আফগানিস্তানে উচ্চশিক্ষা থেকে নারীদের নিষিদ্ধ করার সাম্প্রতিক ফতোয়াটি শুধু সরাসরি ক্ষতিগ্রস্তদের জন্যই নয়, বরং আফগান সমাজের জন্যই একটি আঘাত। কারণ এটি দেশটিতে অগ্রগতির টিম টিম করে হলেও জ্বলা আশাকে আরও ক্ষতিগ্রস্ত করল। রাষ্ট্র পরিচালিত মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে মেয়েদের যাওয়া বন্ধ করে মার্চ মাসে জারি করা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আদেশটি তুলে নেওয়া হবেÑজনগণের এমন আশার মধ্যেই নতুন এ আদেশ জারি করা হলো।
তালেবানের পরস্পরবিরোধী উপদলগুলোর মধ্যে অন্তর্কোন্দল আফগানিস্তানের কত ক্ষতি করতে পারে দেশের জনগোষ্ঠীর অর্ধেকের জন্য শিক্ষার মতো একটি অপরিহার্য, মৌলিক অধিকার স্থগিত রাখার ঘটনা তারই প্রকৃষ্ট উদাহরণ। বস্তুত আফগান সমাজে নারীদের অংশগ্রহণের ওপর আরোপিত এই সাম্প্রতিকতম সীমাবদ্ধতাগুলো তালেবানের দুপক্ষের মধ্যে দুঃখজনক প্রতিযোগিতারই পরিণতি। এই দুপক্ষের একটি জানে দেশের সমস্যার উৎস কোথায় আর ২০ বছরের সংঘাতের জটিলতাগুলোই বা কী কী। আরেকটি পক্ষ হচ্ছে গণমানুষের বাস্তবতা থেকে দূরে থাকা এবং কথিত আদর্শগত লাভের বাইরে কিছু দেখতে না পারা লোকরা।
আপাতত শেষোক্ত গোষ্ঠীর সদস্যরাই বিজয়ী হচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু দেশকে তাদের পছন্দের পথে পরিচালিত করা আফগানিস্তানকে সমৃদ্ধ ও শক্তিশালী করবে না, বরং এর পরিণতি হবে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, অব্যাহত বিচ্ছিন্নতা এবং শেষপর্যায়ে রাষ্ট্রের চূড়ান্ত পতন।
আফগানিস্তানের উচ্চ শিক্ষাবিষয়ক মন্ত্রী নিদা মোহাম্মদ নাদিম ক্যাম্পাসে ছেলে ও মেয়েদের পৃথক রাখার সীমাবদ্ধতার মতো পদ্ধতিগত বিষয়গুলোর দিকে ইঙ্গিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের নিষিদ্ধ করার পক্ষে যুক্তি দেওয়ার চেষ্টা করেছেন। তিনি দাবি করেছেন, নারী শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষে পাঠে অংশ নেওয়ার সময় তালেবানের নির্দেশিত পোশাকবিধি মেনে চলে না। তিনি এবার যেসব অজুহাত পেশ করেছেন তা মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয় বন্ধ করে গত মার্চে দেওয়া আদেশের সময়কার মতোই। তবে ঘরের বাইরে গিয়ে শিক্ষাগ্রহণ এবং চাকরি খোঁজার সময় মেয়েরা ‘অনৈতিক’ আচরণ করছে এহেন মন্তব্যের মাধ্যমে এবার তিনি সারা দেশের নারী ও তাদের পরিবারগুলোকে অপমানও করেছেন।
গত বছরের মার্চ মাসে আফগান কর্র্তৃপক্ষ বলেছিল, ‘ইসলামি আইন এবং আফগান সংস্কৃতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ’ একটি পরিকল্পনা তৈরি করা না হওয়া পর্যন্ত মেয়েদের মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো বন্ধ থাকবে। প্রায় এক বছর পেরিয়ে গেলেও এ সমস্যা সমাধানে কোনো নীতিমালা প্রণয়নের লক্ষণ নেই। মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলো আবার খোলার উপায় খুঁজে বের করতে এই আপাত আগ্রহের অভাবের পাশাপাশি নারী শিক্ষার সুযোগ আরও সীমিত করে দেওয়া সাম্প্রতিকতম আদেশের কারণে দেশের মানুষ নারী শিক্ষার বিষয়ে তালেবানের প্রকাশ্যে বলা উদ্বেগ এবং বিবেচনার আন্তরিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছে।
শুধু এসব নীতির প্রভাব পড়া আফগানরাই নারী শিক্ষার বিষয়ে তালেবান সরকারের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেননি। কিছুসংখ্যক উচ্চপদস্থ তালেবান কর্মকর্তার মধ্যেও এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। কারণ প্রাসঙ্গিক মন্ত্রণালয়ে কর্মরত ব্যক্তিরা সাধারণ মানুষের প্রশ্নের উত্তর যেমন দিতে পারছেন না, তেমনি পারছেন না সমাধান দিতেও।
নারীশিক্ষার মূল্য বিচার করা এবং আফগানিস্তানকে একটি নিরাপদ, স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে গড়ে তোলায় নারীদের ভূমিকা নির্ধারণ করার ক্ষেত্রে কান্দাহার এবং কাবুলের তালেবান নেতাদের নিচের তিনটি বিষয় ভেবে দেখা উচিত :
প্রথমত, নারীদের শিক্ষার অধিকার কোনো কোনো মহলের দাবি মতো আফগানিস্তানের ওপর আরোপিত ‘পশ্চিমা এজেন্ডার’ অংশ নয় বরং ইসলামেই নারীদের শিক্ষার অধিকার সংরক্ষিত রয়েছে।
কোরআনের প্রথম যে আয়াত ফেরেশতা জিব্রাইল (আ.) মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর কাছে নাজিল করেছিলেন তা শুরু হয়েছিল ‘পড়’ শব্দ দিয়ে। মহানবী মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন এবং উত্তরাধিকার সম্পর্কে আমরা যা জানি তার বেশির ভাগই একজন নারীর বর্ণনার ওপর নির্ভর করে। তার স্ত্রী আয়েশা (রা.) যদি নবীর জীবনের ঘটনাবলি এবং তিনি যে গুণাবলির অধিকারী ছিলেন তা স্মরণ করতে, বুঝতে এবং অন্যদের কাছে বর্ণনা করতে না পারতেন তাহলে ইসলামের কোনো বিজয় ও সাফল্য হয়তো সম্ভব হতো না। ইসলামে নারীশিক্ষা নিছক বাড়তি কিছু নয়, জরুরি প্রয়োজন। তাই নারী ও মেয়েদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করা ইসলামের ভিত্তিমূলেরই বিরোধী।
একদিকে তালেবান সরকার দাবি করছে, তারা ঐশ্বরিক তাগিদ পূরণ করতে এবং একটি সত্যিকারের ইসলামি দেশ গড়ার লক্ষ্যে কাজ করছে, অন্যদিকে একই সঙ্গে তারা দেশজুড়ে নিরক্ষরতা ও অজ্ঞতার শেকলকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিচ্ছে। এটা ঘোর পরস্পরবিরোধিতা ছাড়া আর কী!
দ্বিতীয়ত, শিক্ষা এবং অর্থনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ সফল সামাজিক উন্নয়নের পূর্বশর্ত। দীর্ঘ ৪০ বছরের যুদ্ধের পর এখন দেশ গঠনের বৃহত্তর লক্ষ্যগুলো অর্জনের ক্ষেত্রে তাদের এসব সিদ্ধান্ত কী প্রভাব ফেলবে তা নারীশিক্ষার বিরোধী তালেবান নেতাদের ভেবে দেখা উচিত। দৃশ্যত তালেবানের নেতারা সম্পূর্ণ লৈঙ্গিক বিচ্ছিন্নতাকে সুন্দরভাবে কার্যকর সত্যিকারের একটি ইসলামি ব্যবস্থার ফর্মুলা মনে করছেন।
কিন্তু নারীদের শিক্ষা না দিয়ে তারা কীভাবে তাদের প্রত্যাশিত সমাজ গড়তে পারবেন? মেয়েদের উচ্চমাধ্যমিক স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে না দিলে তারা কীভাবে নারী ডাক্তারদের দিয়ে নারীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়া নিশ্চিত করার কথা ভাবছেন? তালেবান বলে, নারীদের দিয়েই নারীদের সর্বোত্তম সেবা দেওয়া সম্ভব। কিন্তু মেয়েরা কীভাবে স্বল্পশিক্ষিত নারীদের কাছ থেকে মানসম্পন্ন সেবা পাবে? যদি তাদের আদৌ কোনো সেবা দেওয়া হয় আর কী!
কর্মশক্তিতে শিক্ষিত নারী না থাকলে ৪ কোটি আফগানকে তাদের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির জন্য শুধু পুরুষ শ্রমশক্তির ওপর নির্ভর করতে হবে। এটি জনসংখ্যার ৮ থেকে ৯ শতাংশের বেশি হবে না। শুধু এই অল্পসংখ্যক কর্মীই কি বছরের পর বছরের যুদ্ধে বিধ্বস্ত একটি দেশকে সফলভাবে টিকিয়ে রাখতে ও এগিয়ে নিতে পারবে? দেশকে টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তি তৈরি না করে একটি লৈঙ্গিকভাবে বিচ্ছিন্ন সমাজ গড়ে তোলার জন্য তালেবানের অদূরদর্শী প্রয়াস আফগানিস্তানকে ‘বহিঃশক্তি’র হাতে ছেড়ে দেওয়ারই সমতুল্য হবে। কারণ শেষ পর্যন্ত আফগান সরকারের কাছে শুধু টিকে থাকার জন্যই সব ধরনের কর্মী বিদেশ থেকে আনা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।
তৃতীয়ত, নারী শিক্ষার বিষয়টিকে রাজনৈতিক ফুটবলে পরিণত করা হলে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এমন সব প্রতিক্রিয়া হবে, যা সরকারের ধারণার অনেক বাইরে। এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাওয়ার এবং জনগণের জীবনযাত্রার উন্নতির জন্য অন্যান্য দেশের সঙ্গে কাজ করার ক্ষেত্রে তালেবান সরকারের এরই মধ্যে সীমিত হয়ে যাওয়া সম্ভাবনাকে আরও কমিয়ে দেবে।
এই শিক্ষাবিরোধী ফতোয়ায় জনগণ এমনকি তালেবান নেতৃত্বেরও সবার সম্পূর্ণ সমর্থন নেই। এটি তালেবান সরকার ক্ষমতার প্রথম বছরে যা অর্জন করেছে তাকে ক্ষুন্ন করবে। পাশাপাশি বিশ্বের কাছে বিভ্রান্তিকর শাসন ও বিভক্ত কর্র্তৃত্বের একটি চিত্র তুলে ধরবে।
এই নারী শিক্ষাবিরোধী আদেশ তালেবান এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে আরও গঠনমূলক এবং উন্মুক্ত সংলাপের প্রচেষ্টাকেও দুর্বল করবে। এটি আফগানিস্তানের অন্তত অদূরভবিষ্যতের জন্য বিচ্ছিন্ন এবং সংকটের আবর্তে আটকে থাকাও নিশ্চিত করবে।
তালেবান নেতাদের জন্য তাদের এ সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা অপরিহার্য। কারণ এটি নিঃসন্দেহে আফগান নারীদের এবং সেই সূত্রে খোদ আফগানিস্তান দেশটির ক্ষতি করবে। নারীরা শুধু আফগান কর্মশক্তির একটি অপরিহার্য অংশই নয়, তাদের হাতই দোলা দিতে পারে আফগানিস্তানের ভবিষ্যতের দোলনাটিকে।
আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : আবু ইউসুফ
লেখক: কাতার ফাউন্ডেশনের হামাদ বিন খলিফা ইউনিভার্সিটির সংঘাত ও মানবিকতা অধ্যয়ন বিষয়ের অধ্যাপক
