সরকারবিরোধিতা আর রাষ্ট্রবিরোধিতা এক কথা নয়। প্রথমটা আইনে সিদ্ধ, আর দ্বিতীয়টা নিষিদ্ধ। কিন্তু আমরা এখন এমন একটা সময়ে বাস করছি যখন রাষ্ট্রগুলো, আরও নির্দিষ্ট করে বললে রাষ্ট্রগুলোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী এই দুটোকে এক করে ফেলেছে অথবা এক করে দেখাচ্ছে। কিন্তু এই ভাবনা গণতন্ত্রের জন্য হুমকিস্বরূপ। গণতন্ত্রের অন্যতম শর্তই হলো ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারা। সেই হিসেবে, ভিন্নমত প্রকাশের অধিকার সংরক্ষণ করাই হলো গণতান্ত্রিক দেশের সরকারগুলোর অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু এখনকার গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সরকার তাদের দায়িত্ব পালনে আগ্রহী তো নয়ই বরং ভিন্নমত দমনে তারা নিত্যনতুন পদ্ধতি আবিষ্কার করছে। বলাই বাহুল্য এসবের অধিকাংশই নির্যাতনমূলক। প্রকৃতপক্ষে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার বাইরে গণতন্ত্রের অস্তিত্ব নেই। ফলে, আজকের দুনিয়ায় যেসব দেশ গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে পরিচিত, তার মধ্যে অনেকগুলোই স্বৈরতান্ত্রিক।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রর জন্মই হয়েছিল তৎকালীন পাকিস্তানি শাসকরা আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নিতে চেয়েছিল বলে। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাস হলো, এখন বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করতে হচ্ছে। এই রাষ্ট্রের এই নিয়তি হওয়ার কথা ছিল না। বাংলাদেশে রাজনৈতিক দলের সংখ্যা অনেক। এটা গণতন্ত্রের জন্য একটা উল্লেখযোগ্য সূচক। কিন্তু এ দলগুলো সবসময় স্বাধীনভাবে তাদের কর্মসূচি পালন করতে পারছে কি না সেটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের জন্মের পর নানা সময়ে সামরিক শাসন এসে গণতন্ত্রকে ব্যাহত করেছে। তবে, গণআন্দোলনের মুখে হটতে হয়েছে তাদের। বিভিন্ন পরিস্থিতিতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় এদেশের গণমানুষ এগিয়ে এসেছে, তারা রাস্তায় নেমেছে, এমনকি প্রাণ বিসর্জন দিতেও ভয় পায়নি। কোনো দেশের গণতন্ত্রের জন্য এটা খুব দরকারি ঘটনা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কি আমরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারছি। যে স্বাধীনতা সংবিধানসম্মত, যে স্বাধীনতা আমাদের অধিকার, সে স্বাধীনতার ওপর আমাদের রাষ্ট্রের দাঁড়িয়ে থাকার কথাতার কতটুকু ভোগ করছে বাংলাদেশের মানুষ?
২০২২ সালে মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) যে সূচক প্রকাশ করে তাতে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬২তম (স্কোর ৩৬ দশমিক ৬৩)। এর আগের বছর থেকে এটা ১০ ধাপ পেছানো। ২০২০ সালের পর থেকেই এ সূচক নিম্নমুখী। অর্থাৎ, মুক্তমত প্রকাশের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমশ তলানির দিকে যাচ্ছে। ২০২২ সালের সূচকে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে মিয়ানমার ছাড়া সবার নিচে বাংলাদেশের অবস্থান। তবে মিয়ানমার আর বাংলাদেশের পরিস্থিতি এক নয়। মনে রাখতে হবে মিয়ানমারে এখন সামরিক শাসন চলছে। তবু মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে তারা আমাদের কাছাকাছি অবস্থানে আছে। এমনকি মতপ্রকাশের স্বাধীনতার জন্য যে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধ করে স্বাধীন দেশ হিসেবে আমাদের জন্ম হয়েছেল সেই পাকিস্তানও বাংলাদেশের চেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। আরএসএফের সূচকে পাকিস্তানের অবস্থান ১৫৭তম।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিরোধী দলগুলোর ওপর সরকারের দমন-পীড়ন বেড়েছে। গণতান্ত্রিক দেশে সভা-সমাবেশ, মিটিং-মিছিল করার অধিকার সংবিধানসম্মত। কিন্তু বাস্তবে তার প্রয়োগ খুব একটা চোখে পড়ে না। ভিন্নমত মানেই দমন-পীড়ন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বাক স্বাধীনতার ক্ষেত্রে বড় রকম বাধা মনে করছে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে। এই আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হওয়ায় সরকারের পক্ষ থেকে সংস্কারের আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু তা সংশোধনের ব্যাপারে উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি এখনো চোখে পড়েনি। মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২২ সালে আটটি বিভাগের মধ্যে শুধু রাজশাহী, চট্টগ্রাম ও ঢাকা এই তিনটি বিভাগেই ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে মোট মামলা হয়েছে দুই হাজার ২৪৯টি। সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ সমাজের প্রগতিশীল মানুষদের নামে অহরহ মামলা দেওয়া হচ্ছে। পরিস্থিতি এমন চলতে থাকলে সাধারণ মানুষ ন্যায্য কথাটিও আর মুখ ফুটে বলতে চাইবে না।
লেখক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সর্বজনস্বীকৃত। নানা মতের মিথস্ক্রিয়া সমাজে ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে ভূমিকা রাখে। কিন্তু সম্প্রতি ‘সরকারবিরোধী’ বই প্রকাশ করার অভিযোগে অমর একুশে গ্রন্থমেলায় স্টল বরাদ্দ পাচ্ছে না দেশের অন্যতম উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা সংস্থা ‘আদর্শ’ প্রকাশনী। বাংলা একাডেমির প্রশাসন বিভাগের পরিচালক ড. এ কে এম মুজাহিদুল ইসলাম বলেছেন, ‘আদর্শ চার ইউনিটের স্টল পেয়ে আসছিল। এবার তারা প্যাভেলিয়নের আবেদন করেছিল। আমরাও ভেবেছিলাম তাদের প্যাভেলিয়ন দেব। তবে তখনই তাদের কিছু বই নিয়ে আপত্তি আসে। আমরাও দেখেছি তাদের প্রকাশিত বই আমাদের নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এ কারণে তাদের বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।’ তিনি আরও বলেছেন, ‘সরকারবিরোধী বিভিন্ন বক্তব্য আছে ওই বইয়ে।’ (দেশ রূপান্তর, ১৭ জানুয়ারি ২০২৩)। আমার প্রশ্ন হলো, সরকারবিরোধিতা কবে থেকে এই দেশে নিষিদ্ধ হলো? এ বিষয়ে তিনি কি কোনো আইনের রেফারেন্স দেখাতে পারবেন? যদি সেটা না হয়ে থাকে তাহলে ‘আদর্শ’কে স্টল বরাদ্দ না দেওয়ার কারণ কী? এর আগে ২০১৯ সালেও আদর্শ প্রকাশনীর ব্যাপারে অভিযোগ তোলা হয় কিন্তু সেই অভিযোগের সত্যতা না পাওয়ায় তাদের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়।
বই নিষিদ্ধের ঘটনা এই দেশে নতুন নয়। নানা সময়ে নানা বই নিষিদ্ধ করেছে বাংলাদেশের সরকার। যদিও এটা খুব ন্যক্কারজনক ঘটনা, তবু শাসকগোষ্ঠীর অপছন্দের আলামত থাকলেই বইয়ের ওপর নেমে এসেছে খড়গ। ভিন্নমত প্রকাশের কারণে বইমেলায় প্রাণঘাতী হামলার শিকার হয়েছিলেন অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদ। বই লেখার জন্য নির্বাসিত হয়ে আছেন বাংলাদেশের আরেক লেখিকাতসলিমা নাসরীন। এ দেশে তার অনেকগুলো বই নিষদ্ধ। বই এমন একটা বিষয় যেটা কেউ আপনাকে জোর করে পড়াবে না। সুতরাং একটা বই ভালো না লাগলে কেউ নাও পড়তে পারে। ফলে, নিষিদ্ধ করার চেয়ে যুক্তিযুক্ত হলো অন্য কোনো বই লিখে তার জবাব দেওয়া। কিন্তু নিষিদ্ধ করা হলে মানুষের সহজাত স্বভাবের কারণে মানুষ তা পড়ার প্রতি আগ্রহী হয় বেশি। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বব্যাপী নিষিদ্ধ বইয়ের সংখ্যাও কিন্তু কম নয়।
আদর্শ প্রকাশনী এখন পর্যন্ত এমন কোনো বই প্রকাশ করেনি যা নিষিদ্ধ হয়েছে। তাহলে এই প্রকাশনীর ওপর খড়গহস্ত হওয়ার কারণ কী? আদর্শ প্রকাশনীর প্রধান মাহাবুব রহমান দাবি করেন যে তিনটি বই নিয়ে বাংলা একাডেমির আপত্তি, সেগুলো হলোফাহাম আব্দুস সালামের ‘বাঙালির মিডিয়োক্রিটির সন্ধানে’, জিয়া হাসানের ‘উন্নয়ন বিভ্রম’ ও ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের ‘অপ্রতিরোধ্য উন্নয়নের অভাবনীয় কথামালা’। এই বইগুলোতে সরকারবিরোধী কথাবার্তা আছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মাহাবুব রহমান বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির নেতাদের বরাত দিয়ে জানান, এক প্রকাশক তিনটি বইয়ে সরকারবিরোধী লেখা প্রকাশ করা হয়েছে উল্লেখ করে বাংলা একাডেমিতে অভিযোগ জমা দিয়েছেন। এ তিনটি বইয়ের জন্য একাডেমি স্টল বরাদ্দের তালিকা থেকে নাম বাদ দিয়েছে। যে তিনজনের বই নিয়ে এসব অভিযোগ তারা প্রত্যেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কল্যাণে পরিচিত। সরকারের নানা কর্মকাণ্ডের সমালোচনা করে তারা নিয়মিত লেখালেখি করেন।
বুদ্ধিসম্পন্ন স্বাধীন মানুষ ভালো কাজের প্রশংসা আর খারাপ কাজের নিন্দা করবে, এটাই স্বাভাবিক। কোনো দেশের কোনো সরকারই সবার জন্য সবসময় ভালো কাজ করে না। এমনকি সরকারের আপাত ভালো কাজেও কারও কারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে, সরকারের কাজের সমালোচনা সবসময় থাকবে। বুদ্ধিজীবীদের কাজ সরকারের স্তুতি করা নয় বরং সরকারের ভুলগুলো ধরিয়ে দেওয়া এবং সম্ভব হলে এ থেকে উত্তরণের পথ বাতলে দেওয়া। সেই কাজটি করা হয় সরকারের ভালোর জন্যই। সরকারের কাজের সমালোচনা করে সরকারের ভুল ধরিয়ে দিলে জনগণ ও সরকার উভয়ই উপকৃত হয়। গণতান্ত্রিক সমাজে এই চর্চা সবসময়ই দরকারি। কিন্তু এখন সরকার তার সমালোচকদের প্রতিপক্ষ মনে করছে। সরকারের মধ্যে সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতার অভাব লক্ষ করা যাচ্ছে। এই অসহিষ্ণু মনোভাব একটা দেশের জন্য ক্ষতিকর। সরকার যখন সমালোচনাকে ভয় পায়, সমালোচকদের প্রতিপক্ষ মনে করে তখন সরকারের জনকল্যামূলক উদ্দেশ্য ব্যর্থ হতে বাধ্য। অন্যদিকে, সরকার যে বই নিষিদ্ধ করেনি, সেই বইতে সরকারের সমালোচনা আছে বলে (খেয়াল করার বিষয়, রাষ্ট্রবিরোধী নয়, সরকারবিরোধী) তার প্রকাশককে একুশে বইমেলায় বাংলা একাডেমি কর্তৃক নিষিদ্ধ করার ঘটনাটি মতপ্রকাশ ও শিল্প-সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে একটি ভয়ংকর ঘটনা হিসেবে চিহ্নিত হতে পারে। পরিহাসের বিষয় হলোবিষয়টি বাংলা একাডেমির মতো একটি প্রতিষ্ঠান মহান একুশের নাম জড়ানো এক আয়োজনের ক্ষেত্রে করার চেষ্টা করছে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আমাদের সংবিধান ও আইন দ্বারা সংরক্ষিত। বাংলা একাডেমির প্রশাসন বিভাগের পরিচালক ড. এ কে এম মুজাহিদুল ইসলাম তার বক্তব্যের এক জায়গায় বলেছেন, ‘আমরাও দেখেছি তাদের প্রকাশিত বই আমাদের নীতিমালার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।’ বাংলা একাডেমি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান, তিনি কি বলতে পারবেন, তাদের কোন সেই নীতিমালা যাতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা খর্ব করার কথা লেখা আছে? যদি সত্যিই থাকে, তা কি খোদ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়? আশা করি বাংলা একাডেমি তাদের এই হঠকারী সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করবে এবং আমরা এবারের অমর একুশে বইমেলায় ‘আদর্শ’ প্রকাশনীর স্টল থেকেই তাদের বই সংগ্রহ করতে পারব।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক
