তিন মহাদেশ-জুড়ে বিস্তৃত ছিল ওসমানীয় রাজবংশের শাসন। এই বংশের একজন সুলতান সুলাইমান ১ম ছিলেন তার সময়ে বিশ্বের সবচেয়ে সম্পদশালী সুলতান। ওসমানীয় সুলতানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময়, ৪৬ বছর শাসন করেছিলেন তিনি।
১৫১৬ থেকে ১৯১৭ পর্যন্ত জেরুজালেমসহ মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ ছিল ওসমানীয় সাম্রাজ্যের অধীন। কিন্তু জেরুজালেমে ক্যাথলিক ও অর্থডক্সদের মধ্যে বিবাদ ধীরে ধীরে তীব্র হয়ে উঠল। বিবাদটি প্রধানত বেথেলহামের নেটিভিটি চার্চের কন্ট্রোল কারা করবেরাশিয়ার অর্থডক্সরা না ফ্রাঞ্চের ক্যাথলিকরা, এ নিয়ে।
১৮৪৫ সালে রাশিয়া ঈসার (আ.) জন্মস্থানের চার্চে পেট্রিয়ার্ক পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল। ১৮৪৭ সালে ফ্রান্সও পাঠায়। একবার ক্যাথলিকরা একটি রুপার তারকা যিশুখ্রিস্টের জন্মের স্মৃতিস্মারক হিসেবে নেটিভিটি চার্চে স্থাপন করে। ওটা নাকি অর্থডক্স সাধুরা চুরি করে নিয়ে যায়।
তাদের এ ধরনের ঝগড়া দেখে ওসমানীয় সুলতান বিরক্ত হয়ে কমিশন গঠন করে ফয়সালা করার চেষ্টা করেন। ১৮৫২ সালে ফ্রান্স জোরপূর্বক সব খ্রিস্টীয় ধর্মীয় স্থানের নিয়ন্ত্রণ করা শুরু করে। রাশিয়ার জার সম্রাট এটা চ্যালেঞ্জ হিসেবে নেন। ১৮৫৩ সালে ওসমানীয় সাম্রাজ্য আর ব্রিটেন-ফ্রান্স জোটবদ্ধ হয়ে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে যেতে প্রস্তুত হয়। হুমকি প্রথম আসে রাশিয়ার জারের তরফ থেকে অভ্যন্তরীণ সংকটে পর্যুদস্ত ওসমানীয় সুলতানের কাছে। জোটবদ্ধ হয়ে সুলতান প্রথম আব্দুল মজিদ যুদ্ধের ঘোষণা দেন। প্রায় তিন বছরের এ যুদ্ধে একেক পক্ষে দুই লক্ষাধিক করে চার লক্ষাধিক সৈন্য মারা যায়। ১৮৫৬ সালে যুদ্ধ শেষ হয়। রাশিয়া হেরে যায়। রাশিয়ার সৈন্যবাহিনীতে অন্যতম কমান্ডার ছিলেন লেফটেন্যান্ট কাউন্ট তলস্তয়। ইনিই বিখ্যাত সাহিত্যিক লেভ তলস্তয়।
ক্রিমিয়ার যুদ্ধে ব্রিটেন, ফ্রান্স ছিল ওসমানীয় সাম্রাজ্যের সঙ্গে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে। কিন্তু প্রথম বিশ্বযুদ্ধে এসে রাশিয়া, ব্রিটেন, ফ্রান্স, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকা যৌথ বাহিনীর সঙ্গে মানে ওসমানীয়-জার্মানি জোটের বিরুদ্ধে। তখন ওসমানীয় সাম্রাজ্যের শেষ সুলতান ষষ্ঠ মুহাম্মাদ মুসলিম বিশ্বকে জিহাদে অংশ নেওয়ার ডাক দিয়েও সাড়া পাননি। ১৯১৮ সালের ৩০ অক্টোবর ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজে সাম্রাজ্যের বাইরে ওসমানীয় আত্মসমর্পণ স্বাক্ষর হয়। যৌথবাহিনীর সৈন্যরা কনস্টান্টিনোপল এসে সুলতানের প্রাসাদ দখল করে রাখে।
কঠিন পরিস্থিতি! কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের মাধ্যমে সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ যে অবিস্মরণীয় ইতিহাস রচনা করেছিলেন, বাইজেন্টাইন ক্রুসেডারদের সাম্রাজ্যের পতন ঘটিয়েছিলেন, সেই কনস্টান্টিনোপল আবার খোয়া যাবে? তখনের ক্রুসেডার রাজ্য ব্রিটেন ও ফ্রান্স কি অটোমানদের মূল ভূখণ্ড বর্তমান তুরস্ক দখলে নেবে? পাশেই গ্রিস ওঁৎ পেতে আছে আনাতোলিয়া দখলে নিতে। চৌদিকে জেগে উঠল বিস্ময়করভাবে জাতীয়তাবাদী চেতনা। অন্য ইতিহাসের যাত্রা শুরু হলো। কখনো দেশভিত্তিক জাতীয়তাবাদ আত্মরক্ষার কৌশল। তা না হলে আদ্রিয়ানোপল ও কনস্টান্টিনোপল এখন পর্যন্ত তুরস্কের অধীন থাকত না। কিন্তু মুসলমানদের ক্ষতি হয়েছে অন্যদিকে।
চার বছরের প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতে হতে ওসমানীয় সাম্রাজ্যও বিলুপ্তির শেষ প্রান্তে চলে আসে। ১৯০১ থেকে ১৯২৩ পর্যন্ত, অর্থাৎ মোস্তাফা কামাল পাশার নেতৃত্বে রিপাবলিক অব টার্কি প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত আসলে বহু ঐতিহাসিক ঘটনার ভেতর দিয়ে যায় ওসমানীয় রাজবংশ। ভেতরে ও বাইরে শত্রু।
মোস্তাফা কামাল পাশা ছিলেন ওসমানীয় সাম্রাজ্যের সামরিক বাহিনীর ১৯তম ডিভিশনের কমান্ডার। ১৯১৯ সালের ৮ জুলাই ইস্তফা দিলে সুলতানের সরকার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে। কামাল এরমধ্যেই তার দলীয় প্রচারণার মাধ্যমে বর্তমান তুরস্ক ভূখণ্ডের মানুষের মধ্যে জাতীয়তাবাদী চেতনা জাগিয়ে তুলেছেন। তখন ভূখণ্ডের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সুলতানি আমলের পতন চাওয়ার পাশাপাশি সতর্ক হয়ে ওঠে বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে। ওসমানীয় সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হওয়ার এ ক্রান্তিকালে, গ্রিকরা দখল করতে চায় তুরস্কের ইজমির প্রদেশ, ফ্রান্স ব্রিটেনের যৌথবাহিনী কনস্টান্টিনোপল প্রাসাদে রয়েছে। ফ্রান্স, ব্রিটেন চাচ্ছে দেশটা টুকরো টুকরো করে দিতে। পূর্ব আনাতোলিয়ার প্রদেশগুলো একত্র করে আর্মেনিয়া স্বাধীন রাষ্ট্র করতে চায়। তারাও মোস্তাফা কামাল পাশাকে গ্রেপ্তার করতে চায়। অন্যদিকে, তিনি চান তুরস্কের জনগণের স্বাধীনতা। এক পর্যায়ে ‘কনস্টান্টিনোপলের রক্ষাকর্তা’ পরিচিত বীরযোদ্ধা কনস্টান্টিনোপল থেকে ৪৮০ কিলোমিটার দূরে আঙ্কারা চলে যান গ্রেপ্তার এড়াতে। রাশিয়ায় ইতিমধ্যে ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লব হয়ে গেছে। সম্রাট জারের আমলে সংঘটিত যুদ্ধে রাশিয়া ফ্রন্টে বীরত্ব প্রদর্শন করতে পারায় মোস্তাফা কামাল জেনারেল পদে উন্নীত হন, তখন থেকেই নামের সঙ্গে পাশা যুক্ত হয়।
আঙ্কারায় ১৯২০ সালের ২৩ এপ্রিল গ্র্যান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলিতে মোস্তাফা কামালকে রিপাবলিক অব টার্কির প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয়। নবগঠিত সোভিয়েত ইউনিয়ন সবার আগে মোস্তাফা কামাল পাশাকে স্বীকৃতি দেয়। সোভিয়েতের মিলিটারি সহায়তা পেয়ে ইজমির থেকে গ্রিসকে হটিয়ে দিতে সমর্থ হন কামাল আতাতুর্ক। আতাতুর্ক মানে জাতির পিতা।
পরে ১৯২২ সালে শেষ ওসমানীয় সুলতান ক্ষমতাচ্যুত হতে বাধ্য হন। ওসমানীয় রাজবংশের পুরো পরিবারকে নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে নতুন প্রতিষ্ঠিত রিপাবলিক তুরস্কের নেতারা। ১৫৬ জন রয়েল পরিবারের সদস্যকে তিন দিনের ভেতর তাদের স্বদেশ থেকে বিতাড়িত করা হয়। তাদের খাদেমরা যারা তাদের সঙ্গে থাকতে চায়, ওদেরসহ নির্বাসিতের সংখ্যা শত শত হয়ে যায়।
ক্ষমতাচ্যুত ওসমানীয় রয়েল পরিবারের সদস্যদের কেবল বেরিয়ে যাওয়ার পাসপোর্ট দেওয়া হয়। তারা চেয়েছিলেন মিসরে আশ্রয় নিতে। রাজা ফুয়াদ ও ব্রিটিশরাজ সে সুযোগ দেননি। তারা সিরিয়া যেতে চেয়েছিলেন কিন্তু কামাল আতাতুর্কের সরকার বাধা দেয়। পরে কিছু সদস্য ফ্রান্সশাসিত বৈরুতে যান, বাকিরা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নেন। রয়েল পরিবারের কাছের মানুষ, যাদের ‘বিশ্বস্ত’ মনে করা হতো, তারাও দুর্দিনে ধোঁকা দিয়ে অর্থ সম্পদ হাতিয়ে নিয়েছেন। দাদা পরদাদার কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বাড়ি-গাড়ি, স্বর্ণালংকার, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি পানির দরে ‘বিশ্বস্ত’দের দিয়েও ন্যায্য হকটুকু না পেয়ে সাধের জন্মভূমি ছেড়ে যেতে হয়েছে তাদের।
বিতাড়িত হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই কোনো কোনো অটোমান রয়েল সদস্য ইউরোপের বিভিন্ন দেশে কেউ হোটেলে ডিশ সাফ করে, কেউ ভিক্ষা করে, কেউ কেউ আবর্জনার স্তূপ থেকে ক্যান কুড়িয়ে খাবার জোগাড় করেন। কেউ কেউ অনাহারে মারা গেছেন। (দ্য বিটার স্টোরি অব দি অটোমান ডাইনেস্টি’জ অ্যাক্সাইল বাই একরাম বোগরা আকিঞ্জি, ডেইলি সাবাহ, মার্চ ২০১৫।)
১৯৩৪ সালে কামাল পাশা সরকারের আমলে আদালতের রায় অনুসারে হায়াস সোফিয়া মসজিদকে মিউজিয়াম করা হয়। ওসমানীয় সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহ (মুহাম্মাদ দ্বিতীয়), যিনি কনস্টান্টিনোপল জয় করেছিলেন, যিনি এথেন্স জয় করে একেবারে ইতালির কাছে চলে গিয়েছিলেন। যিনি হায়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর করেছিলেন, যিনি সুলতানদের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্যে, ওসমানীয় সাম্রাজ্য টিকিয়ে রাখার জন্য পরবর্তী সময়ে সুলতান পরিবারের ভেতরে কাকে কাকে মেরে ফেলতে হবে, এ বিষয়ে কানুনও করেছিলেন। এ কানুন অনুযায়ীই পরবর্তী সময়ে ক্ষমতায় আসা সুলতান তৃতীয় মুহাম্মাদের ১৯ সন্তানকে হত্যা করা হয়েছিল। (তুর্কচে ভাষায় আরবি মুহাম্মাদ শব্দটিকে বলা ও লেখা হয় ‘মেহমেত’। তবু টিকল না সাম্রাজ্য। কেন আর টিকে থাকার দরকার নেই? এ প্রশ্নের উত্তর বহু হতে পারে।
সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহের ছেলে দ্বিতীয় বায়েজিদ বাপের কথা শুনতেন না। সমালোচনা করতেন কঠোরভাবে। মনে করা হয়, সম্ভবত এই ছেলেরই ইশারায় অসুস্থ সুলতান মুহাম্মাদকে বিষ খাইয়ে হত্যা করা হয়েছিল। তখন মাত্র ৪৯ বছর বয়স সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহের। (According to the historian Colin Heywood, “there is substantial circumstantial evidence that Mehmed was poisoned, possibly at the behest of his eldest son and successor, Bayezid.)
এরপর সুলতান হন দ্বিতীয় বায়েজিদ। এটা ঠিক যে, কনস্টান্টিনোপল জয় সুলতান মুহাম্মাদ আল ফাতিহের অসাধারণ কৃতিত্ব। তবু বিষয়টি এমন নয় যে, তিনি যা কিছু করেছেন সব সঠিক; না তা না, তিনি ভুলের ঊর্ধ্বে ছিলেন না। ভুল তার হতেই পারে। (তথ্যসূত্র: এনসিয়েন্ট হিস্টোরি এনসাইক্লোপেডিয়া)
উল্লেখ্য, ওসমানীয় শেষ সুলতান মুহাম্মাদ ষষ্ঠ দোলমাবাশে প্রাসাদ থেকে পেছনের দরজা দিয়ে কনস্টান্টিনোপল ছেড়ে যান, যেতে হয় একেবারে স্বদেশের বাইরে নির্বাসনে, ৬২৪ বছরের তারই রাজবংশের বীরত্বগাথা ইতিহাস পেছনে রেখে।
লেখক: কবি, অনুবাদক, প্রাবন্ধিক
