রাঙ্গুনিয়ায় কৃষি জমি দখল করে কর্ণফুলী নদী খনন প্রকল্পের বর্জ্য ফেলার অভিযোগ

আপডেট : ০৫ জানুয়ারি ২০২৩, ০২:৫৬ পিএম

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় কর্ণফুলী নদী খনন প্রকল্পের বর্জ্য ফেলতে কৃষকদের জমি জবর-দখল করে বর্জ্য ফেলার অভিযোগ উঠেছে।

উপজেলার চন্দ্রঘোনা কদমতলী ইউনিয়নের মরমপাড়া বিশ্বাস বাড়ি এলাকায় ৬ একর ফসলি জমির মাটি কেটে চারপাশে বাঁধ দিয়ে নদী খননের বর্জ্য মজুতের পর ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে।

পরবর্তীতে বৃহস্পতিবার (৫ জানুয়ারি) থেকে ২০ পরিবারের ফসলি জমিতে বর্জ্য ফেলা হচ্ছে।

হতদরিদ্র কৃষকেরা অভিযোগ করেন, তারা বাপ-দাদার আমল থেকে আমন ধানের পর চলতি রবি মৌসুমে আলু, মরিচ, বেগুন, সরিষাসহ নানা ফসলের চাষাবাদ করে আসছেন ওই জমিতে।

গতকাল থেকে মাঠের সবুজ ফসল নষ্ট করে এখানে তৈরি হচ্ছে কর্ণফুলী নদী খনন প্রকল্পের বর্জ্য ফেলার ক্ষেত্র।

আচমকা কৃষকদের জিম্মি করে ফেলা হচ্ছে কোটি কোটি ঘন ফুট বর্জ্য। বর্জ্য ফেলার ফলে আশপাশের দুইশ পরিবার বিলীন হওয়ার আশঙ্কা করছেন ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা।

সরেজমিনে দেখা গেছে, জমির মালিকেরা অনেকে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। কৃষকদের আকুতি-মিনতির তোয়াক্কা করছেন না প্রভাবশালী দখলকারী চক্র।

কর্ণফুলী নদী পাড়ের অদূরে বিশ্বাসবাড়ির মরম বিলে ফসলি জমিতে বাঁধ দিয়ে তৈরি করা হয়েছে বিশালাকারের পুকুর।

ক্ষতিগ্রস্ত জেলে পরিবারের হরিলাল জলদাশ জানান, দখল চক্রের সহায়তায় খননকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ওয়েস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং লিমিটেডের বর্জ্য নদীতে ফেলায় সেখানে খনন যন্ত্রের পাইপ লাইন স্থাপন করে বর্জ্য ফেলছে।

তবে, জমিহারা কৃষকেরা ভয়ে মুখ খোলতে সাহস পাচ্ছেন না।

কৃষক হরিলাল দাশ হাউমাউ করে কেঁদে বলেন, আমার ৪০ শতক জমিতে আলু ফসল কেটে নষ্ট করে দিয়েছেন তারা। এভাবে ফসল নষ্ট করে জবর-দখল করা হয়েছে প্রকাশ ঘোষ, বিকাশ ঘোষ, রজনী ঘোষ, সুজন মল্লিক, নিহার চৌধুরী, পুলিন বিশ্বাসসহ আরও ২০ জন কৃষকের জমি।

তারা অভিযোগ করেন, বর্জ্য ভরাট করার ফলে তাদের কৃষি জমি অনাবাদি হয়ে যাবে। হারিয়ে যাবে জীবন জীবিকার অবলম্বন।

কৃষকেরা জানান, তাদের ফসলি জমি দখল নিয়ে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান, উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ জানিয়েছি। এতে কোনো ফলাফল আসেনি।

ইউপি চেয়ারম্যান ইদ্রিস আজগর জানান, কৃষকের অভিযোগ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানিয়েছি।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আতাউল গণি ওসমানির কাছে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, এলাকার ইউপি চেয়ারম্যান বা কেউ বিষয়টি নিয়ে অবহিত করেনি।

তিনি বলেন, অভিযোগ পেলেই পদক্ষেপ নেব।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রকল্প ব্যবস্থাপক সরোয়ার আলম শাহীন জানান, অন্যায় দখল নয়। মালিকদের জমির ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।

মাঠ কর্মকর্তা প্রকৌশলী শোভন আলী বলেন, প্রকল্পের কার্যাদেশে নদীর পাড়ে খননকৃত বর্জ্য ফেলার নির্দেশ নেই। নিজেদের ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য সংরক্ষণে প্রকল্প কাজে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, কর্ণফুলী নদীতে ১৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে ড্রেজিংয়ের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)।

প্রকল্পের আওতায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ায় ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ কর্ণফুলী নদী খনন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়।

চট্টগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, রাঙ্গুনিয়ায় কর্ণফুলী নদীতে নাব্যতা রক্ষার জন্য ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ নদী খনন প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে।

৫টি প্রকল্পে বিভক্ত করে কাজ বাস্তবায়নের জন্য টেন্ডার আহ্বানের মাধ্যমে ঠিকাদার নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কার্যাদেশে নদী খননের বর্জ্য সংরক্ষণের স্থান নির্ধারণ নেই। নদীর তলদেশ খননের কাদা পলি ও বালি অপরিকল্পিতভাবে যত্রতত্র ফেলার চেষ্টায় নানা প্রতিকূলতার শিকার হতে হচ্ছে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলো।

প্রকল্প বাস্তবায়নে তদারকিতে নিয়োজিত পানি উন্নয়ন বোর্ডে উপবিভাগীয় প্রকৌশলী শামশুল আরেফিন বলেন, ৭/৮’শ মিটার প্রস্থের কর্ণফুলী নদীর মাঝে কয়েক স্থানে দুই দেড়শ মিটারের খনন পরিকল্পনা করা হয়।

রাঙ্গুনিয়া উপজেলা এলাকায় দশ কিলোমিটার দীর্ঘ কর্ণফুলী নদী খননে ৬টি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। ইস্টার্ন ইঞ্জিনিয়ারিং গ্রুপসহ ৫টি প্রতিষ্ঠানকে বাস্তবায়নের জন্য ঠিকাদারি দেওয়া হয়েছে।

তীর এলাকার অধিবাসী বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, কর্ণফুলী নদীর ক্রমাগত ভাঙনে অতীতের দীর্ঘ সময়ে বহু আবাদি জমি ও বাড়ি ভিটে বিলীন হয়েছে। এতে নদীর প্রস্থ বেড়েছে।

খননের কাদামাটি ও বালিতে তীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা হলে জমির পুনরুদ্ধারসহ নদীর ভাঙন প্রতিরোধ হতো। ব্লক স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়নেও সহায়ক হতো।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত