এক ক্যাম্পেই শহীদ ৫ শতাধিক মুক্তিযোদ্ধা

আপডেট : ০৬ জানুয়ারি ২০২৩, ০৬:২৭ এএম

দিনাজপুর জেলাসহ পুরো দেশের ইতিহাসে অন্যতম এক বেদনাবিধুর দিন ৬ জানুয়ারি। ১৯৭২ সালের এই দিনে দিনাজপুর শহরের মহারাজা গিরিজানাথ হাই স্কুলের মুক্তিযোদ্ধা ট্রানজিট ক্যাম্পে ভয়াবহ মাইন বিস্ফোরণে একসঙ্গে শহীদ হন দেশের মুক্তিযুদ্ধে বিজয় ছিনিয়ে আনা পাঁচশর বেশি মুক্তিযোদ্ধা, আহত হন অনেকেই। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তীকালে এত বড় ট্র্যাজেডি দেশে আর দ্বিতীয়টি নেই।

জানা গেছে, ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে দেশ স্বাধীনের পর দিনাজপুর শহরের উত্তর বালুবাড়ীর মহারাজা হাই স্কুলে স্থাপন করা হয় মুক্তিযোদ্ধা ট্রানজিট ক্যাম্প। বিজয় অর্জনের পর ৩০ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ক্যাম্পে এসে সমবেত হন দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও, পঞ্চগড়সহ আশপাশের জেলাগুলোর বীর মুক্তিযোদ্ধারা। তারা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের হামজাপুর, তরঙ্গপুর, পতিরাম ও বাঙালবাড়ী ক্যাম্পের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। এখানে সমবেত বীর মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ছিল আটশর বেশি। এক সাগর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীন বাংলাদেশকে শত্রুদের পুঁতে রাখা মাইনমুক্ত করতে সমবেত বীর মুক্তিযোদ্ধারা কাজ করছিলেন। ক্যাম্প থেকে সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে তারা বেরিয়ে পড়তেন পাক সেনাদের ফেলে যাওয়া, লুকিয়ে রাখা ও পুঁতে রাখা মাইন এবং অস্ত্রশস্ত্র ও গোলাবারুদের সন্ধানে। দিন শেষে সন্ধ্যার দিকে উদ্ধার করা মাইন ও অস্ত্র জমা করা হতো মহারাজা স্কুলের দক্ষিণাংশে খনন করা বাংকারে।

১৯৭২ সালের ৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় এই নিয়মিত কাজের এক পর্যায়ে ঘটে যায় ভয়াবহ দুর্ঘটনা। উদ্ধার করা অস্ত্র বাংকারে নামানোর সময় অসতর্ক মুহূর্তে এক মুক্তিযোদ্ধার হাত থেকে পড়ে যায় একটি মাইন। মুহূর্তেই মাইনটি বিস্ফোরিত হয়। আর এতে করে সঙ্গে সঙ্গে বাংকারের পুরো অস্ত্রভান্ডার বিস্ফোরিত হয়। বিকট শব্দের বিস্ফোরণে চোখের পলকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় মহারাজা স্কুল প্রাঙ্গণসহ এর আশপাশের এলাকা। শহীদ হন পাঁচশর বেশি মুক্তিযোদ্ধা, পাশাপাশি আহত হন আরও বহু মুক্তিযোদ্ধা।

ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলার চরাড়হাট গ্রামের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা আবদুর রশিদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সেদিন মাইন বিস্ফোরণে কতজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন তা সঠিকভাবে নির্ধারণ করা যায়নি। তবে সকালের রোলকলে উপস্থিত ছিলেন ৭৮০ জন মুক্তিযোদ্ধা। দুর্ঘটনার আগে ৫০ থেকে ৬০ জন মুক্তিযোদ্ধা ছুটি নিয়ে ক্যাম্প ত্যাগ করেছিলেন। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ৪৫০ মুক্তিযোদ্ধা তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থলেই নিহত হন। ক্যাম্পে অবস্থানরত অনেক মুক্তিযোদ্ধার হাত-পা-মাথা অনেক দূরে ছিটকে যায়। দুর্ঘটনার পরপরই শতাধিক আহত মুক্তিযোদ্ধাকে ভর্তি করা হয়েছিল দিনাজপুর জেনারেল হাসপাতাল ও সেন্ট ভিসেন্ট মিশন হাসপাতালে। এদের মধ্যে পরে ২৯ জন মারা যান।’

দুর্ঘটনার পর তাকে দিনাজপুর জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল জানিয়ে আবদুর রশিদ বলেন, ‘সেখানে ১৭ দিন চিকিৎসার পর জ্ঞান ফিরেছিল। পরে আমাকে ভারতের কলকাতার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে সাড়ে চার মাস চিকিৎসার পর বাঁ পা কেটে ফেলে। এরপর দেশে ফিরে আসি।’ এখন এই পঙ্গু মুক্তিযোদ্ধা সরকারি ভাতা পান। ওই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে তার মতো বেঁচে থাকা আরও ৩৭ জন মুক্তিযোদ্ধা সরকারি ভাতা পাচ্ছেন।

দিনাজপুর পৌরসভার সাবেক মেয়র বীর মুক্তিযোদ্ধা সফিকুল হক ছুটু জানান, ভয়াবহ ওই দুর্ঘটনার সময় তিনি তার শহরের বাসাতেই অবস্থান করছিলেন। দুর্ঘটনার পর শহরের সব শ্রেণি-পেশার মানুষ ঘটনাস্থলে ছুটে গিয়ে জীবিত ও মৃতদের উদ্ধার করে। যারা আহত হন তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু সে সময় হাসপাতালে পর্যাপ্ত চিকিৎসক ও ওষুধ না থাকায় ঠিকমতো চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়নি।

তিনি বলেন, ‘সে দিনের মাইন বিস্ফোরণে শুধু মুক্তিযোদ্ধাই নয়, শহরের উত্তর বালুবাড়ী কুমারপাড়া মহল্লার ১৫ জন বাসিন্দাও মৃত্যুবরণ করেন। ধ্বংসযজ্ঞে পরিণত হয় মহারাজা স্কুলের দ্বিতল ভবনসহ আশপাশের অধিকাংশ ঘরবাড়ি, দালানকোঠা।’

সফিকুল হক ছুটু জানান, দুর্ঘটনার পরদিন শহরের গোর-এ শহীদ বড় ময়দানে শহীদদের জানাজা হয়। পরে সামরিক মর্যাদায় ১২৫ জন শহীদের লাশ দাফন করা হয় ঐতিহাসিক চেহেলগাজী মাজার প্রাঙ্গণে। এরপর চেহেলগাজী মাজার প্রাঙ্গণে আরও দাফন করা হয় হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করা ১৯ জন মুক্তিযোদ্ধার মরদেহ। নিহতদের মধ্যে সে সময় ৫৮ জনের পরিচয় পাওয়া যায়। পরে পর্যায়ক্রমে জানা যায় আরও ৬৪ শহীদের পরিচয়।

এদিকে মহারাজা স্কুল মাইন ট্র্যাজেডি দিবস উপলক্ষে স্মৃতি পরিষদ, মহারাজা গিরিজানাথ হাই স্কুল ও দিনাজপুর প্রেস ক্লাব আজ শুক্রবার বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। ৬ জানুয়ারি স্মৃতি পরিষদের প্রতিষ্ঠাতা আহ্বায়ক আজহারুল আজাদ জুয়েল জানান, দিবসটি উপলক্ষে স্মৃতি পরিষদের সদস্যসহ সর্বস্তরের মানুষ আজ সকালে দিনাজপুর প্রেস ক্লাবে সমবেত হয়ে চেহেলগাজী মাজার প্রাঙ্গণে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণের জন্য রওনা হবেন। শ্রদ্ধাঞ্জলি অর্পণ শেষে মহারাজা স্কুলে অবস্থিত শহীদ স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধা অর্পণ করবেন। আর বাদ আসর মহারাজা স্কুল মসজিদে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের পারলৌকিক মুক্তি কামনায় দোয়া মাহফিল হবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত