কাতার বিশ্বকাপ ২০২২ এর ফাইনালে মুখোমুখি ইউরোপের ফ্রান্স ও লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনা। রুদ্ধশ্বাস ম্যাচ, ক্ষণে ক্ষণে বিজয়ের কাঁটা ঘুরে এদিক ওদিক। শেষ পর্যন্ত জয় উঠেছে আর্জেন্টিনার ঘরে। ম্যাচের পেনাল্টি, অফসাইড হওয়া না হওয়া নিয়ে নানা বিতর্ক হলেও শেষ পর্যন্ত ট্রফি চলে গেছে লাতিনে।
ফ্রান্স একটি ইউরোপের দেশ। অন্যদিকে আর্জেন্টিনা লাতিন আমেরিকার। সাধারণ চিন্তায় লাতিনে মিশ্র বর্ণের ও ইউরোপে শে^তাঙ্গ মানুষের বসবাস বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু বিশ্বকাপ ফাইনালে দেখা গেল উল্টো চিত্র। ফ্রান্স টিমে খেলেছে কৃষ্ণ ও মিশ্র বর্ণের খেলোয়াড় অন্যদিকে আর্জেন্টিনা টিমে খেলেছে শে্বতাঙ্গ খেলোয়াড়রা। বিশ্বকাপ ফুটবলের আসরে প্রতিটি টিম তাদের দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে। দুই দলের টিম নিয়ে পূর্ব ধারণা নেই এমন কেউ আর্জেন্টিনার টিমকে ইউরোপীয় টিম ও ফ্রান্সের টিমকে আফ্রিকার টিম ভেবে ভুল করতে পারে। আলোচনাটা খেলোয়াডের গায়ের রং নিয়ে হলেও এটা মোটেও বর্ণবাদী আলোচনা নয়। বরং এখানে যে উপনিবেশবাদ ও বর্ণবাদের আসল চিত্র লুকিয়ে আছে সেটাই দেখার চেষ্টা।
বিশ্বজুড়ে যখন দাস ব্যবসার রমরমা চলছিল তখন লাতিন আমেরিকার আর্জেন্টিনাতেও পৌঁওছছিল দাস বণিকদের জাহাজ। Africana, the Encyclopaedia of the African and African American Experience-এ জয় এলিহান্দ্রো লিখেছেন, ১৭০০ সালের দিকে আর্জেন্টিনার জনসংখ্যার অর্ধেক এবং রাজধানীর ৪০-৪২ ভাগই ছিল কৃষ্ণাঙ্গ অথবা মিশ্র বর্ণের। তারা নানারকম বৈষম্যের মধ্যে বসবাস করত। ১৮১২ সালে আর্জেন্টিনার বিখ্যাত রাজনীতিবিদ বেরনার্ডুকে দেশের এক্সিকিউটিভ বডি থেকে বাদ দেওয়া হয় কারণ তার মা ছিল আফ্রিকান বংশোদ্ভূত। আর্জেন্টিনায় যেখানে শে^তাঙ্গ বাচ্চারা ৪ বছরের মাধ্যমিক শিক্ষা পেত কৃষ্ণাঙ্গরা পেত ২ বছর। ১৮৫৩ সালের আগে কোনো কৃষ্ণাঙ্গের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অনুমতি ছিল না।
আজ লাতিন আমেরিকাতে কৃষ্ণাঙ্গ ও মিশ্র বর্ণের আধিপত্য থাকলেও আর্জেন্টিনায় সাদারাই একচ্ছত্র! আর্জেন্টিনায় কৃষ্ণাঙ্গদের নিধন করা হয় মূলত ১৮৬৫-১৮৭০ সালের প্যারাগুয়ে যুদ্ধে। ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে মিত্র শক্তি প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধে আর্জেন্টিনার কৃষ্ণাঙ্গদের পরিকল্পিতভাবে যোদ্ধা ও মানব ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে। আর্জেন্টিনার সরকার যুদ্ধে কৃষ্ণাঙ্গ ও মিশ্র বর্ণের লোকদের বাছাই করে যুদ্ধে যেতে বাধ্য করেছিল। এই পরিকল্পনার মূলহোতা ছিলেন দেশটির সপ্তম রাষ্ট্রপতি ডমিঙ্গো ফিস্তনো সারমিয়েন্তো। ১৮৬৫ এর দিকেই আর্জেন্টিনায় দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হয়। ফলে একদিকে আর্জেন্টনায় কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের আসা বন্ধ হয় অন্যদিকে যুদ্ধে তারা হাজারে হাজারে মারা পড়ে। দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হওয়া ও পাঁচ বছরের যুদ্ধে অগণিত কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তির মৃত্যুর পরও কিছু কৃষ্ণাঙ্গ ব্যক্তি বেঁচে ছিল। কিন্তু যুদ্ধ শেষে আর্জেন্টিনা ‘বিশুদ্ধ শে^তাঙ্গ জাতি’ তৈরির অভিযানে নামে। হিটলার যেভাবে ইহুদিমুক্ত জার্মানি গড়তে চেয়েছিলেন, রাখাইনরা যেভাবে রোহিঙ্গামুক্ত আরাকান চায় ঠিক তেমনি কৃষ্ণাঙ্গমুক্ত দেশ গড়ার লক্ষ্যে দেশটিতে কৃষ্ণাঙ্গদের জঙ্গলে বসতি গড়তে বাধ্য করা হয়। পরে এসব বিচ্ছিন্ন অঞ্চলে কলেরা ও পীত রোগে অসংখ্য কৃষ্ণাঙ্গ মৃত্যুবরণ করে। বর্তমানে বিরল হলেও কিছু মিশ্রবর্ণের আফ্রো-আর্জেন্টাইন সেখানে বাস করে। তারা মূলত যুদ্ধে পুরুষদের মৃত্যুর পর জীবিত থাকা কৃষ্ণাঙ্গ নারীদের গর্ভে জন্ম নেওয়া শে্বতাঙ্গ ঔরসজাত প্রজন্ম। ফলে লাতিন আমেরিকার অন্যান্য টিমে কৃষ্ণাঙ্গ বা মিশ্রবর্ণের খেলোয়াড় দেখা গেলেও আর্জেন্টিনার দলটি একেবারেই ‘ইউরোপীয় ধবধবে শ্বেতবর্ণের টিম’। অবশ্য বোঝাই যাচ্ছে যে- আজ থেকে দেড়শ বছর আগেই বিশ্বে একটি বিশুদ্ধ শ্বেতাঙ্গ জাতি হিসেবে পরিচিতি পেতে চেয়েছিল আর্জেন্টিনা।
২০১৮ এর বিশ্বকাপ ফাইনালের আরেক রোমাঞ্চকর ম্যাচে ক্রোয়েশিয়াকে ৪-২ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল ফ্রান্স। সে ম্যাচে দুর্দান্ত একটি গোল করে ফ্রান্সের জয় নিশ্চিত করেছেন কিলিয়ন এমবাপ্পে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে খেলতে এসে সে বিশ্বকাপে চারটি গোল করে বিশ্বের নজর কেড়েছিলেন এমবাপ্পে। ২০২২ এর বিশ্বকাপে ফ্রান্সের জয়ের জন্য কান্ডারি হিসেবে শেষ পর্যন্ত লড়েছিলেন এই তরুণ। এবার বিশ্বকাপ শিরোপা জিততে না পারলেও হাতে উঠেছে মর্যাদাপূর্ণ গোল্ডেন বুট। কিন্তু এমবাপ্পে মেজরিটি ফ্রেঞ্চদের মতো শ্বেতবর্ণের নন। মিশ্রবর্ণের এই তরুণের বাবা উইলফ্রিদ একজন খ্রিস্টান ও এসেছিলেন ক্যামেরুন থেকে। আর মা হলেন আলজেরিয়ান বংশোদ্ভূত ফেজা লামারি, ধর্মে মুসলিম ও পেশায় একজন হ্যান্ডবল খেলোয়াড়। ফ্রান্সের আরেকজন তারকা খেলোয়াড় পল লাবিল পগবাও একজন মুসলিম কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড। পল পগবার জন্ম ফ্রান্সে হলেও তার শেকড় গিনিতে। গিনির মুসলিম দম্পতির সন্তান পল পগবা। এমনকি তার অপর দুই যমজ ভাই ম্যাথিয়াস পগবা ও ফ্লোরেনটিন পগবা গিনি জাতীয় দলের হয়ে খেলেন।
কিন্তু কীভাবে আফ্রিকান এসব রতœ হয়ে গেলেন ফ্রেঞ্চ জাতীয়তাবাদের প্রতিনিধি! এটাই উপনিবেশবাদের চক্র। টেক দ্য বেস্ট অ্যান্ড লিভ দ্য রেস্ট। দুর্দান্ত খেলে বলে এমবাপ্পে ও পল পগবা ফ্রেঞ্চ। কিন্তু একই ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে আসা আফ্রিকান কৃষ্ণাঙ্গ মুসলিম এসব পূর্বপরিচয় নিয়ে ফ্রেঞ্চ হওয়া অন্যান্য তরুণের জীবন কি ফ্রান্সে একই! ফ্রান্স কি অন্যদের নিয়ে যেভাবে গর্ব করে সেভাবেই কি এমবাপ্পে ও পল পগবাকে নিয়ে করে? উত্তর হলো, না।
ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া আফ্রিকানদের নানা ধরনের বৈষম্যের মধ্য দিয়ে যেতে হয় এবং তাদের ফ্রেঞ্চ হিসেবে গণ্য করা হয় না। ফ্রান্সে মোট জনসংখ্যার মাত্র ৮ শতাংশ মুসলিম হলেও জেলখানাতে ৫০ শতাংশের অধিক কয়েদি আফ্রিকান বংশোদ্ভূত মুসলিম, যারা এমবাপ্পে ও পল পগবার জাতভাই। ফলে ফ্রেঞ্চ একজন সাধারণ আফ্রিকান বংশোদ্ভূত কৃষ্ণাঙ্গের জীবন মোটেও ফ্রেঞ্চ জাতীয়তাবাদের গর্ব এমবাপ্পে ও পল পগবার মতো না। তাদের জীবন ওই জেলখানায় বন্দি ৫০ শতাংশ কয়েদির মতো।
প্রতি বছর ফ্রান্স আফ্রিকা থেকে আসা অন্তত ১০ হাজার আশ্রয়প্রার্থীকে ফিরিয়ে দেয়। কিন্তু এমবাপ্পে ও পল পগবার মতো রতœরা হয়ে ওঠেন ফ্রেঞ্চ জাতীয়তাবাদের পরিচায়ক। এভাবে বছরের পর বছর ধরে আফ্রিকার রতœ দখল করে আজকের ফ্রান্সের নির্মাণ। ঘোষণা দিয়ে আফ্রিকানদের ‘সভ্য’ করে তোলার প্রত্যয়ে আফ্রিকার ২৪টা দেশে ফ্রান্সের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। ফ্রান্সের দখল করা ২৪ দেশের মধ্যে ১৪ দেশে এখনো চলছে ফ্রান্সের শোষণ। টোগো, বেনিন, বুরকিনা ফাসো, গিনি বিসাউ, সেনেগাল, আইভরিকোস্ট, মালি, নাইজার, চাদ, ক্যামেরুন, মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র, কঙ্গো (ব্রাজাভিলা), নিরক্ষীয় গিনি ও গ্যাবনসহ ১৪ দেশকে বলা হয়ে থাকে ফ্রান্সফ্রিকা বা ফ্রাংক জোন। কারণ এই ১৪টি দেশকে ব্যবহার করতে হয় ফ্রান্স নিয়ন্ত্রিত মুদ্রা ফ্রাংক।
এসব দেশের জাতীয় আয়ের ৬৫ শতাংশই এখনো জমা রাখতে হয় ফ্রান্সে। আর তাদের আয়ের প্রায় ২০ শতাংশই ব্যয় করতে হয় ফ্রান্সের নানা দেনা মেটাতে। দেশ চালাতে অর্থের প্রয়োজন হলে তাদের অর্থই ফ্রান্সের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হয়। এই চক্র থেকে বের হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আফ্রিকায় ফ্রান্সফ্রিকা নামে একটি নেটওয়ার্ক আছে। এই নেটওয়ার্কের কাজ হচ্ছে ফ্রান্সের চক্র থেকে বের হতে চাওয়া রাজনীতিবিদদের ক্যু, রাজনৈতিক হত্যাকা- ও কারচুপির নির্বাচনের মাধ্যমে দমিয়ে রাখা। সিলভানাস অলিম্পিতে ১৯৬৩ সালে টোগোতে নিজস্ব মুদ্রা চালুর লক্ষ্যে জাতীয় ব্যাংক প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। কিন্তু তার পরের দিন ফ্রান্সের প্রশিক্ষিত স্বদেশিরা তাকে হত্যা করে। ১৯৬৩ সালের পর থেকে এই পর্যন্ত ফ্রান্সফ্রিকার ১৪ দেশের ২২ জন সরকারপ্রধান হত্যার শিকার হন। যারা প্রত্যেকে নিজেদের জাতীয়তাবাদ নিয়ে সচেতন হয়ে উঠতে চেয়েছিলেন।
এসব দেশে অন্য দেশের বিনিয়োগের সুযোগও নেই। চীন-ঘেঁষা আইভরি কোস্টের প্রেসিডেন্ট লঁরা বেগবো একটি সেতু গড়তে চেয়েছিলেন। এই সেতু নির্মাণে ফরাসি একটি সংস্থা মার্কিন ডলারে একটি দাম হাঁকে। কিন্তু তার অর্ধেক দাম হাঁকে চীনা প্রতিষ্ঠান। তারা অর্থ পরিশোধের সুযোগ দিয়েছিল আইভরি কোস্টের প্রাকৃতিক সম্পদ কোকো বিন দিয়ে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লঁরা বেগবোকেই ক্ষমতা থেকে সরে যেতে হয়।
গৃহযুদ্ধ চলছিল মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্রে। ফ্রান্সের অনুগত বনাম বিরোধী দলের মধ্যে। রাজধানী বাঙগুই বিমানবন্দরে মাত্র ৩০০ সৈন্য পাঠিয়ে অনুগতদের ক্ষমতা দখল করে দেয় ফ্রান্স। অন্যতম সম্পদশালী দেশ মালি। মালির ইউরেনিয়ামের পুরোটাই যায় ফ্রান্সে। চলতি দশকের শুরুতে শ’তিনেক মাফিয়া ও বিদ্রোহীদের হাত থেকে সোনার খনি রক্ষার কথা বলে ৪ হাজার ফরাসি সৈন্য ঘাঁটি গেড়ে বসেছে মালিতে। এছাড়া জিবুতি, গ্যাবন, সেনেগালেও সামরিক ঘাঁটি রয়েছে ফ্রান্সের। ২০১১ সালের কথিত আরব বসন্তের প্রাক্কালে লিবিয়ার গাদ্দাফির বিরোধীদের প্রথম সমর্থন দেয় ফ্রান্স। তার অন্যতম কারণ গাদ্দাফির আপসহীন মানসিকতা ও আফ্রিকান জাতীয়তাবাদের নেতৃত্ব দেওয়া যা ফ্রান্সের উপনিবেশের ভিত কাঁপিয়ে দিচ্ছিল।
ফ্রান্সের প্রয়োজনীয় বিদ্যুতের জোগান দেওয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের চারভাগের তিনভাগই পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এসব কেন্দ্রের কাঁচামাল ইউরেনিয়ামের বড় জোগানদাতা গ্যাবন, মালিসহ আফ্রিকার দেশগুলো। তাই গ্যাবনে দশকের পর দশক ধরে ফ্রান্স বসিয়ে রেখেছে তার পুতুল সরকার। আফ্রিকার ইউরেনিয়াম দিয়ে যেভাবে প্যারিস ঝলমল করছে তেমনি আফ্রিকান বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের পায়ের জাদুতে ট্রফি যায় ফ্রান্সের ঘরে। ঔপনিবেশিকতার শেষ হলো আর কোথায়!
লেখক: কলামিস্ট
