৩৩ হাজার কোটি টাকা ফাঁকি বড় করদাতাদের

আপডেট : ০২ জানুয়ারি ২০২৩, ০৬:১৫ এএম

বড় মাপের করদাতারা রিটার্নে আয়-ব্যয় ও সম্পদের মিথ্যা তথ্য দিয়ে ৩৩ হাজার কোটি টাকার কর ফাঁকি দিয়েছেন। গত ১০ বছরের রিটার্নের তথ্য খতিয়ে দেখে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বড় মাপের করদাতাদের কর ফাঁকির এ হিসাব চিহ্নিত করেছে। এনবিআর সূত্রে এ তথ্য পাওয়া গেছে।

ফাঁকি দেওয়া আয়করের ৩৩ হাজার কোটি টাকার মধ্যে আদায় হয়েছে মাত্র ৯ হাজার কোটি টাকা। এখনো আদায় হয়নি ২৪ হাজার কোটি টাকার বেশি।

এনবিআরের প্রধান কার্যালয় থেকে অডিট পরিচালনা করা হয়েছে। তবে সব কর অঞ্চল আলাদাভাবে অডিট করে তাদের সুপারিশ পাঠিয়েছে। যা এনবিআরের মূল দপ্তর থেকে প্রতিবেদন আকারে প্রকাশ করা হয়েছে। অডিটে ফাঁকি চিহ্নিত হওয়ার পর করদাতার কাছে পাওনা চাওয়া হলে বেশিরভাগই পাওনা পরিশোধ না করে আপিল, আপিল ট্রাইব্যুনাল, বিচারিক ও উচ্চ আদালতে মামলা করে দিয়েছে। এ কারণে অডিটে কর ফাঁকি চিহ্নিত হলেও আদায় হয়েছে সামান্য।

প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে জানা যায়, আমাদের দেশের অধিকাংশ করদাতা আয়কর অধ্যাদেশ, ১৯৮৪-এর ৮২ বিবি ধারা অনুযায়ী সার্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে আয়কর রিটার্ন দাখিল করে থাকেন। অর্থাৎ করদাতা নিজে বা তার প্রতিনিধি দিয়ে হিসাব করে আয়-ব্যয় ও সম্পদের তথ্য রিটার্নে উল্লেখ করেন। লোকবলের স্বল্পতার কারণে অধিকাংশ সময়ে বেশিরভাগ রিটার্ন যাচাই করা সম্ভব হয় না। সার্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে জমা দেওয়া রিটার্ন দুভাবে অডিট করা হয়। এক. ৮২ বিবি (২) ধারা অনুযায়ী, উপকমিশনার ত্রুটিপূর্ণ রিটার্ন খতিয়ে দেখেন। এ ক্ষেত্রে তথ্যে গরমিল পাওয়া গেলে নোটিসের মাধ্যমে তা জানিয়ে করদাতাকে রিটার্ন সংশোধন করে পাওনা কর পরিশোধ করতে বলা হয়। অন্যটি ৮২ বিবি (৭) ধারা অনুযায়ী অডিট করা হয়। এ ক্ষেত্রে এনবিআরের অনুমোদন নিয়ে খতিয়ে দেখা হয়। এ কাজে প্রয়োজন হলে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা শাখা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেলের (সিআইসি) কর্মকর্তারাও অংশ নিয়ে থাকেন। এবারে অডিটে যেসব করদাতার আয় বছরে ৫০ লাখ টাকার বেশি মূলত সেসব করদাতার অনেকের রিটার্নের তথ্য যাচাই করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, ২০১০-১১ করবর্ষ থেকে ২০১৯-২০ করবর্ষ পর্যন্ত মোট ১০ বছরে ২ লাখ ২০ হাজার ৩৩৪টি রিটার্ন অডিটের সিদ্ধান্ত হলেও ২ লাখ ১৭ হাজার ৫৭টির অডিট হয়েছে। এতে ৩৩ হাজার ৩৯৭ কোটি ৩৮ লাখ টাকার কর ফাঁকি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে চলতি করবর্ষের অক্টোবর পর্যন্ত আদায় হয়েছে ৯ হাজার কোটি ৮ লাখ টাকা। আদায় হয়নি ২৪ হাজার ৩৯৭ কোটি ৩০ লাখ টাকা। গত অক্টোবরে আদায় হয়েছে ৮১৬ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। ৩ হাজার ২৭৭টি মামলা নিষ্পত্তি হয়নি, প্রক্রিয়াধীন আছে ৩ হাজার ২৭৮টি।

২০১০-১১ করবর্ষে সর্বজনীন স্বনির্ধারণী পদ্ধতিতে জমা হওয়া ৪ লাখ ৯৫ হাজার ৫২৭টি রিটার্নের মধ্যে অডিটের জন্য নির্বাচন করা হয়েছে ১০ হাজার ৯৪টি। এসব রিটার্ন অডিট করে প্রায় ২ হাজার ১৩৫ কোটি টাকা কর ফাঁকির প্রমাণ পাওয়া গেছে। এর মধ্যে আদায় হয়েছে প্রায় ২৩৪ কোটি ৪৪ লাখ টাকা। পাওনা রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯০১ কোটি টাকা।

২০১১-১২ করবর্ষে রিটার্ন দাখিল হয়েছে ৬ লাখ ৮৯ হাজার ২টি। এর মধ্যে ১৬ হাজার ৮৪০টি অডিট করে প্রায় ২ হাজার ৭১৬ কোটি টাকা কর ফাঁকি পাওয়া গেছে। আদায় হয়েছে প্রায় ৭৩৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। পাওনা রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৯৭৭ কোটি টাকা।

২০১২-১৩ করবর্ষে রিটার্ন দাখিল হয়েছে ৮ লাখ ৫৪ হাজার ২৬৬টি। এর মধ্যে ২০ হাজার ৫৮৪টি অডিট করে প্রায় ৪ হাজার ৩৮৯ কোটি টাকা কর ফাঁকির প্রমাণ পাওয়া গেছে। আদায় হয়েছে প্রায় ১ হাজার ২৯৬ কোটি টাকা। পাওনা রয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৯৩ কোটি টাকা।

২০১৩-১৪ করবর্ষে রিটার্ন দাখিল হয়েছে ৮ লাখ ৮৯ হাজার ৮৭৬টি। এর মধ্যে ৩২ হাজার ৩৪৪টি অডিট করে কর ফাঁকি পাওয়া গেছে প্রায় ৫ হাজার ৪৪০ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে প্রায় ৭২৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকা। পাওনা রয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৭১৬ কোটি ৫৯ লাখ টাকা।

২০১৪-১৫ করবর্ষে রিটার্ন দাখিল হয়েছে ৯ লাখ ৪২ হাজার ৫৬৯টি। এর মধ্যে ২০ হাজার ৬৪৩টি অডিট করে কর ফাঁকির প্রমাণ মিলেছে প্রায় ৪ হাজার ৯৬১ কোটি ৬০ লাখ টাকার। প্রায় ৫০০ কোটি ৫৪ লাখ টাকা আদায় হয়েছে। পাওনা রয়েছে প্রায় ৪ হাজার ৪৬১ কোটি ৫ লাখ টাকা।

২০১৫-১৬ করবর্ষে রিটার্ন দাখিল হয়েছে ৯ লাখ ৮৪ হাজার ৪৯৩টি। এর মধ্যে ২২ হাজার ৯টি অডিটের জন্য নির্বাচন করা হয়। যার মধ্যে ৩৩টি নিষ্পত্তি হয়নি। বাকিগুলোতে কর ফাঁকি হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৯৮০ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। আদায় হয়েছে প্রায় ৪২৫ কোটি ৯৫ লাখ টাকা। পাওনা আছে প্রায় ২ হাজার ৫৫৪ কোটি ৭০ লাখ টাকা।

২০১৬-১৭ করবর্ষে রিটার্ন দাখিল হয়েছে ১৩ লাখ ৩৭ হাজার ৮১৮টি। এর মধ্যে ২৪ হাজার ৩৮০টির মধ্যে একটি ছাড়া বাকি রিটার্ন অডিট করা হয়েছে। এতে কর ফাঁকি হয়েছে প্রায় ২ হাজার ১৪৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা। আদায় হয়েছে প্রায় ৩৭৬ কোটি ১২ লাখ টাকা। পাওনা রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৭৬৮ কোটি ৬৮ লাখ টাকা।

২০১৭-১৮ করবর্ষে রিটার্ন দাখিল হয়েছে ১৫ লাখ ৩৪ হাজার ৬৯৮টি। এর মধ্যে ২৫ হাজার ২৯৪টি অডিট করে কর ফাঁকি হয়েছে প্রায় ৩ হাজার ৩০ কোটি ৯৯ লাখ টাকা।

২০১৮-১৯ করবর্ষে রিটার্ন দাখিল হয়েছে ১৭ লাখ ৭ হাজার ১২৪টি। এর মধ্যে ২৬ হাজার ২৩৮টি রিটার্ন অডিট করে কর ফাঁকি পাওয়া গেছে প্রায় ২ হাজার ২৮৯ কোটি ৩০ লাখ টাকা। আদায় হয়েছে প্রায় ৪১২ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। অনাদায়ী রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৭৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা।

২০১৯-২০ করবর্ষে সর্বজনীন পদ্ধতিতে রিটার্ন দাখিল হয়েছে ১৯ লাখ ৫০ হাজার ৭৭২টি। এর মধ্যে ২১ হাজার ৯০৮টি রিটার্ন অডিট করে কর ফাঁকি মিলেছে প্রায় ৩ হাজার ৩০৮ কোটি ৯০ লাখ টাকা। আদায় হয়েছে প্রায় ২৬১ কোটি ৬৯ লাখ টাকা।

এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এনবিআরের ইচ্ছে থাকলেও সব বড় মাপের করদাতার রিটার্ন অডিট করা সম্ভব না। অনলাইনে সব রিটার্ন জমা নেওয়া সম্ভব হলে করদাতাদের তথ্য এনবিআরের তথ্যভা-ারে থাকত। এতে আয়-ব্যয় বা সম্পদ বা ব্যবসার মিথ্যা তথ্য দেওয়ার সুযোগ থাকত না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত