভাবনা কতটা

২০০৭ সাল। রুশ প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে প্রথমবারের মতো নিরস্ত্রীকরণের বিষয়টি উত্থাপন করেন, যা আজও প্রাসঙ্গিক। এরই মধ্যে কেটে গেছে দেড় যুগ। তারপর থেকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে রয়েছে মধ্যম-পাল্লার ও স্বল্প-পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র নির্মূল করার জন্য উন্মুক্ত আকাশ চুক্তি ও আইএনএফ (ইন্টারমিডিয়েট-রেঞ্জ নিউক্লিয়ার ফোর্সেস ট্রিটি) চুক্তি বাতিল। বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করেন, এরই মধ্যে নিরস্ত্রীকরণ সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তিগুলোর সম্পূর্ণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মধ্যে বর্তমানে শুধু একটি দ্বিপক্ষীয় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি অবশিষ্ট রয়েছে। ২০২৬ সাল পর্যন্ত কার্যকর থাকা নতুন এই চুক্তি হলো, মেজারস ফর দ্য ফারদার রিডাকশন অ্যান্ড লিমিটেশন অব স্ট্র্যাটেজিক ওফেনসিফ আর্মস (নিউ স্টার্ট)। নিরস্ত্রীকরণের বিষয়ে নিরাশ গবেষক ভøাদিমিরি ভাসিলিয়েভ বলেন, ‘পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের কোনো সম্ভাবনাই নেই। আন্তর্জাতিক চুক্তির নিয়ম হিসেবে তারা একতরফাভাবে তাদের পারমাণবিক শক্তির আধুনিকায়ন করে চলেছে। তাই পারমাণবিক সংঘাতের আশঙ্কার দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে দেখা যায়, আজ নিরস্ত্রীকরণ নিয়ে কথা বলার কোনো মানেই নেই।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত