হলমার্ক গ্রুপের ঋণ জালিয়াতির টাকা উদ্ধারের বিষয়ে নতুন কোনো সুখবর দিতে পারেননি রাষ্ট্রায়ত্ত সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. আফজাল করিম। তবে হলমার্কের সম্পদ বিক্রি করে নতুন বছরের মধ্যে এই অর্থের অনেকটাই উদ্ধার করতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেছেন তিনি। গতকাল রবিবার সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা জানান তিনি।
ব্যাংক খাতে সোনালী ব্যাংকের সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জন ও সার্বিক ব্যবসায়িক পরিস্থিতি জানাতে এ আয়োজন করা হয়। এসময় ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর নিরঞ্জন চন্দ্র দেবনাথ, কাজী মো. ওয়াহিদুল ইসলাম, পারসুমা আলম, প্রধান কার্যালয়ের জেনারেল ম্যানেজাররা উপস্থিত ছিলেন।
আফজাল করিম বলেন, বিদায়ী বছর শেষে রেকর্ড ২ হাজার ৫০৩ কোটি টাকা পরিচালন মুনাফা করেছে সোনালী ব্যাংক। আগের বছর পরিচালন মুনাফা ছিল ২ হাজার ১০০ কোটি টাকা। আমানত ও ঋণের আনুপাতিক হার বর্তমানে ৬০ শতাংশ, যা আগের বছরের চেয়ে ৯ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। আগের বছর ছিল ৫১ শতাংশ।
আফজাল করিম বলেন, হলমার্কের যে মামলা চলছে তার অগ্রগতি আছে। তবে তাদের যে সম্পত্তি আছে সেগুলো এখনো বিক্রি করা যায়নি। আমাদের কমিটি এ বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে। তাদের সম্পত্তিগুলো আমরা আদালতের মাধ্যমে বিক্রি করার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি বিকল্প পন্থায়ও বিক্রির প্রচেষ্টা চলছে। মূলত অনেক বড় সম্পত্তি হওয়ার কারণে ক্রেতা পাওয়া কষ্টকর হয়ে যাচ্ছে। তারপরও আমরা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর সম্পত্তি যাচাইয়ের জন্য একটি কমিটি করে দিয়েছি। তারা সরাসরি গিয়ে সম্পত্তিগুলো যাচাই করে প্রতিবেদন জমা দিচ্ছে। দ্রুত সময়ের মধ্যে সম্পত্তি বিক্রি করে ঋণ সমন্বয় করা হবে।
তিনি বলেন, বিদায়ী বছর শেষে সোনালী ব্যাংকের আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৪১ হাজার কোটি টাকা। এটি গত বছরের চেয়ে ৬ হাজার কোটি টাকা বেশি। গত বছর যার পরিমাণ ছিল ১ লাখ ৩৫ হাজার কোটি টাকা। সোনালী ব্যাংকের ঋণের প্রবৃদ্ধিও বেড়েছে। বছর শেষে ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮৪ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। গত বছর যার পরিমাণ ছিল ৬৯ হাজার কোটি টাকা।
সোনালী ব্যাংকের এমডি বলেন, এই বছর আমরা যেসব ঋণ বিতরণ করেছি তার মধ্যে পারফর্মিং লোনের পরিমাণ বেশি। যে কারণে ঋণের সুদ আয়ও বেশি হয়েছে। যদি নন-পারফর্মিং ঋণ বেশি থাকত তাহলে এত আয় হতো না। কারণ নন-পারফর্মিং ঋণের সুদ আয় খাতে দেখানো যায় না। বিদায়ী বছরে সোনালী ব্যাংকের সুদ আয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৭৬৯ কোটি টাকা, যা গত বছরের চেয়ে ১ হাজার ১২২ কোটি টাকা বেশি। আর আমাদের নিট সুদ মার্জিন এ বছর ৩৫৩ কোটি টাকা।
এদিকে সোনালী ব্যাংক ২০২১ সাল শেষ পর্যন্ত ৪ হাজার ১০০ কোটি টাকা কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে ফেডারেল সুবিধা নিয়েছিল। যে সুবিধার মাধ্যমে ব্যাংকটি মূলধন ঘাটতি থাকার পরও তা দেখানো হয়নি। তবে লাভ বাড়িয়ে দ্রুত সময়ের মধ্যে সোনালী ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি কমিয়ে আনার আশ^াস দিয়েছেন ব্যবস্থাপনা পরিচালক।
তিনি বলেন, ‘বিশ্বের অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যেও বিভিন্ন সূচকে সোনালী ব্যাংকের অগ্রগতি রয়েছে। দেশের ব্যাংকিং খাত এগিয়ে যাচ্ছে। আশা করি অচিরেই শ্রেণিকৃত ঋণ আরও কমে আসবে। সে সঙ্গে মুনাফা বাড়ায় অচিরেই আমাদের মূলধন ঘাটতি কমে আসবে। এজন্য আমরা পারফর্মিং ঋণ আরও বাড়ানোর চেষ্টা করছি। আশা করছি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গাইডলাইন অনুযায়ী আগামী ৫ বছরের মধ্যে মূলধন ঘাটতিকে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা যাবে।
আফজাল করিম বলেন, ‘বিগত বছরে সোনালী ব্যাংক গুরুত্ব দিয়েছে সিএমএসএমই ঋণে। বড় অঙ্কের ঋণ তেমন দেওয়া হয়নি। মূলত ১৫ হাজার কোটি ঋণ বেড়েছে সিএমএসএমই ও এনজিওতে সংশ্লিষ্টতা বাড়ানোর কারণে। এছাড়া খাদ্য, সার ও পেট্রোলিয়ামসহ বিদায়ী বছর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ এলসিগুলোর মধ্যে ৪১ হাজার কোটি টাকার এলসি খুলেছে সোনালী ব্যাংক। দেশের স্বার্থে সোনালী ব্যাংক এসব কাজ করে যাচ্ছে। এলসি থেকে ব্যাংকের কোনো ক্ষতি হয়নি। মূলত সরকারি এলসিগুলো নামমাত্র কমিশন মূল্যে খোলা হয়েছে যা এলসি থেকে আয় খুব কম ১০০ টাকায় কখনো ৪০ বা ৮০ পয়সার মতো। রূপপুর পারমাণবিক প্রকল্পে সোনালী ব্যাংকের কোনো এলসি পেন্ডিং নেই বলেও জানান তিনি।
দেশের ব্যাংক খাতের মধ্যে সবচেয়ে বড় হচ্ছে সোনালী ব্যাংক। যার দেশের অভ্যন্তরে মোট ১ হাজার ২২৯টি শাখা রয়েছে। এছাড়া দেশের বাইরে ভারতের কলকাতা ও শিলিগুড়িতে ২টি শাখা রয়েছে।
