এশিয়ান জিমন্যাস্টিকস ইউনিয়নের টেকনিক্যাল কমিটি (ওমেন) প্রেসিডেন্ট রাদিয়া কিজিলগুন কিছুদিন আগে এসেছিলেন বাংলাদেশে। দেশ রূপান্তর-এর সঙ্গে আলাপে রাদিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশ নিয়ে তার অভিজ্ঞতার কথা।
ঢাকায় কত দিনের অনুশীলন শিবির হলো, কেমন হয়েছে অনুশীলন?
এই সময়টায় অনুশীলনটা কেমন ছিল?
রাদিয়া: আমরা পাঁচ দিনের একটা ক্যাম্প করেছি। ক্যাম্প খুব ভালো ছিল। কোচদের মধ্যে শেখার আগ্রহ আছে, নিজেদের মধ্যে অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেছে সবাই। এ ছাড়া বন্ধুত্বপূর্ণ আবহ ছিল সবার মধ্যে।
এই সময়ে আপনি তো বেশ ক’জন উদীয়মান জিমন্যাস্টকে দেখলেন। ভবিষ্যতে এই ইভেন্টে ওদের ভালো করার সম্ভাবনা কতটুকু?
রাদিয়া: সত্যি বলতে, এখানে আসার আগে আমার বাংলাদেশের মেয়েদের নিয়ে অন্য রকম একটা ধারণা ছিল। কিন্তু ওদের মুখোমুখি হয়ে বুঝলাম ওদের লেভেলটা আমার প্রত্যাশার চেয়েও উপরে। ওদের টেকনিক ও বেসিক খুবই ভালো। শুধু মেয়ে নয়, যে পর্যায়ে ছেলেরা আছে সেটাও আমাকে মুগ্ধ করেছে। ওদের টেকনিক ও বেসিক এতটাই ভালো যে, সঠিক সমর্থন যদি আমরা দিতে পারি ওরা খুব ভালো করবে। আমার সত্যি ওদের সবাইকে ভালো লেগেছে।
এই সময়ে আপনি তো অবশ্যই বাংলাদেশ জিমন্যাস্ট ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন। জিমন্যাস্টদেরও দেখলেন। সবমিলিয়ে এশিয়ান বা কমনওয়েলথ পর্যায়ে পদক জিততে বাংলাদেশ কি সঠিক পথে আছে? পদক জয়ের অবস্থান থেকে বাংলাদেশ কতটুকু দূরে?
রাদিয়া: সত্যি বলতে, বাংলাদেশ একদম সঠিক পথে আছে। কারণ ওরা (ফেডারেশন) বিভিন্ন প্রতিযোগিতা আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে শুধু সক্রিয়ই রাখছে না খেলোয়াড়দের অবস্থান ধরে রাখা ও সমর্থন দিতে বিভিন্ন ক্যাম্পও আয়োজন করছে। এটা আমাদের প্রথম এশিয়ান জিমন্যাসটিকস ইউনিয়ন ওমেন আর্টিস্টিক জিমন্যাস্টিকস ক্যাম্প। এটা অবশ্যই শুধু বাংলাদেশ নয়, সেন্ট্রাল সাউথ এশিয়ান অঞ্চলের জন্য দারুণ একটা পদক্ষেপ। এখন আর শুধু ভারতেই এমন ক্যাম্প হচ্ছে না বাংলাদেশও এগিয়ে এসেছে। এই ক্যাম্পের প্রক্রিয়াটা দারুণ। শুধু খেলোয়াড় না এখানে স্টাফদেরও এই খেলাটার ব্যাপারে নতুন কিছু শেখানো হচ্ছে। আমরা কোচদের উন্নতিতে কাজ করেছি। ভবিষ্যতে বিচারকদের জন্যও কাজ করব খুব শিগগির।
বাংলাদেশের জিমন্যাস্ট কোচদের অবস্থাটা কেমন দেখলেন। তারা কি উদীয়মান জিমন্যাস্টদের বড় আসরে ভালো করার মতো প্রস্তুত করে দেওয়ার পর্যায়ে আছেন?
রাদিয়া: তারা ভালো, আমি অবশ্যই তাদের খারাপ বলব না। কিন্তু আপনি হয়তো জেনে থাকবেন যে, জিমন্যাস্টিকস একটু ব্যতিক্রমধর্মী খেলা। এটার টেকনিকগুলো খুব বিস্তৃত, সেদিক থেকে কোচরা হয়তো ওই পর্যায়ে প্রস্তুত না। সবাইকেই তো টেকনিক ও অন্যান্য দিকে অভিজ্ঞতাটা দরকার। সেদিক থেকে নিজেদের অবস্থানের উন্নতি করতে এবং বাংলাদেশ জিমন্যাস্টিকস দলের উন্নতির জন্য দেশি কোচদের বিদেশি কোচের সহযোগিতা দরকার আছে। বিশেষ করে নারী দলের জন্য। তাই বিভিন্ন দেশের কোচদের সঙ্গে কাজ করলে, অভিজ্ঞতা নিলে বাংলাদেশের কোচরাও ভালো হতে পারবে।
আপনি কি মনে করেন কোচদেরও বিদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানো যেতে পারে?
রাদিয়া: অবশ্যই, এটা একটা মেথড। প্রথমত, বিদেশি কোচদের দেশে আনা যেতে পারে। যেমন আমি এখন এখানে আছি এই ক্যাম্পের জন্য। নির্দিষ্ট দিন বা এমন ক্যাম্পের জন্য তারা এলে শুধু কোচদের প্রশিক্ষণই নয়, তারা খেলোয়াড়দেরও অনেক কিছু শেখাতে পারবে। এরপর যখন এই কোচ তার দেশে ফিরে যাবে, তখন দেশের কোচরা ইতিমধ্যে জিমন্যাস্টদের কোচিং করাতে প্রস্তুত হয়ে যাবে। তাই দুইভাবেই মানে কোচ আনা এবং কোচ বাইরে পাঠানো দুটোই যেকোনো দেশের জিমন্যাস্টিকসকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করবে।
আপনার এই সফরটার ব্যাপারে একটু বলুন। ঢাকায় থাকা বা জিমন্যাস্টদের সঙ্গে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতাটা কেমন ছিল?
রাদিয়া: আসলে সেন্ট্রাল সাউথ এশিয়ান চ্যাম্পিয়নশিপের হয়ে গত বছরও আমি ঢাকা এসেছিলাম। আমি কিছু দুশ্চিন্তা নিয়েই সেবার এসেছিলাম, কারণ প্রথম সফর ছিল। কিন্তু এখন আমি বলতে পারি সময়টা দারুণ কেটেছিল। ঠিক যেমন এবারও কাটল। সবকিছুই দারুণ ছিল। আমাদের একটা জিমন্যাস্টিকস পরিবার আছে। এই খেলাটার মতো পরিবারটা ছোট, কিন্তু নিজেদের মধ্যে তা অনেক বড়। এখানকার সবাই সেই পরিবারের অংশ। তারা যেভাবে আমাদের খোঁজখবর রেখেছে তা আমার প্রত্যাশার চেয়েও বেশি। আমি জিমন্যাস্টিকস ফেডারেশনের সবাইকে ধন্যবাদ দিতে চাই। শুধু আমাদের দেখভালের ব্যাপারেই নয়, তারা এই ক্যাম্পটা সঠিকভাবে শেষ হওয়ার দিকেও দারুণ নজর রেখেছে।
কোর্সটা শেষে জিমন্যাস্টদের জন্য কোনো পরীক্ষা বা সার্টিফিকেট আছে কি?
রাদিয়া: না, আসলে এটা তো ঠিক কোর্স নয়, বরং একটা অনুশীলন ক্যাম্প। তাই এখানে ক্যাম্প শেষে কোনো পরীক্ষা বা সার্টিফিকেটের ব্যবস্থা নেই।
তাহলে বলা যায়, এটা একটা প্রাথমিক পর্যায়ের ক্যাম্প?
রাদিয়া: হ্যাঁ, এটা সেরকমই। এটা জিমন্যাস্ট ও কোচদের জন্য শুরুর দিকের টেকনিক ও বেসিকগুলো শিক্ষা দিয়েছে। এই খেলাটায় বেসিক জিনিসটা খুব গুরুত্বপূর্ণ। এটা ছাড়া এই খেলায় ভালো করা সম্ভব নয়। তাই আমি এই দিকটার প্রতি নজর দিয়েছি এই ক্যাম্পে। এ ছাড়া আমরা কোচ ও জিমন্যাস্টদের জন্য অংশগ্রহণ সার্টিফিকেট দিয়েছি।
এখান থেকে তাহলে কোচরা পরের পর্যায়ে যেতে পারবেন?
রাদিয়া: অবশ্যই। কিন্তু জিমন্যাস্টে এক, দুই বা তিন এভাবে লেভেল ভাগ করা যাবে না। কারণ এই খেলাটায় একশ’র বেশি লেভেল আছে! তাই প্রতিটি ক্যাম্প, প্রতিটি কোর্স কোচদের, খেলোয়াড়দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ও নতুন কিছু শেখার জায়গা। যত বেশি এমন কিছুতে অংশগ্রহণ করবে, অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করবে, সেটাই খেলোয়াড় বা কোচদের জন্য এগিয়ে যাওয়াটা সহজ করে দেবে।
এশিয়ান জিমন্যাস্টিকস ইউনিয়ন এর এমন কোর্স বা ক্যাম্প তো তাহলে নিয়মিতই হওয়া উচিত?
রাদিয়া: হ্যাঁ, আমরা এমন ক্যাম্প প্রতি বছরই করি। বেশিরভাগ সময় ছোটদের জন্য, তবে বড়দের জন্যও করা হয় মাঝে মাঝে। আমরা এই ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টে বেশিরভাগ সময় উন্নয়নশীল দেশে আয়োজন করে থাকি, কারণ ওদের উন্নতিটা দরকার বেশি। এ বছর এই ক্যাম্পটা বাংলাদেশে হচ্ছে।
বাংলাদেশে আমরা আবার কবে এমন ক্যাম্প পেতে পারি?
রাদিয়া: অবশ্যই নিয়মিত হবে। আমরা মাত্র শুরু করলাম। এটাকে নিয়মিত রাখার চেষ্টা করব। শুধু ছোটদের নিয়েই নয়, আমরা বড়দের নিয়েও কাজ করার পরিকল্পনা রাখছি এখানে।
