বাংলা ভাষার অবিচল সাধক

আপডেট : ১২ জানুয়ারি ২০২৩, ১১:১০ পিএম

বাংলা ভাষা ও সাহিত্য গবেষণার অনেক শাখার পথিকৃৎ ডক্টর মুহম্মদ শহীদুল্লাহ। বিভিন্ন ভাষা ও বিষয় সম্পর্কে সুগভীর পান্ডিত্যের কারণে বিদ্বজ্জনের কাছে তিনি ‘চলন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। আমরা হয়তো অনেকেই জানি না কিংবদন্তি এই মানুষটি ছিলেন ভাষা আন্দোলনের অন্যতম অগ্রগণ্য তাত্ত্বিক যারা লেখায়, বক্তৃতায় তুলে ধরেছিলেন রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার যথার্থতা।

মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ ১৮৮৫ সালের ১০ জুলাই পশ্চিমবঙ্গের চব্বিশ পরগনা জেলার পেয়ারা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাড়িতেই তিনি উর্দু, ফারসি ও আরবি শেখেন আর স্কুলে সুযোগ পান সংস্কৃত পড়ার। ১৯১০ সালে কলকাতা সিটি কলেজ থেকে সংস্কৃতে অনার্সসহ বি.এ. পাস করে তিনি চেয়েছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্কৃত নিয়ে এম.এ. করতে। কিন্তু ওই বিভাগের এক অধ্যাপকের আপত্তিতে তা সম্ভব হয়নি। শেষে দিল্লি হাইকোর্টের নির্দেশে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভাষাতত্ত্ব নামে একটি বিভাগ  চালু হয় এবং মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্ তুলনামূলক ভাষাতত্ত্বে এম.এ. পাস করেন।

এফ.এ. পাস করার পরেই তিনি বিভিন্ন ভাষা শিখতে শুরু করেন। তিনি প্রায় ৩০টি ভাষায় অনর্গল কথা বলতে পারতেন এবং ১৮টি ভাষা সম্পর্কে সুগভীর জ্ঞান রাখতেন। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে তিনি সংস্কৃত ও বাংলা বিভাগের প্রভাষক পদে যোগদান করেন। শিক্ষক থাকাকালে তিনি বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে মৌলিক গবেষণা করে ১৯২৫ সালে প্রমাণ করেন যে, গৌড়ী বা মাগধী প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষার উৎপত্তি হয়েছে। ১৯২৬ সালে শহীদুল্লাহ্ উচ্চশিক্ষা গ্রহণের জন্য ইউরোপ যান। ১৯২৮ সালে তিনি বাংলা ভাষার প্রাচীন নিদর্শন চর্যাপদাবলি বিষয়ে গবেষণা করে প্যারিসের সোরবোন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভারতীয় মুসলমানদের মধ্যে প্রথম ডক্টরেট ডিগ্রি লাভ করেন।

বহুভাষাবিদ এই পন্ডিতের মাতৃভাষার প্রতি ছিল প্রবাদপ্রতিম ভালোবাসা। তিনি বলতেন, মা, মাতৃভাষা, মাতৃভূমি প্রত্যেক মানুষের পরম শ্রদ্ধার বস্তু। ১৯২১ সাল থেকেই তিনি বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করতে অক্লান্ত চেষ্টা করেছেন। ১৯৪৭ সালে দেশবিভাগের আগেই তিনি পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা প্রশ্নে বাংলার দাবি তুলে ধরেন। বাংলা ভাষার পক্ষে লেখা, সভা-সমিতিতে ভাষণ, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ সবকয়টিতেই তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন।

উর্দুভাষী বুদ্ধিজীবীরা যখন বললেন, উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা, তখন মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ যুক্তি উপস্থাপন করে বলেন, কেবলমাত্র বাংলাই পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হতে পারে। ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ্ তার ‘দ্য ল্যাঙ্গুয়েজ প্রবলেম অফ পাকিস্তান’ নামের নিবন্ধে বলেন, পাকিস্তান রাষ্ট্রের বাংলাভাষী অংশে, যদি বাংলা ছাড়া অন্য কোনো ভাষা রাষ্ট্রভাষা হয়, তাহলে সেই স্বাধীনতা হবে পরাধীনতারই নামান্তর। তার এই নিবন্ধটি বাংলার মানুষের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে। একপর্যায়ে তা ভাষা আন্দোলনে রূপ নেয়।

তিনি ছিলেন বাংলা একাডেমির স্বপ্নদ্রষ্টা। চর্যাপদ বিষয়ক গবেষণা, বাংলা ভাষার উৎপত্তি সম্পর্কে তার মতবাদ, বাংলাভাষার জন্মসাল বিষয়ে তার বক্তব্য, বাংলা বর্ষপঞ্জির সংস্কার, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস লেখা, বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান প্রণয়ন সবই তার উল্লেখযোগ্য কীর্তি। তিনি ছিলেন ধর্মে নিষ্ঠাবান এবং অসাম্প্রদায়িক। ধর্মের নামে বাঙালিকে দ্বিধাবিভক্তির চক্রান্ত নস্যাৎ করতে তিনি বলেছিলেন, ‘আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য তার চেয়ে বেশি সত্য আমরা বাঙালি।’ তার দেশপ্রেম, সাধনা ও অসাম্প্রদায়িক মনোভাব পরের প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত