সোমবার, ১৫ জুলাই ২০২৪, ৩১ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

পোথাট্রির ‘বিটকয়েন অফিসে’ বোকা বনেছে সবাই

আপডেট : ১১ জানুয়ারি ২০২৩, ০৪:১২ এএম

বগুড়ার দুপচাঁচিয়া উপজেলা শহর থেকে প্রায় ৭ কিলোমিটার দূরে পোথাট্রি গ্রাম। ওই গ্রামের বাজারে ছোট একটি ওষুধের দোকান রয়েছে মো. আবদুল মজিদের। এখন থেকে যা আয় হয় তাতে ভালোই চলছিল তার পরিবার। কয়েক বছর আগে একই গ্রামের রুহুল আমিনের সঙ্গে কথা হয় বিটকয়েন নিয়ে। রুহুল তাকে জানায়, বিটকয়েনের মাধ্যমে দ্রুত অধিক লাভের কথা। বিটকয়েন কিংবা প্রযুক্তি সম্পর্কে ধারণা না থাকলেও অন্যদের বিনিয়োগে দেখে প্রলুব্ধ হন মজিদ। প্রথমে একটি আইডির মাধ্যমে ৯০ হাজার টাকার সমপরিমাণ ডলার বিনিয়োগ করেন। এর মাসখানেক পর ১৫ হাজার টাকা লাভ পান তিনি, এভাবে বেশ কয়েক মাস চলে যায়। ফলে বেশ আগ্রহী হয়ে ওঠেন তিনি। বিনিয়োগ বাড়ানোর ভাবনা এঁটে বসে তার মাথায়। দুই সন্তানের নামেও আইডি খুলে টাকা দিতে মরিয়া হয়ে ওঠেন। একসময় ফাঁদের বিষয়টিও বুঝতে পারেন। তবে ততক্ষণে নিজের জমানো সব টাকা চলে যায় প্রতারক চক্রের হাতে। তার মতো বহু মানুষ এভাবে বিটকয়েন চক্রটির ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়েছেন।ব্যবসায়ী আবদুল মজিদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, অনলাইনে বিটকয়েনে বিনিয়োগের মাধ্যমে প্রচুর আয় হয় বলে প্রচার করা হয়েছে। আমাদের গ্রামের বহু মানুষ টাকা দিয়ে ব্যাপক লাভ পেয়েছে। এ খবরে আশপাশের বিভিন্ন এলাকার মানুষ টাকা দিতে ‘বিটকয়েন অফিসে’ হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এত বেশি লাভের বিষয়টি পুরো এলাকায় আলোড়ন তৈরি করে। একসঙ্গে এত মানুষের বিনিয়োগ এবং অভিযুক্ত রুহুল আমিনের কথায় প্রায় ৫ লাখ টাকা দিয়েছি। জমানো সব টাকা হারিয়ে এখন আমি প্রায় নিঃস্ব।

মজিদ এ প্রতারণার ঘটনায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ২০২১ সালে একটি মামলা করেন। এজাহারে তিনি উল্লেখ করেন, ‘এনজেড রোবো ট্রেড’ নামে সফটওয়্যার তৈরি করে এটিকে অনলাইন কোম্পানি হিসেবে পরিচিত করা হয়। সাধারণ মানুষকে বিভিন্নভাবে লাভের প্রলোভন দেখানো হয়। মূলত নিউজিল্যান্ডে ডলার বিক্রির কার্যক্রম দেখিয়ে সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করায় তারা। পোথাট্রি বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় শাখা অফিস খুলে বিটকয়েন অফিস নামে পরিচিত করে।

এতে আবদুল মজিদসহ ওই এলাকার আরও ১১ জনের ৫ হাজার ৩০০ ডলার বিনিয়োগের কথা বলা হয়। যা বাংলাদেশি টাকায় ৫ লাখ ৭৫ হাজার ৪০০ টাকা। অন্য ভুক্তভোগীদের মধ্যে ফাতেমার ২৮ হাজার ২০০, ফাহমিদার ১ হাজার ৯০, মরজিনার ৪৬ হাজার ২০০, বীথি খাতুনের ২৮ হাজার ২০০, রাজিয়ার ৯০ হাজার, পলির ৯০ হাজার, হারুনুর রশীদের ৯০ হাজার, নাসিমার ৪৬ হাজার ২০০, আলতাবের ২৮ হাজার ২০০, বাশারের ২৮ হাজার ২০০ টাকার সমপরিমাণ ডলার।

এ মামলায় দুপচাঁচিয়া উপজেলার আটজনকে অভিযুক্ত করা হয়। তারা হলেন কোলগ্রাম এলাকার মো. রুহুল আমিন, মো. ইসমাইল হোসেন, মো. গোলাম মোস্তফা সরকার, মো. আবু সাইদ, পোথাট্রি গ্রামের মো. মাসুদ রানা, মো. মাইনুল ইসলাম, মো. বেলাল হোসেন ও মো. কামরুল ইসলাম।

এ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আরও চারটি মামলা করেন ভুক্তভোগীরা। এসব মামলায় ৫৬ জন ভুক্তভোগীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এতে মো. ছামসুল ইসলামের মামলার ১৩ জন দিয়েছে ৮ লাখ ১২ হাজার টাকা, মহসিন আলীর মামলায় ১১ জন দিয়েছে ৮ লাখ ২৭ হাজার, মো. জাকির আলী ফকিরের মামলায় ১১ জন দিয়েছে ৪ লাখ ৮৭ হাজার, শাকিল শাহানার মামলায় ১০ জন দিয়েছে ৯ লাখ ৮৯ হাজার টাকার সমপরিমাণ ডলার।

পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সদর দপ্তরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আবু ইউসুফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, পোথাট্রি গ্রামে বিটকয়েনের নামে এ প্রতারণার ঘটনার পর ভুক্তভোগীর মামলা করলে আদালত এসব মামলার তদন্তের দায়িত্ব আমাদের দেন। মামলার তদন্ত শেষে আমরা ৩৯ হাজার ৭০০ ডলার খোয়া যাওয়ার প্রমাণ পেয়েছি, যা বাংলাদেশি টাকায় ৩১ লাখ ৯০ হাজার ৪০ টাকা। গত বছর আদালতে অভিযুক্ত আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র করা হয়েছে।

পিবিআই জানায়, ২০২১ সালের আগস্টে স্থানীয় মো. ফরিদ উদ্দিন প্রামাণিকের অভিযোগের ভিত্তিতে র‌্যাব ওই অফিসে অভিযান চালায়। তখন এ মামলাগুলোতে অভিযুক্ত মো. রুহুল আমিন, ইসমাইল হোসেন, বেলাল হোসেন এবং কামরুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করে। তখন তাদের কাছ থেকে ৫ লাখ ৬৮ হাজার টাকাসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। পরে অভিযুক্তরা জামিনে ফিরে এলে অন্য ভুক্তভোগীরা টাকা ফেরত চাইলে তাদের নানাভাবে হুমকি দিতে থাকে। এরপর তারাও পৃথকভাবে মামলা করেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, অভিযুক্ত মো. রুহুল আমিন সিঙ্গাপুরে ছিলেন। সেখান থেকে প্রযুক্তি সম্পর্কে কিছু ধারণা নিয়ে বাংলাদেশে ফেরেন। পরে ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভিযুক্ত আবু সাইদের ভবনের বাসা ভাড়া নেন। পরে এনজেড রোবো নামে এমএলএমের মতো সফটওয়্যার তৈরি করে ভুয়া এ প্রতিষ্ঠানটি চালু করেন। এতে বিভিন্ন স্কেলে টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে লাভের প্রচার চালায়। পরে অল্প কিছুদিন লাভের টাকা দেওয়ায় বিষয়টি পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। এরপর বহু মানুষ অবৈধ ওই প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগে আগ্রহী হয়। এ সুযোগে ওই উপজেলার বহু মানুষ না বুঝেই টাকা দেয়। পরে একসময় লাভের টাকা দেওয়া বন্ধ করে দিলে ভুক্তভোগীরা প্রতারণার বিষয়টি বুঝতে পারেন।

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত