উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাব শিক্ষার্থীদের আমানতেও

আপডেট : ১৯ জানুয়ারি ২০২৩, ১২:৩৬ এএম

রাজধানীর একটি বেসরকারি স্কুলের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আমিনুল ইসলাম। বাবা-মায়ের সঙ্গে মিরপুর-১০ এলাকায় বসবাস তার। ইন্টারনেটে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের আর্টিকেল পড়ে ব্যাংকিংয়ে আগ্রহ জাগে এই কিশোরের। সেই আগ্রহ থেকেই একটি বেসরকারি ব্যাংকের স্কুল ব্যাংকিং শাখায় হিসাব খোলেন তিনি। বাবা একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে স্বল্প বেতনে চাকরি করেন। আর মা গৃহিণী। টিফিনের অর্থ ও স্বজনদের দেওয়া সালামি থেকে ওই ব্যাংক হিসাবে তিনি প্রায় ৪০ হাজার টাকা জমিয়েছেন। কিন্তু উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে টিফিনের অর্থ কমিয়ে দিয়েছে পরিবার। এতে নতুন করে টাকা জমাতে পারেননি তিনি। উল্টো সংসারের খরচ চালাতে হিমশিম খাওয়া বাবাকে গেল বছরের সেপ্টেম্বরে তিনি ব্যাংকে জমানো টাকাও তুলে দিয়েছেন। এতে সমস্যা থেকে সাময়িকভাবে মুক্তি পেয়েছেন তার বাবা রফিকুল ইসলাম।

এ বিষয়ে রফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমি একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি। দ্রব্যমূল্য কিছুটা স্বাভাবিক থাকা অবস্থায় এই টাকা দিয়েই সংসার ভালোভাবে চলত। কিন্তু গেল ৭-৮ মাস থেকে দ্রব্যমূল্যের দাম অনেক হারে বেড়েছে। কিন্তু আমার বেতন বাড়েনি। এতে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। চিন্তা করছি নতুন বছর সন্তানদের গ্রামে ভর্তি করিয়ে পরিবার বাড়িতে পাঠিয়ে দেব। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে হিসাবেও বিষয়টি উঠে এসেছে। গেল নভেম্বরে স্কুল ব্যাংকিংয়ের হিসাবে আমানত কমেছে ৩৪ কোটি টাকারও বেশি। তবে পাঠ্যবইয়ে স্কুল ব্যাংকিং নিয়ে পাঠ যুক্ত হওয়ায় ব্যাংক হিসাব খোলার প্রবণতা বেড়েছে।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির প্রভাবে শুধু রফিকুলই এমন পরিস্থিতিতে পড়েছেন এমন নয়। এই তালিকায় আছেন বেসরকারি চাকরিজীবী শাখাওয়াত হোসাইন, আসাদুল ইসলাম ও তারিকুলরাও। এদের প্রত্যেকেই উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে আয় বাড়াতে নানান পদক্ষেপ নিয়েছেন। বিষয়টি নিয়ে কথা হয় তারিকুল ইসলামের সংঙ্গে। তিনি বলেন, আমি একটি প্রতিষ্ঠানে ভয়েস আর্টিস্ট হিসেবে কাজ করি। পরিবার নিয়ে ঢাকায় থাকা কষ্টকার হচ্ছে তাই অনলাইনে আয় বাড়াতে রাতে ফ্রিল্যান্সিংয়ে সময় দিচ্ছি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, সদ্য বিদায়ী ২০২২ সালের নভেম্বর মাস শেষে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাবের মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ২৪৪ কোটি টাকা। এর আগের মাসের তুলনায় আমানত কমেছে ৩৪ কোটি টাকা। অক্টোবর মাসে শিক্ষার্থীদের হিসাবে ২ হাজার ২৭৮ কোটি টাকার আমানত ছিল। আলোচিত মাসে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব খোলার প্রবণতা আগের চেয়ে বেড়েছে। মাসটিতে মোট হিসাবের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩১ লাখ ৯৩ হাজার ১৭১টি। এর আগের মাসে এর পরিমাণ ছিল ৩১ লাখ ৮১ হাজার ৯৭১টি। অর্থাৎ এক মাসের ব্যবধানে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব বেড়েছে ৯ হাজার ২০০টি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গেল বছর আমরা দেশের ৬২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরীক্ষামূলক স্কুল ব্যাংকিংয়ের পাঠ যুক্ত করেছিলাম। যে কারণে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাংকিংয়ের বিষয়ে আগ্রহ বেড়েছে। চলতি বছর ষষ্ঠ শ্রেণির জীবন ও জীবিকা বইয়ে ‘আর্থিক ভাবনা’ নামে স্কুল ব্যাংকিংয়ের অধ্যায় যুক্ত করা হয়েছে। এতে শিক্ষার্থীদের মধ্যে আগ্রহ আরও বাড়বে। তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে আমানত সাময়িক কমলেও দ্রুতই আমানত বাড়বে বলেও মনে করেন তিনি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নভেম্বর শেষে মোট স্কুল ব্যাংকিং হিসাবের সংখ্যা ৩১ লাখ ৯৩ হাজার ১৭১টি। এর মধ্যে ১৫ লাখ ৯২ হাজার ২৩৫টি হিসাব শহরাঞ্চলে এবং ১৬ লাখ ৯৩৬টি হিসাব গ্রামাঞ্চলে খোলা হয়েছে।

চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে ব্যাংকে শিক্ষার্থীদের হিসাব ছিল ৩১ লাখ ৮৯ হাজার ৬০৬টি। আগস্টে এ ধরনের হিসাব খোলা হয় ৩১ লাখ ৮২ হাজার ৬৬১টি। এরপরে সেপ্টেম্বরে এসে স্কুল ব্যাংকিংয়ের হিসাবের পরিমাণ আরও কমে দাঁড়ায় ৩১ লাখ ৮১ হাজার ৮৬০টি। পরের মাস অক্টোবরে হিসাবের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩১ লাখ ৮৩ হাজার ৯৭১টি। এর আগে ২০২১ সালের ডিসেম্বর শেষে স্কুল ব্যাংকিংয়ে ২৮ লাখ ২৫ হাজার ৯৯২ শিক্ষার্থীর হিসাব খোলা হয়েছিল। এ সময় আমানতের পরিমাণ ছিল ২ হাজার ২১৬ কোটি টাকা।

শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে উৎসাহী করতে ২০১০ সালে স্কুল ব্যাংকিং কর্মসূচির পুনঃপ্রবর্তন করে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে বেশ সফলতা পায় আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। তবে করোনা ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে শিক্ষার্থীদের ব্যাংক হিসাব ও আমানতের পরিমাণ কিছুটা কমে আসছে। এরপর থেকেই স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের সঞ্চয়ে উদ্বুদ্ধ করতে দেশের বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো আকর্ষণীয় মুনাফার নানা স্কিম চালু করে। ২০১০ সালে স্কুল ব্যাংকিং কার্যক্রম শুরু হলেও শিক্ষার্থীরা টাকা জমা রাখার সুযোগ পায় ২০১১ সাল থেকে। প্রথম বছরে ২৯ হাজার ৮০টি স্কুল ব্যাংকিং হিসাব খোলা হয়। এর পরের বছর ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত স্কুল ব্যাংকিংয়ের আওতায় ব্যাংকগুলোতে ১ লাখ ৩২ হাজার ৫৩৭টি হিসাব খোলা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত