দেশে স্বাস্থ্যব্যয়ের দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ বা ৬৯ শতাংশ অর্থ যাচ্ছে ব্যক্তির পকেট থেকে। এক্ষেত্রে সরকার ব্যয় করছে মাত্র ২৩ দশমিক ১ শতাংশ অর্থ। এ ছাড়া উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা ৫ শতাংশ, এনজিও ১ দশমিক ৭ শতাংশ ও বেসরকারি সেক্টর ১ দশমিক ৬ শতাংশ অর্থ ব্যয় করছে।
এমনকি গত ১০ বছরে দেশের স্বাস্থ্য খাতে সরকারের ব্যয় যেমন কমেছে, তেমনি বেড়েছে ব্যক্তির ব্যয়। ১৯৯৭ সালে সরকারের ব্যয় ছিল ৩৬ শতাংশ, সেটা ২০২০ সালে কমে হয়েছে ২৩ শতাংশ। অন্যদিকে ব্যক্তির ৫৬ শতাংশ ব্যয় বেড়ে হয়েছে ৬৯ শতাংশ। একইভাবে কমেছে অন্যান্য সেক্টরের ব্যয়ও। যেমন গত পাঁচ বছরে স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাস্থ্যব্যয় ৪ শতাংশ থেকে কমে ৩ শতাংশ ও বিশ্ব দাতা সংস্থাগুলোর ব্যয় ৬ শতাংশ থেকে কমে ৫ শতাংশ হয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা পেতে ব্যক্তির সবচেয়ে বেশি ব্যয় হয় ওষুধে, যা মোট স্বাস্থ্যব্যয়ের ৬৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এরপর মেডিকেল ও ডায়াগনস্টিকে ১১ দশমিক ৭ শতাংশ, চিকিৎসক দেখাতে ১০ দশমিক ৮ শতাংশ, সাধারণ হাসপাতালে ১০ দশমিক ১ শতাংশ, অন্যান্য স্বাস্থ্যসেবায় ২ দশমিক ৪ শতাংশ, দন্ত চিকিৎসক দেখাতে শূন্য দশমিক ৩ শতাংশ ও চিকিৎসাসামগ্রী কিনতে শূন্য দশমিক ১ শতাংশ অর্থ ব্যয় হয় মানুষের।
গতকাল বুধবার রাজধানীর একটি হোটেলে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট ‘বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস-ষষ্ঠ রাউন্ড’-এর গবেষণা প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের বাংলাদেশ ন্যাশনাল হেলথ অ্যাকাউন্টস সেলের ফোকাল পারসন ডা. সুব্রত পাল।
ডা. সুব্রত পাল বলেন, নিজ পকেট থেকে ব্যয় (ওওপি) সবসময় সরকারের ব্যয় বা সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করে না। প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্নমুখী কার্যক্রম গ্রহণের ফলে বাংলাদেশ এরই মধ্যে উন্নয়নের মহাসড়কে প্রবেশ করেছে। মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার পথচলায় দেশে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি ব্যবসাবাণিজ্যের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে। এর ফলে মানুষের খরচ করার প্রবণতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের স্বাস্থ্যব্যয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, দেশে স্বাস্থ্যব্যয়ে মোট ব্যক্তি পর্যায়ে খরচের ৫৪ শতাংশই খরচ করে থাকেন দেশের শীর্ষ ধনীরা। অন্যদিকে দরিদ্র শ্রেণির জনগণের নিম্ন দুই ভাগ নিজ খরচের যথাক্রমে ৪ শতাংশ এবং ৮ শতাংশ খরচ করে থাকেন।
বাংলাদেশে স্বাস্থ্যের ওপর নিজ খরচের উচ্চ অংশটি জনসংখ্যার ধনী অংশ দ্বারা চালিত হয় জানিয়ে ডা. সুব্রত পাল বলেন, জনসংখ্যার সর্বনিম্ন অংশ স্বাস্থ্যসেবা পেতে মাথাপিছু ২০০ টাকা নিজ থেকে ব্যয় করে থাকে। যেখানে জনসংখ্যার শীর্ষ ধনী অংশ খরচ করে এর তুলনায় ৮ গুণ বেশি, অর্থাৎ ১ হাজার ৭১৪ টাকা। একই এলাকা বা গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে মাথাপিছু খরচের তুলনায় দেখা যায় যে, সবচেয়ে ধনী পরিবারগুলো দরিদ্রদের তুলনায় ৫ গুণ বেশি ব্যয় করেছে।
এই গবেষক জানান, আয় ক্যাটাগরিতে দেশের মানুষকে পাঁচ শ্রেণিতে ভাগ করা হয়েছে। গ্রামাঞ্চলে শীর্ষ দুই ধনী অংশ খরচ করে মোট ব্যক্তি পর্যায়ে খরচের ৫৭ শতাংশ, যেখানে দরিদ্রতম দুই অংশ খরচ করে ২৫ শতাংশ। কিন্তু শহরাঞ্চলে শীর্ষ দুই ধনী অংশ খরচ করে ৭৬ শতাংশ এবং দরিদ্রতম দুই অংশ খরচ করে ১২ শতাংশ। সিটি করপোরেশনভুক্ত স্থানে এই হার যথাক্রমে ৮৭ শতাংশ এবং ৫ শতাংশ। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, বাংলাদেশে স্বাস্থ্যের ওপর নিজ খরচের উচ্চ অংশটি জনসংখ্যার ধনী অংশ দ্বারা চালিত হয়।
বিভাগ ভেদে স্বাস্থ্য খাতে খরচের হিসাবে দেখা গেছে, ২০২০ সালে স্বাস্থ্যসেবা পেতে মোট ব্যয়ের সর্বোচ্চ ৩৭ শতাংশ করা হয়েছে ঢাকা বিভাগে আর সবচেয়ে কম তিন শতাংশ ময়মনসিংহে। মাথাপিছু হিসেবে স্বাস্থ্য খাতে ঢাকা বিভাগে জনপ্রতি ব্যয় হয়েছে ৭ হাজার ৩৯ টাকা এবং ময়মনসিংহে ২ হাজার ৬০ টাকা।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, স্বাস্থ্যসেবায় সরকারি ব্যয়ের মধ্যে ৯৩ শতাংশ স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় বহন করে। অন্যান্য মন্ত্রণালয় এবং সিটি করপোরেশন সম্মিলিতভাবে বাকি সাত শতাংশ খরচ বহন করে।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের মহাপরিচালক ড. মো. এনামুল হক বলেন, ‘স্বাস্থ্য খাতে পার্শ্ববর্তী ভারতসহ বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের খরচ অনেক কম। চিকিৎসায় আমাদের সফলতা অন্যদের জন্য অনুকরণীয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘স্বাস্থ্যসেবার জন্য বিপর্যয়মূলক ব্যয় এবং দারিদ্র্যের হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দিকনির্দেশনায় স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিট সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার অংশ হিসেবে টাঙ্গাইল জেলায় দারিদ্র্যসীমার নিচে বসবাসকারী পরিবারের জন্য স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি পরিচালনা করছে। ঢাকা মহানগরীসহ দেশের আরও ছয় জেলায় এই কর্মসূচি চলবে। এই কার্ডের ভিত্তিতে পরিবারের সদস্যরা চিকিৎসার প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হতে পারছেন এবং ১১০টি রোগের (রোগ নির্ণয়, ওষুধ, পথ্যসহ) পূর্ণ চিকিৎসা বিনামূল্যে পাচ্ছেন। সরকারের পরিকল্পনা রয়েছে ধাপে ধাপে সমাজের সকল শ্রেণির মানুষের জন্য সামাজিক স্বাস্থ্য বীমা বা স্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচির মতো কার্যক্রম গ্রহণ করার।’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী জাহিদ মালেক। এ ছাড়াও বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব ড. মু. আনোয়ার হোসেন হাওলাদার, স্বাস্থ্য শিক্ষা বিভাগের সচিব মো. সাইফুল হাসান বাদল, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আহমেদুল কবীর, পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সাহান আরা বানু এনডিসি, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ ইউসুফ, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বাংলাদেশ রিপ্রেজেন্টেটিভ ড. বর্দন জং রানা প্রমুখ।
