বিরতিহীন মৃত্যুযাত্রা

আপডেট : ১৮ জানুয়ারি ২০২৩, ১১:৫৯ পিএম

সারা দেশে প্রতিদিনই সড়ক-মহাসড়কে দুর্ঘটনায় প্রাণ ও অঙ্গহানির তথ্য উদ্বেগজনক। কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না সড়ক দুর্ঘটনা। রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে ৬ হাজার ৮২৯ দুর্ঘটনায় ৭ হাজার ৭১৩ জন নিহত হয়েছেন। এ হিসাবে গত বছর দৈনিক গড়ে ২১.১৩ জন নিহত হয়েছেন সড়ক দুর্ঘটনায়। সড়ক দুর্ঘটনার পর অনেকেরই রাগ ক্ষোভ গিয়ে পড়ে পরিবহন শ্রমিকদের ওপর। কিন্তু বিদ্যমান বাস্তবতায় গণপরিবহনের বিশৃঙ্খলা ও নানা সংকটের পেছনে আসলে শ্রমিকদের দায় কতটা সে বিবেচনা যেমন জরুরি, তেমনি পরিবহন শ্রমিকরা কতটা মানবেতর জীবনযাপন করেন এবং কতভাবে অধিকার বঞ্চিত হন সেই আলোচনাও জরুরি। সড়ক দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ চালক ও পরিবহন শ্রমিকদের অনির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও অসুস্থতা হলেও বিষয়টি বরাবর উপেক্ষিত। দুর্ঘটনায় কোটি কোটি টাকার গাড়িও নষ্ট হচ্ছে। তারপরও পরিবহন মালিকদের এই বিষয়ে কোনো উদ্যোগ নেই। চালকদের স্বাস্থ্যগত বিষয়ে খোঁজ রাখেন না তারা। শ্রমিক নেতারা দায় চাপান সরকার ও গাড়ির মালিকদের ওপর।

বুধবার দেশ রূপান্তরে ‘চালকের ঘুমে ছয়জন চিরঘুমে’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শরীয়তপুরের জাজিরায় একটি ট্রাকের সঙ্গে অ্যাম্বুলেন্সের সংঘর্ষে ছয়জন নিহত হয়েছেন। পুলিশ বলছে, পদ্মা সেতুর টোল প্লাজার কাছে গতিনিরোধক পার হতে গিয়ে নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে অ্যাম্বুলেন্সটি ট্রাকের পেছনে ধাক্কা দেয়। এ ঘটনায় নিহত অ্যাম্বুলেন্স চালকের ছোট ভাইয়ের বরাত দিয়ে পুলিশ পরিদর্শক আবু নাঈম জানিয়েছেন, ‘অ্যাম্বুলেন্স চালক রবিউল গত রবিবার রাত ২টার দিকে ঢাকা থেকে রোগী নিয়ে ভোলা যান। কোনো বিরতি না দিয়ে সোমবার রাতেই ঢাকার উদ্দেশে রওনা দেন এবং মঙ্গলবার ভোর ৪টা ২০ মিনিটে এ দুর্ঘটনা ঘটে।’ হিসাব করলে দেখা যায়, ২৬ ঘণ্টারও বেশি সময় তিনি কোনো বিরতি না দিয়ে অ্যাম্বুলেন্স চালিয়েছিলেন। অবস্থাদৃষ্টে বোঝাই যাচ্ছে যে বিরতিহীনভাবে দীর্ঘ সময় অ্যাম্বুলেন্স চালানোর কারণে নির্ঘুম চালক দুর্ঘটনাকবলিত হয়ে যাত্রীসমেত চিরঘুমে চলে গিয়েছেন। কবির মতো আক্ষেপ করে বলা যেতে পারে ‘কোনোদিন জাগিবে না আর।’ দুর্ঘটনায় ৬ জনের প্রাণহানি যেমন মানা যায় না, তেমনি একজন মানুষ টানা ২৬ ঘণ্টা ঘুমহীন অ্যাম্বুলেন্স চালিয়ে যাচ্ছেন এ ঘটনাটিও আমাদের পরিবহন ব্যবসার ভয়াবহ ত্রুটি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

এর আগে, গত বছর বিআরটিএ ও ঢাকা আহছানিয়া মিশনের উদ্যোগে চালানো সমীক্ষায় জানা যায়, দেশের পরিবহন-চালকদের ৩৯.৩৩ ভাগই রক্তে মাত্রাতিরিক্ত সুগার ও উচ্চ রক্তচাপের সমস্যায় ভুগছেন। চিকিৎসকরা বলেছেন, ‘কারও রক্তে সুগার মাত্রাতিরিক্ত কমে গেলে সেই ব্যক্তি হঠাৎ জ্ঞান হারিয়ে ফেলতে পারেন। রক্তচাপের সমস্যা থাকলে মাথা ঘুরতে পারে ও দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়। রক্তচাপ খুব বেশি হলে মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ পর্যন্ত হতে পারে।’ আশঙ্কার কথা হচ্ছে, শারীরিক জটিলতার কথা এসব চালক পরীক্ষার আগে জানতেনই না। তারা না জেনেই গাড়ি চালাচ্ছেন। চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের শরীরে জটিলতা দেখা দিলে বিশেষ করে ঘাড়-মাথাব্যথা করলে তাদের ঘুম ভালো হয় না। গাড়ি চালানো অবস্থায় তাদের অনেকের ঝিম ধরে। অনেক চালক গাড়ি চালানো অবস্থায় ক্লান্ত হয়ে দুর্ঘটনায়ও পড়েছেন।

বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব বলেছিলেন, ‘চালকদের শরীর গাড়ি চালানোর উপযোগী আছে কিনা তা দেখার কোনো সিস্টেম নেই। বিষয়টি দেখে বিআরটিএ ও শ্রমিক ফেডারেশন।’ অন্যদিকে সড়ক দুর্ঘটনায় চালকদের দায়ী করা হলেও তাতে মাদকাসক্তিকেই কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। বিআরটিএও চালকদের লাইসেন্স দেওয়ার সময় ডোপটেস্ট নিয়েই দায় সারে। জাতীয় সড়ক পরিবহন মোটর শ্রমিক ফেডারেশনের প্রেসিডেন্ট জানিয়েছেন, ‘শ্রমিকদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থা সরকার বা গাড়ির মালিকরা কখনো করেনি।’ অন্যদিকে, বাসচালক-শ্রমিকদের প্রায় কারোই নির্দিষ্ট বেতনভাতা নেই, নেই নিয়োগপত্র কিংবা চাকরির অন্য কোনো সুযোগ-সুবিধা। বেতন না থাকায় মালিকের বেঁধে দেওয়া আয়ের লক্ষ্য পূরণে দৈনিক প্রায় ১৮-২০ ঘণ্টার বিশ্রামহীন কাজের চাপ, শরীর চাঙ্গা রাখতে মাদকে জড়ানো, নিম্ন মজুরি, কাজের অনিশ্চয়তা, মালিক-যাত্রী-প্রশাসনের লাঞ্ছনা, অর্থকষ্ট, অনিশ্চিত জীবন, শেষ জীবনে দুর্গতি, পারিবারিক অশান্তিসহ এক টালমাটাল জীবন পার করে থাকে দেশের কয়েক লাখ পরিবহন শ্রমিক। পরিবহন খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করেন সড়কের নৈরাজ্য আর বিশৃঙ্খলার নেপথ্যে পরিবহন শ্রমিকদের এই মানবেতর অনিশ্চিত জীবনের বড় ধরনের প্রভাব রয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত