সমাবর্তনের নামে বাণিজ্য

আপডেট : ১৫ জানুয়ারি ২০২৩, ০১:৫৫ এএম

সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে দেশে এখন বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা দেড়শর ওপর। এগুলোর বেশিরভাগেই প্রতি বছর বা এক বছর পরপর সমাবর্তন অনুষ্ঠিত হয়। একজন শিক্ষার্থীর পড়ালেখা শেষ হলেও এ সমাবর্তনে অংশ নিতে বড় অঙ্কের ফি দিতে হয়। এভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমাবর্তনের নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে কোটি টাকা ফি আদায় করে। কিন্তু অনেক বিশ্ববিদ্যালয় আদায় করা টাকার অর্ধেকও খরচ করে না বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বছরের পর বছর ধরে সমাবর্তন নামে বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সমাবর্তন ফি আদায়ের ক্ষেত্রে এগিয়ে আছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে ৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি আদায় করে তারা। আর একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতি সমাবর্তনে কমপক্ষে ১ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৫ হাজার শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি দিয়ে থাকে। ফলে প্রতি সমাবর্তনে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের আদায় হয় ১ কোটি থেকে ৪ কোটি টাকা পর্যন্ত।

জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সমাবর্তনে কত টাকা ফি নেওয়া যাবে, সে ব্যাপারে কোনো বিধান নেই। তবে কোনোভাবেই বেশি ফি নেওয়া উচিত নয়। একটি সমাবর্তনে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়েরও কন্ট্রিবিউট করা উচিত। কারণ শিক্ষার্থীদের ফি দিয়েই বিশ্ববিদ্যালয় পরিচালিত হয়। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মনে রাখা উচিত, যারা গ্র্যাজুয়েট বেকার, তারাই সমাবর্তনে অংশ নেবেন। কোনোভাবেই সমাবর্তন থেকে লাভ করার প্রবণতা থাকা উচিত নয়। প্রয়োজনে বেশি টাকায় এক্সপেনসিভ হল ভাড়া না নিয়ে ক্যাম্পাসেই এ সমাবর্তনের আয়োজন করা উচিত।’

জানা যায়, সমাবর্তনে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ই একজন শিক্ষার্থীকে যে গাউন দেয়, তা পরে ফেরত দিতে হয়। তবে ক্যাপটি দিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কিছু গিফট দেয়। এর মধ্যে রয়েছে ব্যাগ, কলম, মগ, ডায়েরি, মানিব্যাগ, ঘড়ি বা অন্যকিছু। এ ছাড়া বিশশ্ববিদ্যালয়গুলো সমাবর্তন উপলক্ষে একটা স্যুভেনির বের করা হয়। সমাবর্তন আয়োজনে হল ভাড়া ও খাবারের পেছনেও ব্যয় হয়।

সূত্র জানায়, গড়ে একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় একজন শিক্ষার্থীর কাছ থেকে ছয় হাজার টাকা সমাবর্তন ফি আদায় করে। আর প্রতি বছর দেড় হাজার বেশি শিক্ষার্থীকে ডিগ্রি দিলে সমাবর্তনে আয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় এক কোটি টাকা। বড় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আয় আরও বেশি। তবে বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয়ই ৮০০ টাকা করে গাউন ভাড়া নেয়, এর বাইরে গিফট ও স্যুভেনির এর পেছনে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় ধরা হয়। আর শিক্ষার্থীপ্রতি খাবারের দাম থাকে ৬০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত। এ ছাড়া হলরুম ভাড়া, প্রচার ও সাজসজ্জার কাজে আরও টাকা ব্যয় হয়। যা শিক্ষার্থীপ্রতি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা পর্যন্ত হয়ে থাকে। তবে যারা ক্যাম্পাসে আয়োজন করে তাদের হল ভাড়ার প্রয়োজন হয় না। ফলে সব মিলিয়ে একজন শিক্ষার্থীর প্রতি গড়ে আড়াই হাজার টাকা খরচ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো। তবে সমাবর্তন থেকে বাকি টাকা উদ্বৃত্ত থাকলেও তা বেশিরভাগ বিশ্ববিদ্যালয় ফান্ডে জমা না করে নানাভাবে ব্যয় দেখিয়ে দেয়। তবে বড় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যেহেতু অনেক বেশি ফি নেয় তাই খাবার ও গিফটের পেছনে তারা আরও বেশি ব্যয় করে।

এমনকি করোনাকালে কিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে সমাবর্তনের আয়োজন করেছে। এরপরও সমাবর্তন ফি থেকে মাফ পাননি শিক্ষার্থীরা।

জানা যায়, দেশের বড় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমাবর্তন বাবদ শিক্ষার্থীপ্রতি সর্বোচ্চ ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত নিয়ে থাকে। সেগুলোর মধ্যে নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ অন্যতম। এর পরের স্তরে ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নিয়ে থাকে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, আহ্ছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি। তবে ৬ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নিয়ে থাকে সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, গ্রিন ইউনিভার্সিটি, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ইত্যাদি।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সাধারণত সমাবর্তনের নামে বিশ^বিদ্যালয়গুলোকে ব্র্যান্ডিং করে থাকে। এ জন্য তারা বড় কোনো কনভেনশন সেন্টার ভাড়া নেয়, ব্যানার-ফেস্টুন লাগায়। অথচ এ বাবদ টাকা আদায় করা হয় শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। অথচ তারা আগে থেকেই উচ্চহারে টিউশন ফি দিয়ে আসছে। যদি নিজস্ব ক্যাম্পাসে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো সমাবর্তন করত, তাহলে আরও অনেক কম টাকা খরচ হতো।

সমাবর্তনের ফি আদায়ে পিছিয়ে নেই সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও। মাত্র ৪ হাজার টাকা জোগাড় করতে না পেরে সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৩তম সমাবর্তনে ফি দিতে না পারায় অংশ নিতে পারেননি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ওসমান গনি। যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার ঝড় তুলেছিল। শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নয়, বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বর্তমানে সমাবর্তন অনুষ্ঠান আয়োজনের নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে চড়া মূল্যের নিবন্ধন আদায় করে আসছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীরা নামমাত্র ফি দিয়ে পড়ালেখা করছে। তাদের মাসিক বেতন ২০ থেকে ৫০ টাকা। ফলে চার বছরের স্নাতক কোর্সে একজন শিক্ষার্থীর যে টাকা টিউশন ফি দিতে হয়, দেখা যায় এর চেয়ে বেশি তাকে সমাবর্তন ফি দিতে হচ্ছে। রাষ্ট্র যদি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নামমাত্র ফি নিয়ে বছরে লাখ টাকার বেশি ব্যয় করতে পারে, তাহলে সমাবর্তনের আয়োজনও রাষ্ট্রেরই করা উচিত। তাহলে সমাবর্তনের নামে বাণিজ্য বন্ধ হয়ে যাবে।

বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবর্তন ফি

১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নিয়ে থাকে নর্থ সাউথ, ব্র্যাক, ইন্ডিপেনডেন্ট ও আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি

৮ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নিয়ে থাকে ইস্ট ওয়েস্ট, এশিয়া প্যাসিফিক, ড্যাফোডিল, আহ্ছানউল্লাহ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ইত্যাদি

৬ হাজার টাকা পর্যন্ত ফি নিয়ে থাকে সাউথইস্ট, ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, গ্রিন ইউনিভার্সিটি, ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ইত্যাদি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত