চাকরির ফাঁদ

এমএলএম আদলে ‘অনুদান বাণিজ্য’

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৩, ০৫:৪৮ এএম

মাসিক ১১ হাজার টাকা বেতনে চাকরির লোভ দেখিয়ে জনপ্রতি নেওয়া হচ্ছে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা। ‘বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার ও পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থা’ নামের একটি সংগঠনের দাতা সদস্য বানানোর কথা বলে অনুদান হিসেবে এ টাকা নেওয়া হচ্ছে। সদস্যদের কাজ হিসেবে বলা হচ্ছে, এলাকায় কোনো বাল্যবিবাহ হলে, কোনো দরিদ্র পরিবার অর্থাভাবে তাদের মেয়ে বিয়ে দিতে না পারলে এবং নদীতে ড্রেজার মেশিন দিয়ে বালু তোলা হলে সংস্থার কর্মকর্তাদের জানাতে হবে।

এমন চাকরির ফাঁদে পড়ে টাকা দিয়ে অনেকেই প্রতারিত হচ্ছেন। কাজের নামে তাদের দিয়ে দাতা সদস্য সংগ্রহের কাজ করানো হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে ১১ থেকে সর্বোচ্চ ৬১ হাজার টাকা পর্যন্ত বেতন-কমিশন দেওয়ার লোভ দেখানো হচ্ছে। দাতা সদস্য সংগ্রহ সাপেক্ষে প্রথম মাস থেকেই এ সর্বোচ্চ পরিমাণ টাকা দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে।

অথচ টাকা নেওয়ার আগে লোক সংগ্রহের বিষয়ে কিছুই বলা হচ্ছে না ওইসব চাকরিপ্রার্থীর। এমন অভিযোগ করেছেন ‘বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার ও পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থা’র বেশ কিছু দাতা সদস্য।

তারা বলছেন, টাকা দিয়ে প্রতারিত হয়েছেন এবং কোনো বেতন না পাওয়ায় রাজধানীর মধ্য বাড্ডার অফিসে গেলে তাদের মামলা দিয়ে পুলিশে ধরিয়ে দেওয়ার ভয় দেখানো হচ্ছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর মধ্য বাড্ডার প্রগতি সরণিতে প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়। তারা এমএলএম (মাল্টি লেভেল মার্কেটিং) ব্যবসার আদলে সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছে চাকরির ফাঁদে অনুদান নেওয়ার এমন কার্যক্রম। রাজধানী ছাড়াও টাঙ্গাইল, কুমিল্লা ও গাজীপুরে রয়েছে কথিত এ মানবাধিকার ও পরিবেশ উন্নয়নবিষয়ক প্রতিষ্ঠানটির অফিস। এসব এলাকার পাঁচ শতাধিক মানুষ এ ফাঁদে পা দিয়ে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। প্রতারণার অভিযোগ ওঠা এ প্রতিষ্ঠান অলাভজনক, অরাজনৈতিক ও সম্পূর্ণ সেবাধর্মী বলে দাবি করেছেন এর কর্মকর্তারা।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার ও পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থার প্রেসিডেন্ট মির্জা আবদুল কাদের দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এসব অভিযোগ সত্য নয়। বিষয়গুলো এমন না। আমরা অনুদানের বিনিময়ে চাকরির কোনো প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি না।’ সদস্য সংগ্রহ ও অনুদানের টাকার বিনিময়ে চাকরির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একটা লোক যদি কাজ করে তাহলে অবশ্যই বেতন দিতে হয়। কাজ না করলে তো বেতন দেওয়া যায় না।’

মির্জা কাদের বলেন, ‘আমরা যাদের চাকরি দিয়ে থাকি তাদের কোনো নিয়োগপত্র দেওয়া হয় না। আর আমাদের সংগঠন অনুদানের টাকায় চলে এটা সবাই জানেন।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজধানীর মধ্য বাড্ডার প্রগতি সরণির খ-১৮৭ নম্বর ভবনের ছয়তলায় প্রতিষ্ঠানটির প্রধান কার্যালয়। সেখানেই চলে বিভিন্ন সেমিনার ও লোক সংগ্রহের কাজ। তাদের বিভিন্ন সেমিনারের ভিডিও ইউটিউবে ছেড়ে লোক সংগ্রহের চেষ্টা চালাচ্ছে। লোক সংগ্রহের সময় বলা হচ্ছে এ সংগঠনের সদস্য হলে ধর্মীয় ভাতা, আত্মীয় ভাতা, চিকিৎসা ভাতা ও এতিমখানায় দান করার জন্য সদস্যদের টাকা দেওয়া হবে। সদস্যদের ৫ লাখ টাকার ১২ বছর মেয়াদি বীমা করে দেওয়া হবে। বীমা পেতে কোনো প্রিমিয়াম লাগবে না। এ ছাড়া বলা হচ্ছে, চাকরির আওতায় প্রতি মাসে বেতন দেওয়া হবে। সদস্য হওয়ার প্রথম দুই মাস ১০ হাজার টাকা করে, এর পরের দুই মাস ১৫ হাজার করে, তার পরের তিন মাস ২৫ হাজার, এরপর তিন মাস ৩৭ হাজার টাকা করে, এর পরের ছয় মাস ৭৫ হাজার এবং তারপর প্রতি মাসে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা করে বেতন দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রথম মাসে ১০ জন লোক সংগ্রহ করে দিতে পারলে কমিশনসহ সর্বোচ্চ ৬১ হাজার ২৫০ টাকা বেতন তোলা যাবে বলে প্রলোভন দেখানো হচ্ছে। এ ছাড়া এ প্রতিষ্ঠানের অধীনে বিভিন্ন প্রজেক্টও রয়েছে যেখান থেকে অর্থ উপার্জনের সুযোগ রয়েছে, এমন প্রলোভনও দেওয়া হচ্ছে।

চাকরির আশায় গত বছর ১৫ নভেম্বর প্রতিষ্ঠানটিতে ২০ হাজার টাকা দেন টাঙ্গাইলের কালিহাতীর বাসিন্দা রাশিদা আক্তার। তাকে মাসে ১১ হাজার টাকা বেতনে চাকরির কথা বলে দাতা সদস্য বানানো হয়। স্থানীয় জান্নাতুল সিদ্দিকা নামের এক নারীর মাধ্যমে তিনি এ প্রতিষ্ঠানে যুক্ত হন।

রাশিদা আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘চাকরি আশায় ঋণ করে টাকা দিয়েছিলাম। টাকা দেওয়ার আগে আমাকে বলা হয়েছিল টাঙ্গাইলের কালিহাটি থানা এলাকায় কোনো বাল্যবিবাহ হলে কর্মকর্তাদের জানাতে হবে। তাদের একটি টিমের সঙ্গে ঘটনাস্থলে গিয়ে বিয়ে বন্ধ করতে হবে। এ ছাড়া প্রতি সপ্তাহে রাজধানীর মধ্য বাড্ডায় প্রধান অফিসে অনুষ্ঠিত সেমিনারে অংশ নিতে হবে।’

তিনি আরও বলেন, ‘টাকা দিয়ে সদস্য হওয়ার তিন দিন পর আমাকে বলা হয় অনুদান দেওয়ার জন্য লোক সংগ্রহ করতে হবে। আমি নিরুপায় হয়ে বেশ কয়েকজনকে নিজের টাকা খরচ করে ঢাকার অফিসে নিয়ে যাই। কিন্তু তারা টাকা দিয়ে সদস্য হতে রাজি হয়নি। এক মাসের বেশি কাজ করেছি কিন্তু কোনো বেতন দেয়নি আমাকে। বেতন চাইলে বলে লোক সংগ্রহ করতে না পারলে বেতন নেই। অথচ টাকা নেওয়ার আগে এমন কোনো কিছুই বলেনি তারা।’

টাঙ্গাইলের সেই জান্নাতুল সিদ্দিকা ‘বিশ্বব্যাপী মানবাধিকার ও পরিবেশ উন্নয়ন সংস্থা’র সদস্য হয়ে আরও ১০ জন সদস্য সংগ্রহ করে ৩ লাখ টাকা নিয়ে দেন। এ ১০ সদস্য কোনো বেতন না পেয়ে বাড্ডার অফিসে গেলে ভয়ভীতি দেখানো হয় বলে অভিযোগ তাদের।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জান্নাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি স্থানীয় এ চক্রের ফাঁদে পা দিয়ে বিপদে পড়েছি। আত্মীয়স্বজন অনেককেই সংগঠনটির দাতা সদস্য বানিয়েছি। তারা এখন বেতন না পেয়ে আমাকে চাপ দিচ্ছে। আমি হেড অফিসে গিয়ে তাদের বেতন চাইলে পুলিশ দিয়ে হয়রানির ভয় দেখাচ্ছে।’

জান্নাত আরও জানান, বাড্ডার অফিসে প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট কাদেরের সঙ্গে পলাশ, ওসমান, আজাদ, নিপা, হারুন, হোসাইন এই পুরো বিষয় দেখভাল করেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওসমান দেশ রূপান্তরের কাছে অনুদানের মাধ্যমে টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত