বুধবার, ১৭ জুলাই ২০২৪, ২ শ্রাবণ ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

ব্লকচেইন আঁধারে পুলিশ

আপডেট : ৩১ ডিসেম্বর ২০২২, ০৪:১৮ এএম

আধুনিক মুদ্রা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনছে বিটকয়েনের মতো ভার্চুয়াল মুদ্রা। ব্লকচেইন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভার্চুয়াল বাস্তবতায় অন্তত দুই হাজার প্রতিষ্ঠান এসব মুদ্রার লেনদেন করছে। বেশ কয়েকটি দেশে এসবের প্রচলন শুরু হলেও বাংলাদেশ এখনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারেনি। তবে দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অবৈধ লেনদেন হচ্ছে বলে জানা গেছে। ভার্চুয়াল মুদ্রা লেনদেনকারীদের গ্রেপ্তার করছে পুলিশ; অভিযুক্ত করছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে।

বাংলাদেশ ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) কাছ থেকে তথ্য নিয়ে মানি লন্ডারিং আইনে অনুসন্ধান চালাচ্ছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তবে দুই বছর পেরিয়ে গেলেও এখনো অনুসন্ধান শেষ করতে পারেনি তারা।

ক্রিপ্টোকারেন্সি হলো ভার্চুয়াল মুদ্রা যা ডিজিটাল ওয়ালেটে বা আইডির মাধ্যমে লেনদেন করা হয়। এই কারেন্সির লেনদেনের তথ্য ব্লকচেইন নেটওয়ার্কের মাধ্যমে সুরক্ষিত থাকে। ব্লকচেইন তথ্য সংরক্ষণের একটি ডিজিটাল পদ্ধতি। এর মাধ্যমে বিভিন্ন ব্লকে একটির পর একটি তথা চেইনের মতো করে তথ্য সংরক্ষণ করা হয়। এসব মুদ্রার লেনদেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তদারকিতে থাকে না। ব্যবহারকারীরা পরিচয় প্রকাশ না করে সরাসরি লেনদেন করে।

গত বছরের মে মাসে বিটকয়েন লেনদেনের অভিযোগে রাজধানীর উত্তর বাড্ডা থেকে ১২ জনকে আটক করে র‌্যাব। তাদের কাছ থেকে ২৯টি কম্পিউটার, ৩টি ল্যাপটপ, ১৫টি মোবাইল ফোন এবং নথিপত্রসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করে। র‌্যাবের পক্ষ থেকে বলা হয়, গ্রেপ্তার সুমন বাড্ডায় ৩২ জন কর্মচারী নিয়ে বিটকয়েনের ব্যবসা করেছে। সে ঢাকায় দুটি ফ্ল্যাটসহ প্লট ও সুপার শপের মালিক হয়েছে।

বলা হয়, এই ১২ জন দেশের সবচেয়ে বড় বিটকয়েনের লেনদেনকারী গ্রুপ। র‌্যাব দাবি করে, তদন্তে গ্রুপটির বিটকয়েন লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য জানা গেছে। এরপর বাড্ডা থানায় করা র‌্যাবের মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সিআইডিকে। এখনো তদন্ত শেষ করতে পারেনি সিআইডি ঢাকা মেট্রো উত্তর।

সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে, তদন্তের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ফরেনসিক রিপোর্ট। জব্দ করা ডিভাইসগুলো সংশ্লিষ্ট ইউনিটে পাঠানোর পর এখনো ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। ফলে তদন্ত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

একই মামলায় মানি লন্ডারিং আইনে অনুসন্ধান করছে সিআইডির ফিনান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট। তবে এখনো তারা মামলা দায়ের করতে পারেনি। সংশ্লিষ্টরা জানায়, এখন পর্যন্ত দুটি ভার্চুয়াল ওয়ালেটের সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে এগুলোতে কী পরিমাণ লেনদেন হয়েছে তা প্রমাণ করার উপায় তাদের জানা নেই। অভিযুক্তরা নিজেদের মধ্যে বিটকয়েন লেনদেনের বিষয়ে যেসব বার্তা আদান-প্রদান করেছে তাও মামলা করতে সহায়ক হবে। মানি লন্ডারিং আইনে ওয়ালেটের লেনদেনের তথ্য ছাড়া মামলা দুর্বল হবে। ব্যাংকিং চ্যানেলে লেনদেন না করায় এর তথ্য পাওয়ার সম্ভাবনা নেই। ফলে ওয়ালেট দেখিয়ে চার্জশিট করা ছাড়া বিকল্প নেই।

ভার্চুয়াল কারেন্সি লেনদেনের অন্য ঘটনাগুলোর অনুসন্ধান শুরু করেছে ফিনান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট। তবে অনুসন্ধান শেষ করে মামলা দায়ের করতে পারেনি তারা। সিআইডির ফিনান্সিয়াল ক্রাইমের বিশেষ পুলিশ সুপার হুমায়ুন কবির দেশ রূপান্তরকে বলেন, বিটকয়েন লেনদেনের একটি মামলার অনুসন্ধান প্রায় শেষের দিকে। শিগগির মামলা দায়ের করে বিস্তারিত তদন্ত শুরু করা হবে।

পুলিশের অন্য ইউনিটগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখন পর্যন্ত ক্রিপ্টোকারেন্সি লেনদেনের অভিযোগে ২৮ জনের বেশি লোককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন ইউনিটে মামলার তদন্ত চলছে। অধিকাংশ মামলার তদন্তই ফরেনসিক প্রতিবেদন না পাওয়ায় আটকে আছে। ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগ বেশ কয়েকটি মামলার তদন্ত শেষ করেছে। কেবল ওয়ালেট শনাক্ত করেই আদালতে অভিযোগপত্র দিয়েছে তারা। এ বিষয়ে ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ তারেক বিন রশিদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও মত জানা যায়নি। 

পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ব্লকচেইননির্ভর মুদ্রা লেনদেন অনেক বেড়েছে। ভার্চুয়াল মুদ্রার মাধ্যমে অপরাধীরাও লেনদেন করছে। প্রযুক্তির নতুন এই বিষয় নিয়ন্ত্রণে পুলিশের দক্ষতা নেই বললেই চলে, তাই যথাযথ তদন্ত হচ্ছে না। প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ডিভাইস ছাড়া এসব মামলার তদন্ত বা অনুসন্ধান গতি পাবে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. বি এম মইনুল হোসেন বলেন, পুলিশের উচিত বিটকয়েনের মতো মাধ্যম ব্যবহার করে অবৈধ লেনদেন প্রতিরোধে আলাদা টিম করা, যারা এসব বিষয়ে প্রযুক্তিতে দক্ষ হবে। অর্থ পাচারের বিষয়ে যারা অনুসন্ধান করছে তাদেরও প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ডিভাইস দেওয়া দরকার।

তিনি বলেন, পুলিশ শুধু ওয়ালেট শনাক্ত করেই তদন্ত শেষ করছে। নিজেরা দক্ষ হয়ে উঠতে না পারলে দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। তাদের উচিত যারা এসব বিষয়ে এক্সপার্ট তাদের সহযোগিতা নেওয়া।

ফরেনসিক পরীক্ষায় সিআইডির সক্ষমতা রয়েছে বলে দাবি করে সিআইডির ফরেনসিক শাখার বিশেষ পুলিশ সুপার ড. মো. নাজমুল করিম খান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি সংশ্লিষ্ট মামলার ফরেনসিক পরীক্ষার সক্ষমতা আমাদের আছে। তবে কী ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করে পরীক্ষা করছি তা গোপনীয়। আমাদের কাছে আসা ক্রিপ্টোকারেন্সি সংক্রান্ত মামলার রিপোর্ট দিয়ে দিয়েছি। কোনো রিপোর্ট ঝুলে নেই।

বছরের শুরুতে একটি গোয়েন্দা সংস্থার ক্রিপ্টোকারেন্সি সংক্রান্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চিঠি পাঠায় পুলিশ সদর দপ্তরে। তাতে পুলিশের সাইবার ইউনিট এবং গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যদের প্রশিক্ষণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও সফটওয়্যার সংগ্রহের মাধ্যমে প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জনের জন্য সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়।

চিঠিতে বিটকয়েনের ব্যবহারকারী ও ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনতে নির্দেশনার পাশাপাশি বিটকয়েনের প্রযুক্তি সম্পর্কিত জ্ঞানলাভে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী, আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে বলা হয়।

তখন পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে ইন্টারপোল ও এফবিআইয়ের সঙ্গে সিআইডির কর্মকর্তারা একাধিক বৈঠক করেছে। এসব অপরাধ নিয়ন্ত্রণে তারা প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেবে। তবে নজরদারির সরঞ্জামাদির দাম অনেক বেশি হওয়ায় এখনই তা কেনা হবে না। এ ছাড়া ডার্কওয়েব ও ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে দক্ষিণ কোরিয়া বাংলাদেশকে তিন বছরের প্রশিক্ষণ দেবে বলেছে। এসব বিষয়ে এখন পর্যন্ত উদ্যোগ নেই।

বাংলাদেশ ব্যাংক ২০১৭ সালে বিটকয়েনের মতো কৃত্রিম মুদ্রায় লেনদেন করা থেকে বিরত থাকার বিষয়ে একটি সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল। বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছিল, ভার্চুয়াল মুদ্রায় লেনদেনে অর্থ পাচার ও সন্ত্রাসে অর্থায়ন প্রতিরোধ সংক্রান্ত আইনের লঙ্ঘন হতে পারে। এর পরেও সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেছে তারা।

ক্রিপ্টোকারেন্সিকে একেবারে নাকচ না করার ব্যাপারে কথাবার্তা চলে সংস্থাগুলোর মধ্যে। সরকারের ইনফরমেশন অ্যান্ড কমিউনিকেশন টেকনোলজি ডিভিশন ২০২০ সালের মার্চে ন্যাশনাল ব্লকচেইন স্ট্র্যাটেজি প্রণয়ন করে। কৌশলপত্রে তারা বলে, ব্লকচেইন স্টার্টআপে ২০১৩ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বিনিয়োগ হয়েছে। ভবিষ্যতে এটা বাড়তে পারে। বাংলাদেশি সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রির জন্য এটা একটা সুযোগ। ক্রিপ্টোকারেন্সির ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকায় বাংলাদেশের সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রি এ সুযোগ কাজে লাগাতে পারছে না।

স্ট্র্যাটেজিতে বলা হয়, যথাযথ প্রযুক্তি, আইন ও নীতিকাঠামোর অভাবে এ ধরনের ডোমেইন দেশে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের পথ উন্মুক্ত করে দিতে পারে। এই উভয় সংকট কীভাবে মোকাবিলা করা যায় তা নিয়ে ভাবা উচিত।

গত বছর একটি মামলার তদন্ত করতে গিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি নিয়ে সিআইডি অভিমত চেয়েছিল বাংলাদেশ ব্যাংকের। বাংলাদেশ জবাবে বলে, ক্রিপ্টোকারেন্সির মালিকানা, সংরক্ষণ বা লেনদেন স্বীকৃত না হলেও এটিকে অপরাধ বলা যায় না। তবে বৈদেশিক মুদ্রা নিয়ন্ত্রণ আইন, সন্ত্রাসবিরোধী আইন ২০০৯ এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২-এর আওতায় অপরাধ গণ্য হতে পারে।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত