কথা বলা বা মনের ভাব প্রকাশের মাধ্যম ভাষা। পৃথিবীজুড়ে জাতি, ধর্ম, বর্ণের পাশাপাশি ভিন্নতা রয়েছে ভাষারও। এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার জন্য কিংবা অন্য দেশের জাতি, সভ্যতা, সংস্কৃতি তথা দেশ সম্পর্কে জানার জন্য ভাষা জানা জরুরি। ভাষা শিখে সম্মানজনক উপার্জনও করা সম্ভব। লিখেছেন অরণ্য সৌরভ
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরাসি ভাষা ও সংস্কৃতি বিভাগের স্নাতকের শিক্ষার্থী মনির হোসাইন পড়াশোনার পাশাপাশি পরিচালনা করছেন ফ্রেঞ্চ ভাষার প্রতিষ্ঠান ‘ফ্রেঞ্চ ল্যাব’। যা অনলাইনে ফ্রেঞ্চ ভাষা শেখানোর পাশাপাশি বিভিন্ন করপোরেট ট্রেনিং এবং বিভিন্ন স্কুলে ফ্রেঞ্চ ক্লাব গঠনে সহযোগিতা করেন। তিনি বলেছেন ‘পেশা হিসেবে বিদেশি ভাষাকে বেছে নেওয়া যেতে পারে তবে যথেষ্ট দক্ষ হিসেবে নিজেকে গড়ে নিতে হবে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ইংরেজি ছাড়া অন্যান্য ভাষায় ক্যারিয়ার তৈরি এখনো কিছুটা চ্যালেঞ্জিং। সব ভাষার সমান চাকরি ক্ষেত্র বা চাহিদা নেই।’
সোনারগাঁও ইউনিভার্সিটির নেভাল আর্কিটেকচার অ্যান্ড মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এর শিক্ষার্থী হাসান শরীফ। করোনাকালীন অবসর সময়ে কিছু করার তাগিদা থেকে ‘নিহোনগো লার্নিং পয়েন্ট’ নামক জাপানিজ ভাষা শেখার অনলাইন কোর্সে ভর্তি হন। সেখানেই তার বিদেশি ভাষা শেখার হাতেখড়ি। এখন জাপান থেকে পরিচালিত জাপানি ভাষা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও এজেন্সি ‘দাই ইচি জাপানিজ ল্যাংগুয়েজ অ্যাকাডেমি’র পরিচালনা করছেন। তিনি বলেছেন, ‘ভাষা শিখে স্বল্প খরচে বিশ্বের প্রথম সারির জাপানিজ বিভিন্ন ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করা যায়। পাশাপাশি সরকারিভাবে বিনামূল্যে ওয়ার্ক ভিসায় জাপান গিয়েও অল্প সময়ে ক্যারিয়ার গড়া যায়। এছাড়া দেশে থাকা জাপানিজ বিভিন্ন কোম্পানিতে দোভাষী বা অন্যান্য পেশায় ভালো বেতনে চাকরি করার সুযোগ রয়েছে।’
কথা বলা বা মনের ভাব প্রকাশের অন্যতম মাধ্যম ভাষা। পৃথিবীজুড়ে জাতি, ধর্ম, বর্ণের পাশাপাশি ভিন্নতা রয়েছে ভাষায়ও। এক দেশ থেকে আরেক দেশে যাওয়ার জন্য কিংবা অন্য দেশের জাতি, সভ্যতা,
সংস্কৃতি তথা দেশ সম্পর্কে জানার জন্য ভাষা জানা জরুরি। বিদেশে পড়াশোনা, ঘরে বসে আউটসোর্সিং-এর জন্য অনেক লোক ভাষা শিখে এবং শেখায়, তাই ভাষা দক্ষতাও পেশা হতে পারে বলে জানান হাসান শরীফ। তিনি বলেছেন, ‘অনেক মানুষ এখন এই পেশায় নিয়োজিত, উপার্জনও করছে। যারা সৃজনশীলতা পছন্দ করেন তাদের ভাষা-পেশা হতে পারে ভালো উপায়।’
প্রাধান্য কোন ভাষায় : বাংলাদেশের বাজারে চায়না এবং জাপানের অনেক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করছে। তাই চায়নিজ এবং জাপানিজ ভাষায় ক্যারিয়ার গড়ার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের যেসব প্রকল্প নির্মাণে কাজ করে, সেখানে দোভাষী হিসেবে কাজ করা যায়, বাংলাদেশে চায়না বা জাপানিজ ভাষার শিক্ষকও হওয়া যায়।
ইউরোপের ভাষাগুলোর মধ্যে জার্মান ভাষার একটা ভালো চাহিদা রয়েছে বলে মনে করেন মনির হোসাইন। জার্মান ভাষার শিক্ষক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ার সুযোগের পাশাপাশি জার্মান অ্যাম্বাসিতে কাজের অধিক সুযোগ রয়েছে।
মনির হোসাইনের মতে, ফ্রেঞ্চ ভাষায় শিক্ষক হিসেবে ক্যারিয়ার গড়ে তোলার সুযোগ বেশি। তিনি বলেন, ‘ইংরেজি মাধ্যমের স্কুলগুলোতে দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে ফ্রেঞ্চ ভাষা চালু আছে। এর বাইরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও এখন ফরাসি ভাষার বিভিন্ন কোর্স চালু হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে পুলিশ ও সেনা সদস্যরা অংশ নেন, এক্ষেত্রে ফ্রেঞ্চ ভাষা জানা লোকদের অগ্রাধিকার বেশি। বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বেসামরিক দোভাষী নিয়োগ দিয়ে থাকে।’
কোথায় কাজ করবেন : বিদেশে পড়াশোনা করতে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই মূলত বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা ভাষা শেখেন। তবে এই দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দূতাবাস, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা, বিদেশি মিশন, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা, বিভিন্ন প্রকল্পে দক্ষ দোভাষীর ব্যাপক কদর রয়েছে। এছাড়া অনুবাদক সংস্থা, পাঁচতারা হোটেল-মোটেল, ট্যুরিজম কোম্পানি বা ট্রাভেল এজেন্সি, রিসোর্ট, শিক্ষকতা, ট্রেইনার, ঘরে বসে আউটসোর্সিং, বিমান ও পরিবহন কোম্পানিতেও রয়েছে বিদেশি ভাষা জানা মানুষের অনেক চাহিদা। তাছাড়া বিভিন্ন দেশে চাকরির আবেদনের ক্ষেত্রে সে দেশের ভাষা জানা প্রার্থীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
কী ধরনের কাজ করবেন : দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে সাংবাদিকতা, দলিল, মামলা-মোকদ্দমার কাগজপত্র, জীবনবৃত্তান্ত, হলফনামা, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সনদ, ভিসাসংক্রান্ত বিভিন্ন কাগজ, বিদেশি সাহিত্য অনুবাদের কাজ করতে পারেন। ট্যুরিস্ট গাইড হিসেবে বিদেশি পর্যটক এবং পর্যটন মোটেলগুলোতে কাজ করতে পারেন। ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ে দখল থাকলে ফ্রিল্যান্সার হতে পারেন। দোভাষীদের কাজ সম্পর্কে মনির হোসাইন বলেছেন ‘দোভাষীদের কাজ নির্দিষ্ট ভাষা থেকে বাংলা বা ইংরেজি অনুবাদ বা এর বিপরীত। এটা দুভাবে হতে পারে, সরাসরি কোনো কনভারশনকে অনুবাদ করে দুটি পক্ষকে বুঝিয়ে দেওয়া বা কোনো ডকুমেন্টকে অনুবাদ করা।’ দোভাষী হিসেবে কাজ করতে চাইলে ভাষার চারটি দক্ষতা- রিডিং, রাইটিং, লিসেনিং ও স্পিকিং সবগুলোতেই দক্ষ হতে হবে, যোগ করেন তিনি।
আয়-রোজগার : কে কোন ভাষা শিখেছে ও বাজারে তার চাহিদা এবং দক্ষতার ওপর বেতন নির্ভর করে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ভাষাকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিলে, সম্মানজনক উপার্জন করা যায় বলে জানান মনির হোসাইন।
