আমদানি-রপ্তানিতে যে ঘাটতি তৈরি হয়, তার বড় অংশই সামাল দেওয়া হয় মূলত প্রবাসী আয় দিয়ে। কিন্তু কাঁচামালের উচ্চমূল্যের কারণে বাণিজ্য ঘাটতি বাড়লেও প্রবাসী আয়ে কোনো অগ্রগতি নেই। উল্টো বার্ষিক আয় কিছুটা কমেছে। যদিও সদ্য বিদায়ী বছরে রেকর্ড পরিমাণের জনশক্তি রপ্তানি হয়েছে। এরপরও প্রবাসী আয় না বাড়ায় অর্থনীতি সামাল দিতে সরকারের ওপর আরও চাপ তৈরি হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, বিদায়ী বছর দেশে মোট প্রবাসী আয় এসেছে ২ হাজার ১২৮ কোটি ৬৪ লাখ ডলার, যা আগের বছরের চেয়ে ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ কম। আয় কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হচ্ছে, বিশে^র সব দেশে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে গেছে। এতে করে প্রবাসীদের খরচও বেড়েছে। এছাড়া হুন্ডি প্রবণতা বৃদ্ধির কারণেও বৈধপথে আসা রেমিট্যান্সে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২১ সাল শেষে দেশে মোট রেমিট্যান্স এসেছিল ২ হাজার ২০৭ কোটি ২৪ লাখ ডলার। বাংলাদেশি টাকায় যার পরিমাণ (প্রতি ডলার ১০৭ টাকা হিসেবে) দাঁড়ায় ২ লাখ ৩৬ হাজার ১৭৪ কোটি টাকা। আর সদ্য বিদায়ী বছর শেষে এটি কমে দাঁড়ায় ২ হাজার ১২৮ কোটি ৬৪ লাখ ডলার বা ২ লাখ ২৭ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। অর্থনৈতিক চাপের কারণে বিদায়ী বছরে দেশের রেমিট্যান্স কমেছে ৭৮ কোটি ৬০ লাখ ডলার বা ৮ হাজার ৪১০ কোটি টাকা।
যদিও বিদায়ী ২০২২ সালে অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে সাড়ে ১১ লাখ লোক কাজের জন্য বিভিন্ন দেশে গেছেন, যা আগের বছরের চেয়ে ৮৬ দশমিক ৩২ শতাংশ বেশি। ২০২১ সালে জনশক্তি রপ্তানির পরিমাণ ছিল ৬ লাখ ১৭ হাজার ২০৯ জন। তবে বিপুল পরিমাণের জনশক্তি রপ্তানি হলেও আয় বাড়েনি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট ডিপার্টমেন্টের কর্মকর্তারা জানান, সদ্য বিদায়ী বছর অধিকাংশ ব্যাংক পরিচালন মুনাফায় ভালো করেছে ফরেক্সের কারণে। এখন রেমিট্যান্স প্রবাহ কিছুটা বাড়তে শুরু করেছে। আগামীতে দুটি ঈদ আছে। ঈদকে কেন্দ্র করে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়বে। আমাদের দেশের ডলার সংকটও কেটে যাবে, রিজার্ভও ইতিবাচক ধারায় ফিরে আসবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র মো. মেজবাউল হক বলেন, শ্রম মন্ত্রণালয়ের যে হিসাব তাতে অনেক লোক দেশের বাইরে গেছেন। তারা যখন বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে টাকা পাঠানো শুরু করবেন তখন প্রবাসী আয় বাড়বে। এছাড়া হুন্ডিকে যদি প্রতিহত করা যায় তাহলে রিজার্ভ আবারও ইতিবাচক ধারায় ফিরবে।
মুখপাত্র আরও বলেন, আমাদের তেল-কয়লা আমদানি করতে হচ্ছে। এসব কারণে আমদানি একটু বেড়েছে, যা কিছুদিন কম ছিল। এতে জরুরি প্রয়োজনে পেমেন্ট বেশি হওয়ায় রিজার্ভও একটু কমছে। এটা সাময়িক, ৩৪ বিলিয়নের মধ্যেই আমরা তিন-চার মাস ধরে আছি। সামনে ঈদ আছে, উৎসব আছে রেমিট্যান্স বাড়বে রিজার্ভও ইতিবাচক অবস্থানে যাবে। এতে ব্যাংকগুলোও এলসি পরিশোধ করতে পারবে। তখন রিজার্ভ থেকে কোনো ডলার খরচ করতে হবে না।
এদিকে, ডিসেম্বরে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ১৬৯ কোটি ৯৬ লাখ ডলার, যা ২০২১ সালের ডিসেম্বরের তুলনায় ৭ কোটি ডলার বেশি। পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে (জুলাই ও আগস্ট) টানা দুই বিলিয়ন ডলার করে রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে। এর পরের মাস সেপ্টেম্বর থেকে টানা চার মাস দেড় বিলিয়ন ডলারের ঘরেই থেকে যায় রেমিট্যান্স।
তথ্য বলছে, চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে এসেছিল ২০৯ কোটি ৬৩ লাখ ডলার, আগস্টে এসেছিল ২০৩ কোটি ৬৯ লাখ ডলার। এর পরই কমতে থাকে রেমিট্যান্স প্রবাহ যা দেড় বিলিয়ন বা তার কাছাকাছি। এর পরের মাস সেপ্টেম্বরে ১৫৩ কোটি ৯৬ লাখ ডলার, অক্টোবরে ১৫২ কোটি ৫৫ লাখ ডলার, নভেম্বরে ১৫৯ কোটি ৪৭ লাখ ডলার পাঠিয়েছেন বিভিন্ন দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ হিসাব বলছে, ২৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ (রিজার্ভ) কমে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৩৮৩ কোটি ৮৯ লাখ ডলার বা ৩৩ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার। এক বছর আগের একই দিনে ছিল ৪ হাজার ৫৮০ কোটি ২২ লাখ ডলার। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে দেশের রিজার্ভ কমেছে এক হাজার ১৯৬ কোটি ৩৩ লাখ ডলার। আর এক মাসের ব্যবধানে কমেছে প্রায় দুই বিলিয়ন ডলার।
তবে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এর মানদ- অনুযায়ী রিজার্ভ গণনা করলে বর্তমান রিজার্ভ থেকে আরও ৮ দশমিক ৪০ বিলিয়ন ডলার বাদ যাবে, এতে ব্যবহারযোগ্য রিজার্ভ দাঁড়াবে ২৫ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলারে। আইএমএফের মানদ- অনুসারে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে মজুদকৃত রিজার্ভ থেকে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ), শ্রীলঙ্কাকে দেওয়া ঋণ এবং রিজার্ভ থেকে দেশীয় প্রকল্পে অর্থায়নের ব্যয় বাদ যাবে। যদিও সরকার এখন আইএমএফ এবং নিজস্ব অর্থাৎ দুই ধরনের হিসাবই রাখছে।
