চীন ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়া করোনার নতুন উপধরন ‘বিএফ-৭’ বাংলাদেশেও পাওয়া গেছে। গত সোমবার চীন থেকে আসা করোনায় আক্রান্ত দেশটির চার নাগরিকের মধ্যে একজনের শরীরে এই ধরন পেয়েছে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর)। ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এসে নামা ওই চার জনের র্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট করা হলে করোনা পজিটিভ আসে। পরে তাদের রাজধানীর মহাখালী ডিএনসিসি কভিড হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে নমুনা সংগ্রহ করে জিনোম সিকোয়েন্স করলে তাদের একজনের মধ্যে আইইডিসিআর ওমিক্রনের উপধরন ‘বিএ-৫’ এর নতুন উপধরন ‘বিএফ-৭’ শনাক্ত করে।
এর ফলে ইতিমধ্যেই চীনে ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়া করোনার এই নতুন উপধরন প্রথমবারের মতো বাংলাদেশেও পাওয়া গেল। এর আগে এই উপধরনটি চীন, ভারত, মঙ্গোলিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও জাপানসহ আরও কয়েকটি দেশেও ছড়িয়েছে।
এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল বাসার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম গতকাল শুক্রবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, চীনে দেখা দেওয়া করোনার নতুন উপধরন বাংলাদেশে পাওয়া গেছে। দেশে আসা প্রথম যে চারজন চীনা নাগরিকের মধ্যে করোনা পজিটিভ ধরা পড়েছে, তাদের সবার জিনোম সিকোয়েন্স করে একজনের মধ্যে এই উপধরন শনাক্ত হয়েছে। তিনিসহ ওই চারজন এখনো ডিএনসিসি কভিড হাসপাতালে আইসোলেশনে আছেন।
এ ব্যাপারে ডিএনসিসি করোনা হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. এ কে এম শফিকুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এখন হাসপাতালে করোনা পজিটিভ চীনের ৮ নাগরিক ভর্তি আছেন। তাদের সবাইকে আলাদা আলাদা আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। তাদের শারীরিক অবস্থা ভালো। কারণ তাদের কারও মধ্যেই করোনার উপসর্গ ছিল না।
তিনি জানান, চীনের এসব নাগরিক বাংলাদেশে বিভিন্ন নির্মাণ প্রতিষ্ঠানসহ বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন।
দেশে শনাক্ত করোনার নতুন উপধরনটি করোনার অন্যান্য ধরন ও উপধরনের মতো অতটা মারাত্মক না হলেও এটি দ্রুত ও বেশি ছড়ায় বলে সতর্ক করেছেন আইইডিসিআরের উপদেষ্টা ও প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো শনাক্ত ‘বিএফ-৭’ ওমিক্রনের উপধরনের উপধরন। এটি ওমিক্রনের উপধরন ‘বিএ-৫’ এর উপধরন। এই উপধরনটি ওমিক্রনের অন্যান্য ধরন ও উপধরনের মতো এতটা মারাত্মক নয়। তবে এই উপধরনটি বেশি ছড়ায় বলে এটা এখনো টিকে আছে। যে ধরন বেশি সংক্রমণ করে, সেটাই টিকে থাকে। আগে টিকা নেওয়া থাকলে বা আগে সংক্রমিত থাকলেও এই উপধরন আবার সংক্রমিত করছে। কিন্তু এখন পযন্ত এই উপধরনের কারণে বেশি হাসপাতালে বা আইসিইউতে যাওয়া, কিংবা বেশি মৃত্যুর কোনো রেকর্ড নেই।’
এই বিশেষজ্ঞ জানান, দেশে শনাক্ত নতুন উপধরনটি প্রথমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে পাওয়া যায়। সেখান থেকে প্রথমে মঙ্গোলিয়া ও মঙ্গোলিয়া থেকে চীনে ছড়িয়ে পড়ে। এ ছাড়া ভারত ও জাপানেও পাওয়া গেছে। সাধারণত শীতপ্রধান দেশে এই উপধরন ছড়িয়েছে। এর আগে করোনার ওমিক্রনের আরেকটা উপধরন ‘এক্সবিডি’-ও বাংলাদেশে পাওয়া গেছে। এখন চীনের ধরনটা পাওয়া গেল।
ডা. মুশতাক হোসেন সতর্ক করে দিয়ে বলেন, শনাক্ত নতুন উপধরনটি এতটা বিপজ্জনক নয়। আগের ধরনগুলোর চেয়ে বেশি শারীরিক ক্ষতি করতে পারে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। কিন্তু এটা আগের ধরনগুলোর চেয়ে বেশি ও দ্রুত ছড়ায়। কম ক্ষতিকর হলেও সতর্ক থাকা অবশ্যই জরুরি। কারণ অনেক বেশি লোকের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে ঝুঁকিপূর্ণ মানুষ আক্রান্ত হবে। তারা আক্রান্ত হলে বিপদ হবে।
নতুন উপধরনটি ঠেকাতে পরামর্শ দিয়ে এই বিশেষজ্ঞ বলেন, রোগটি ছড়াবে সীমান্ত পার হয়ে ওইসব দেশ থেকে যারা আসবে তাদের মাধ্যমে। সে জন্য স্থল ও বিমানবন্দরে নজরদারি ও পরীক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশে সংক্রমণ সবচেয়ে বেশি ছড়ায় হাসপাতাল থেকে। যারা হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে করোনা টেস্ট করতে, টিকা নিতে বা চিকিৎসা করাতে যান, তাদের মাধ্যমে নতুনরা আক্রান্ত হন। তাই হাসপাতাল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও টিকাদান কেন্দ্রÑ এসব জায়গায় স্বাস্থ্যবিধি মানতে হবে।
ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, প্রত্যেক হাসপাতালে ইনফেকশন প্রিভেনশন কন্ট্রোল কমিটি আছে। কমিটিকে দ্রুত বসে কর্মসূচি নিতে হবে। হাসপাতালে যারাই যাবেন, তারা যেন মাস্ক পরেন, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। চিকিৎসা বর্জ্য নিয়মিত অপসারণ করতে হবে। এ ছাড়া বদ্ধ স্থানে মাস্ক পরতে হবে। কমিউনিটি সেন্টারে স্বাস্থ্যবিধি মানা হচ্ছে কি না, হোটেল রেস্টুরেন্টে ভেন্টিলেশন ব্যবস্থা আছে কি নাÑ এগুলো দেখতে হবে।
এর আগে গত রবিবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তর বাংলাদেশে চীনের উপধরনটি ঠেকাতে ও প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিতে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলন করে। সেদিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবির সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, নতুন উপধরন ‘বিএফ-৭’ মূলত ‘বিএ-৫’ এর আরেকটি উপধরন। এটি একজন থেকে ১৮ জনকে সংক্রমিত করতে পারে। তার মানে অন্য ভ্যারিয়েন্টের চেয়ে এটার সংক্রমণ ক্ষমতা চারগুণ বেশি। এটির আরেকটি ভয়ানক দিক হচ্ছে যে ইনকিউবিশন পিরিয়ড অনেক কম।
পরে বাংলাদেশে এই উপধরন যেন প্রবেশ করতে না পারে সে জন্য সব বন্দরে স্ক্রিনিং কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। বিমান, নৌ ও স্থলবন্দরে আগত যাত্রীদের স্ক্রিনিংসহ সন্দেহভাজন যাত্রীকে র্যাপিড অ্যান্টিজেন টেস্ট করা হচ্ছে। এছাড়া অধিক সংক্রমিত দেশ থেকে আগত যাত্রীদের পরীক্ষা করে প্রয়োজন অনুযায়ী আইসোলেশনের ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। তাছাড়া সংক্রমণ বেড়ে গেলে মহাখালীর ডিএনসিসি কভিড ডেডিকেটেড হাসপাতাল প্রস্তুত রাখা হয়েছে বলেও জানানো হয়।
চীনে চলতি ডিসেম্বরের প্রথম ২০ দিনে ২৫ কোটি মানুষ করোনা আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর মধ্যে গত ২০ ডিসেম্বর একদিনেই ৩ কোটি ৭০ লাখ মানুষের দেহে করোনা শনাক্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে ব্লুমবার্গ ও ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে। পরে চীন করোনার তথ্য প্রকাশ বন্ধ করে দেয়।
চীনে করোনা বাড়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও। গত ২১ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থার প্রধান তেদরোস আধানোম গেব্রেয়াসুস বলেন, চীনে বর্তমানে যে পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে, তা নিয়ে ডব্লিউএইচও খুবই উদ্বিগ্ন। ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের করোনার টিকা দেওয়ায় চীনকে সহায়তা করছে সংস্থাটি। এ ছাড়া দেশটির জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষা ও চিকিৎসাসেবায় সহায়তা করার প্রস্তাব দিয়ে যাবে ডব্লিউএইচও।
অন্যদিকে, চীনের নতুন ভ্যারিয়েন্ট ভারতেও পাওয়া গেছে। গত কয়েক মাসে ভারতে ৪ জন এই নতুন উপধরনে আক্রান্ত হয়েছে। পরিস্থিতি যাতে নিয়ন্ত্রণের বাইরে বেরিয়ে না যায়, সেটা নিশ্চিত করতে ইতিমধ্যেই ভারতের প্রধানমন্ত্রী জরুরি বৈঠক করেছেন। সে দেশের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী মনসুখ মাণ্ডবীয় সংসদে জানিয়েছেন, কেন্দ্রের পাশাপাশি রাজ্যগুলোকেও বেশ কিছু পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে।
