রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

কারাগার না ‘জঙ্গি প্রশিক্ষণ সেন্টার’

আপডেট : ০৮ জানুয়ারি ২০২৩, ১১:১৭ পিএম

আধুনিক ধারণায় কারাগারকে শুধু শাস্তির জায়গা হিসেবে না রেখে বন্দিদের ‘সংশোধনাগার’ হিসেবে দেখা হয়। শাস্তি ভোগ করে বেরিয়ে বন্দিরা যাতে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারে, সে জন্য আছে নানা ব্যবস্থা। এরপরও সেখানে ঢোকার পর যদি কেউ জঙ্গিবাদে আরও বেশি জড়িয়ে পড়ার সুযোগ পায় সেটা উদ্বেগের। অন্যদিকে, অভিযোগ রয়েছে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ থাকার পরও দীর্ঘদিন ধরেই দেশের বিভিন্ন কারাগারে মোবাইল ব্যবহার করছে হাজতিরা। এমনকি সেলের ভেতরেই নিষিদ্ধ ঘোষিত জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা কথা বলছে বাইরে থাকা অন্য সহযোগীদের সঙ্গে। সংবাদপত্রে প্রকাশিত খবর থেকে জানা যায়, সর্বশেষ ঢাকার আদালত থেকে ছিনতাই ঘটনার আগের দিনও কারাগারে ছিনতাই হওয়া জঙ্গিদের সঙ্গে কথোপকথন হয়েছে। কখন তাদের আদালতে নেওয়া হবে সেই সময়ও জেনে যায় সহযোগীরা। পাশাপাশি জামিনপ্রাপ্ত জঙ্গিদের অনেকেই আবার উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে বা কেউ কেউ আত্মগোপনে চলে যাচ্ছে বলেও খবর প্রকাশিত হয়েছে।

এ পরিস্থিতিতে রবিবার দেশ রূপান্তরে ‘কারাগারের জঙ্গিদের মামাবাড়ির আবদার’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, গাজীপুরের কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কেন্দ্রীয় কারাগারে বন্দি জঙ্গিরা বিক্ষোভ করেছেন। বন্দি জঙ্গিরা নিজেদের চাহিদামতো কম্বল সরবরাহ, স্বজনদের সঙ্গে প্রতি সপ্তাহে এক দিন সাক্ষাৎ ও ফোনে কথা বলার দাবি জানায়। পাশাপাশি তারা সাধারণ বন্দিদের মতো ঘোরাফেরা করার দাবি করে। প্রশ্ন হলো, যেখানে কারাগারে এ ধরনের বন্দিদের আলাদা রাখার কথা; সেখানে তারা সংগঠিত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনের সুযোগ পেল কীভাবে! অভিযোগ রয়েছে, কারাগারে জঙ্গিদের ওপর সেভাবে নজরদারি নেই। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে কারাগারকে ‘প্রশিক্ষণ সেন্টারে’ পরিণত করেছে জঙ্গিরা। সংবাদপত্রেও এ নিয়ে খবর প্রকাশিত হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে জঙ্গি বন্দিরা সাধারণ কয়েদিদের মধ্যে ঘোরাফেরা তো দূরের কথা নিজেদের মধ্যেও যেন সলাপরামর্শ করতে না পারে সেদিকে সতর্ক হওয়া উচিত। আমরা চাই না সাধারণ কয়েদি হিসেবে কারাগারে ঢুকে কেউ জঙ্গি হয়ে বেরিয়ে আসুক।

অন্যদিকে, নিষিদ্ধ থাকার পরও দেশের সবক’টি কারাগারেই দেদার মোবাইল ফোনে কথা বলছে বন্দিরা। অপরাধী ও জঙ্গিরা কারাগারের ভেতর থেকেই তথ্য ফাঁস করে দিচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেশিরভাগ কারাগারেই জ্যামার থেকেও না থাকার মতো অবস্থা। অভিযোগ উঠেছে, টাকার বিনিময়ে জ্যামারগুলো বিকল করে রেখেছে অসাধু কারারক্ষীরা। ওই সব জ্যামার দ্রুত সচল করা ও নতুন জ্যামার বসানোর পদক্ষেপ নিতে হবে। অভিযোগের পর কিছুদিন ঠিকমতো সবকিছু চললেও ধীরে ধীরে তা ফিরে যায় আগের অবস্থায়। কিন্তু ঢাকা কেন্দ্রীয় ও কাশিমপুরের চার কারাগারে কীভাবে বন্দিরা মোবাইল ফোন ব্যবহার করে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এর সঙ্গে জড়িত কারারক্ষীদের শাস্তির আওতায় আনতে হবে।

পুলিশের ঊর্ধ্বতন দুই কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, কারাগারের অধিকাংশ দুর্ঘটনার সঙ্গে একশ্রেণির অসাধু কারা কর্মকর্তা-কর্মচারী, কর্তব্যরত পুলিশের কিছু সদস্য জড়িত থাকে। বন্দি আনা-নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছু পুলিশ সদস্য ওই সময় বন্দিদের মাদক, মোবাইল ফোন ও বিভিন্ন অবৈধ দ্রব্য দিয়ে থাকে বলে তারা তথ্য পেয়েছেন। কারাগারে ইলেকট্রনিক ডিভাইস ব্যবহার করে অপরাধীরা তাদের সহযোগীদের আগাম তথ্য পাচার করে দিয়ে থাকে, এমন তথ্য পাওয়া গেছে। কারা কর্তৃপক্ষের এই অনিয়ম, অসততার সুযোগ নিচ্ছে কারাবন্দি জঙ্গিরা। পুলিশ সদর দপ্তরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে জঙ্গির সংখ্যা প্রায় সাত হাজারের বেশি। জামিনপ্রাপ্ত জঙ্গিদের অনেকেই আবার উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হয়ে পড়ছে। আবার কেউ কেউ আত্মগোপনে চলে যাচ্ছে। একটি গোয়েন্দা সংস্থার সর্বশেষ এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যোগাযোগের জন্য জেলখানাকেই আপাতত নিরাপদ জায়গা মনে করছে জঙ্গিরা। জামিনে বের হয়ে আসা জঙ্গি সংগঠনের সদস্যদের নিয়ে করা প্রতিবেদনেও এর সত্যতা পাওয়া গিয়েছে। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, ‘বাইরে জঙ্গিরা দুর্বল হয়ে পড়লেও কারাবন্দি জঙ্গিরা বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে। কারাগারে জঙ্গিদের জন্য আলাদা সেল না থাকায় এ সমস্যা তৈরি হচ্ছে। জঙ্গিরা একত্রিত হয়ে নতুন নতুন পরিকল্পনার সুযোগ পাচ্ছে।’ জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে বিভিন্ন সরকারি প্রচারণা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাফল্যের দাবির কথা আমরা শুনে আসছি। কিন্তু তার অর্থ এই নয় যে, সরকার জঙ্গিবাদ নির্মূল করতে পেরেছে। বিভিন্ন ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠী নাম পরিবর্তন করে, কৌশল পরিবর্তন করে তৎপরতা চালিয়ে আসছে। সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কিশোর-তরুণদের জঙ্গি দলে নাম লিখিয়ে নিরুদ্দেশ হওয়া, প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের সন্ধান ও গ্রেপ্তারের খবর নিয়মিতই সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়ে আসছে। ফলে সতর্কতা ও পদক্ষেপ জরুরি।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত