রোববার, ২৩ জুন ২০২৪, ৯ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

মূলধারার ইতিহাসে শ্রেষ্ঠত্ব আরোপের বয়ানই চলছে

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৩, ১১:০০ পিএম

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপনা করছেন ড. আকসাদুল আলম। বাংলা অঞ্চলের ইতিহাসচর্চায় নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। বিগত ৫০ বছরে বাংলাদেশে ইতিহাস চর্চার রাজনীতি, ধারা, গতি-প্রকৃতি এবং স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে ইতিহাস পঠন-পাঠনের সংকট ও করণীয় নিয়ে একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে কথা বলেছেন দেশ রূপান্তরের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী

দেশ রূপান্তর : দেশে ইতিহাস চর্চার সার্বিক চিত্রটি কীরকম? একজন ইতিহাসবিদ হিসেবে এর সংকট ও করণীয় কী বলে আপনি মনে করেন?

ড. আকসাদুল আলম : বাংলাদেশে ইতিহাসচর্চা একটা বিশেষ ধারায় চলছে। গত ৫০ বছর ধরে ইতিহাসের যে চর্চা সেটাকে মোটামুটিভাবে বলা যেতে পারে একটা ন্যারেটিভ বেইজড ধারা। এই মেইনস্ট্রিম ইতিহাস চর্চার ধারা ৫০ বছরের আগেই শুরু হয়েছিল এবং এই চর্চায় খুব একটা বড় পরিবর্তন আসেনি। 

দেশ রূপান্তর : মানে সেটা কি পাকিস্তান পিরিয়ড নাকি তারও আগের?

ড. আকসাদুল আলম : সেটা যদি সময়ের বিবেচনায় বলি তাহলে ভালো হয়। মোটামুটিভাবে ধরা যেতে পারে বিগত ১০০ বছর। তো এই ১০০ বছরে ইতিহাসচর্চার ধারাটা প্রায় একই রকম। আমরা যদি বলি একটা কনভেনশনাল বা ট্র্যাডিশনাল ওয়ে অব স্ট্যাডিং হিস্ট্রি, সেটাই এখানে প্রধান হিসেবে বিদ্যমান রয়েছে। বলার মতো কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। ক্রিটিক্যাল এনালিসিস বা একটা ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ের দিকে, মানে হিস্ট্রিকে ক্রিটিক্যালি দেখার অনুপস্থিতি তীব্রভাবে অনুভূত হয় এখানে। বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে। মোটামুটিভাবে যারা এখানে ইতিহাস গবেষণা করছেন তারা মূলত একটা গৎ বাঁধা ন্যারেটিভ বেইজড ইতিহাস চর্চাই করছেন। তাত্ত্বিক কিংবা কনসেপচুয়াল জায়গা অথবা একটা ক্রিটিক্যাল থিংকিংয়ের জায়গাগুলো অথবা ইতিহাস তত্ত্বকে একটা বিশ্লেষণাত্মক সমালোচনামূলক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখার চেষ্টার অভাব এখানে রয়েছে। 

দেশ রূপান্তর : রাষ্ট্রের তো একটা ন্যারেটিভ বেইজড ইতিহাস থাকে বলে জানি। কিন্তু আমাদের এখানে তো সেই ন্যারেটিভ নিয়েই বিতর্ক হয়। এখানে ক্ষমতার বদল হলে গ্রহণ-বর্জনের মধ্য দিয়ে ইতিহাস চর্চার চেয়ে ইতিহাস নিয়ে রাজনীতিটাই মুখ্য হয়ে ওঠে। এভাবে কি কোনো ন্যারেটিভ দাঁড়ায়, যেটা সর্বজনীন?

ড. আকসাদুল আলম : প্রশ্নটা ইন্টারেস্টিং। দেখেন সারা পৃথিবীতেই ইতিহাস হচ্ছে রাজনীতির একটি উপকরণ। ইতিহাসকে ব্যবহার করা হয় সব ধরনের জ্ঞানের ভিত্তি হিসেবে, রাজনীতির খুঁটি হিসেবে। সুতরাং বাংলাদেশে যেটি হচ্ছে সেটি নতুন কিছু নয়। রাজনীতি তার নিজস্ব ধারায় অনেক কিছুকেই ব্যবহার করবে। এতে কেউ লাভবান হতে পারেন, কেউ বা ক্ষতিগ্রস্ত। কিন্তু ইতিহাসের একটা শাস্ত্রীয় প্রথা আছে, পদ্ধতি আছে। ইতিহাসের সেই প্রথা অনুযায়ী চর্চা দরকার। সেই চর্চা বাংলাদেশে কতটা হচ্ছে তা একটা প্রশ্ন। মানে ইতিহাসকে নৈর্ব্যক্তিক হতে হবে, এর স্থানিক এবং কালিক মানদন্ড নিশ্চিত করতে হবে। আপনি ভিন্ন ভিন্ন ভৌগলিক বাস্তবতায় কোন ইতিহাস কোন সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে পড়াচ্ছেন সেই বাস্তবতাকে সামনে রেখে ইতিহাসের বয়ান তৈরি হতে হবে। বিশেষভাবে দেখা যায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোতে জাতীয়তাবাদী ভাবধারা এখানকার ইতিহাসের বয়ানে, চর্চায় খুব তীব্রভাবে বিদ্যমান। এটাকে ভালো-খারাপ মূল্যায়ন করাটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো সর্বসাধারণের জন্য মানুষের সামষ্টিক অভিজ্ঞতার একটা ইতিহাসের শাস্ত্রসম্মত বয়ান তৈরি করা। কিন্তু সেই দিকে যাওয়ার বদলে দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক ইতিহাস পঠন-পাঠনের ইতিহাসের মূলধারাটি এখনো রাজা-বাদশাহ, রাজনীতি এবং কতিপয় অভিজাতের উচ্চাভিলাষ, জয়-পরাজয়কে মোটা দাগে রিপ্রেজেন্ট করছে। এর বিপরীতে যে প্রবণতা বা প্রয়াস যে একেবারেই নেই, তা কিন্তু নয়। সমাজ, সংস্কৃতি, অর্থনীতির ভিত গড়ে তোলার ক্ষেত্রে একটি নির্দিষ্ট ভূ-খন্ডের জনগোষ্ঠীর ধারাবাহিক অভিজ্ঞতার চিত্র বাস্তবতা তুলে আনার একটা প্রয়াস কোনো কোনো ইতিহাসবিদেও ব্যক্তিগত গবেষণাচর্চায় হয়তো আছে, তবে সেটা বর্তমান গতানুগতিক চর্চার ডামাডোলে এবং রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

দেশ রূপান্তর : মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের নানারকম বিরোধাত্মক তথ্য, ক্ষমতাসীন দলের সাপেক্ষে তথ্য সংযোজন-বিয়োজনের পরও আমরা মোটা দাগে একটা বয়ান জানি। এবং আমরা বুঝতে পারি কোন দল কেন কী তথ্য জানাচ্ছে বা বাদ দিচ্ছে। কিন্তু রাজনীতি মূলত যেটা নিয়ে হচ্ছে সেটা হলো প্রাচীন এবং মধ্যযুগের ইতিহাস নিয়ে। বাংলার ইতিহাসের এই রহস্য ও ধোঁয়াশাময় অধ্যায় নিয়ে দেশে চর্চার ধরণটা কেমন? আপনার মূল্যায়ন কি?

ড. আকসাদুল আলম : এমন একটি বিষয় উল্লেখ করলেন যে, আমাকে হতাশাজনক কথাই বলতে হবে। আপনি যথার্থই বলেছেন যে, বাংলাদেশের প্রাচীন এবং মধ্যযুগের ইতিহাসের বয়ান নিয়েই মূলত রাজনীতিটা হয়।

দেশ রূপান্তর : এখানে ওই কালক্রম ধরেই তো কে স্থানীয়, কে বহিরাগত, আর্য-অনার্য, মুসলমান-হিন্দু বিভেদমূলক বয়ান তৈরি ও তর্ক হয়। কাউকে বীর, কাউকে দখলদার বলা হয়।

ড. আকসাদুল আলম : ঠিক বলেছেন। ইতিহাসে এই যে ‘গৌরব’ আর ‘শ্রেষ্ঠত্ব’ আরোপ করা, সেই বয়ানই বাংলাদেশের মূলধারার ইতিহাস চর্চার মধ্যে প্রাধান্য বিস্তার করে আছে। বিশেষ করে পাঠ্যপুস্তকগুলোতে। বাংলাদেশের ৫০/৬০ বছরের পাঠ্যবইয়ের সিলেবাসে খুব একটা পরিবর্তন আনা হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে সিলেবাসও মোটাদাগে বলা যেতে পারে যে এটা ৬০/৭০ বছর ধরে প্রায় একই ধরনের। সুতরাং এই সিলেবাসগুলোর দিকে আপনি গভীরভাবে খেয়াল করলে দীর্ঘকাল ধরে পরিবর্তন না করার পেছনের রাজনীতি এবং এর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য সহজেই টের পাবেন। যে উদ্দেশ্য, আপনি যেভাবে ব্যাখ্যা করলেন- সেখানে রাজা-বাদশাহকে শ্রেষ্ঠত্ব দেওয়া, কোনো ধর্ম-বর্ণ-ভাষা-জাতিকে গৌরবান্বিত কিংবা খাটো করা, এই শ্রেষ্ঠত্ব, গৌরব, সেরার স্বীকৃতি তৈরির বয়ানই এখানে ইতিহাসচর্চার নামে চলে আসছে, যা দুঃখজনক।
এবং এর গোটা প্রক্রিয়াতেই প্রাচীন এবং মধ্যযুগের ইতিহাসকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যবহার করা হয়। দুঃখজনক হচ্ছে বাংলাদেশে প্রাচীন এবং মধ্যযুগের ইতিহাসচর্চায় আমরা ভীষণরকম পিছিয়ে আছি। বাংলাদেশ ৫০ বছর অতিক্রম করেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ১০০ বছর অতিক্রম করেছে। কিš‘ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ইতিহাস বিভাগ স্বাধীন বাংলাদেশের ৫০ বছরেও ২/১ জন প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস গবেষক তৈরি করতে পারেনি। অথচ ত্রিশ্‌ থেকে ষাটের দশক পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগ প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাসে দৃষ্টান্তমূলক গবেষণাকর্ম উপহার দিয়েছে। সেই ধারা বন্ধ হয়ে গেছে স্বাধীন বাংলাদেশে। কেনো এমন হলো তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

দেশ রূপান্তর : ঢাবিতে কি প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস এখন আর পড়ানো হয় না?

ড. আকসাদুল আলম : পড়ানো হয়। তবে পরিস্থিতি খুবই নাজুক। এক সময় প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাস পঠন-পাঠনের আলাদা আলাদা গ্রুপ ছিল। কিন্তু বিগত ৪০/৫০ বছর যাবত প্রাচীন ও মধ্যযুগের পৃথক দুটি গ্রুপ এক করে একটি গ্রুপ করা হয়েছে। প্রাচীন ইতিহাস গবেষণা, চর্চা ও পঠন-পাঠনের রয়েছে নিজস্ব প্রথা-পদ্ধতি। মধ্যযুগের প্রথা-পদ্ধতিও সম্পূর্ণ ভিন্ন। কিন্তু সম্পূর্ণ দুটি ভিন্ন গ্রুপ এক করে একটি গ্রুপ বানিয়ে পড়ানো হচ্ছে। শিক্ষার্থীদেরকে এই গ্রুপ পড়তে উৎসাহিতও করা হতো না। লিপিতত্ব, মুদ্রাতত্ব, ভাস্কর্যবিদ্যা, জাদুঘরবিদ্যাসহ প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাসের অসাম্প্রদায়িক গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো ইতিহাস বিভাগের সিলেবাস থেকে বাদ দিয়ে চালু করা হলো প্রাচীন বাংলার কিছু বিষয়াবলী এবং মধ্যযুগের বাংলার কিছু বিষয়াবলী। এর ফলে ঢাবিতে গত ৫০ বছরে প্রাচীন বা মধ্যযুগের ইতিহাসের কোনো সত্যিকারের গবেষক, যেমন প্রত্নতত্ত্ব, এপিগ্রাফি, আইকোনোগ্রাফি জানা কোনো গবেষক তৈরি হয়নি। আপনি সামান্য মনোযোগ দিলে এই পরিস্থিতির পেছনের উদ্দেশ্য ও রাজনীতি বুঝতে পারবেন। পাকিস্তান আমলের ভাবধারায় পরিচালিত ইতিহাস এভাবেই দীর্ঘকাল ধরে টিকিয়ে রাখা হয়েছে। বর্তমানেও প্রাচীণ ও মধ্য পর্বের গবেষণা হচ্ছে না বললেই চলে। আর এই ব্যর্থতার কারণে যেটি হয়েছে তা হলো একটি জাতিরাষ্ট্র গঠনের ইতিহাসের ভিত্তির জায়গা, শিকড়ের জায়গা নিয়ে ইচ্ছেমতো রাজনীতি করার এবং রাজনৈতিক ও ধর্মীয় জাতীয়তাবাদী ইতিহাস লেখার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর খেসারত দিতে হচ্ছে শিক্ষার্থী, সমাজ এবং দেশকে। প্রাচীন ও মধ্যযুগ নিয়ে এই ৫০ বছরে দুএকটি নোট বই ছাড়া তেমন কোনো কাজই হয়নি। সম্প্রতি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রাচীন ও মধ্যযুগের ইতিহাসের উপর যে চার খন্ড গ্রন্থ রচনা করা হয়েছে সেখানে বিষয়ের বৈচিত্র্য রয়েছে বটে কিন্তু ধর্মভিত্তিক, ভাষাভিত্তিক, রাজবংশভিত্তিক ইতিহাস, সেই পাকিস্তান আমলের প্রচলিত ধর্মভিত্তিক সেই পুরনো বস্তাপঁচা ন্যারেটিভ প্রাধান্য পেয়েছে।

দেশ রূপান্তর : আপনি জানেন স্কুল পর্যায়ে নতুন কারিকুলাম ও পাঠ্যবই এসেছে। সেখানে একপাক্ষিক ইতিহাস নির্মাণের অভিযোগ করছেন কেউ কেউ। আপনি কী মনে করেন?

ড. আকসাদুল আলম : স্কুলের নতুন পাঠ্যবই আমি দেখেছি। পুরো বই প্রণয়নের সঙ্গে থাকতে না পারলেও আমি এর কিছু কিছু পর্যায়ে জড়িতও ছিলাম। আপনি যদি ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান পাঠ্যবইয়ের অনুশীলনী খণ্ডে প্রকাশিত ইতিহাসের মাত্র দুটি চ্যাপ্টার একটু কষ্ট করে পড়েন তাহলে দেখতে পাবেন যে, অভিযোগগুলোর সত্যতা সেভাবে নেই। ছোটখাটো কিছু ভুলত্রুটি হয়তো পাওয়া যাবে। ইতিহাসের বয়ান, চিন্তা, ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে স্বাভাবিকভাবেই পার্থক্য হতে পারে। কিন্তু না পড়ে সম্পূর্ণ কন্টেক্সটাকে সামনে না নিয়ে একদম পছন্দ মতো দু-একটি লাইনকে সামনে এনে যেভাবে আলোচনা হচ্ছে- সেটা আমার কাছে ইতিহাসম্মত মনে হয়নি। বরং মনে হয়েছে রাজনীতি। একটা সামগ্রিক ব্যাখ্যা, বিশ্লেষণ, মূল্যায়ন হতেই পারে। সেই আলোচনা যারা করছেন, তথ্য-প্রমাণভিত্তিক ও যুক্তিপূর্ণ হলে সেটা গ্রহণযোগ্যও হতে পারে। নিশ্চয়ই এনসিটিবি সেরকম জায়গাগুলোকে চিহ্নিত করে যদি কোথাও তথ্যগত ভুল থাকে সেগুলো সংশোধন বা সংযোজন করবে।

দেশ রূপান্তর : আগের ইতিহাস বইয়ের সঙ্গে নতুন কারিকুলামের ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণির ইতিহাস ও সামাজিক বিজ্ঞান বই দুটিতে কী ধরনের পার্থক্য রয়েছে?

ড. আকসাদুল আলম : দেখেন আমি এই পাঠ্যপুস্তক যতটুকু দেখার ও পড়ার সুযোগ পেয়েছি, সেখান থেকে পরিষ্কার করে বলতে পারি যে, এতদিন স্কুলের ইতিহাস পাঠ্যসূচিতে বাংলাদেশের ইতিহাস সন-তারিখে ভারাক্রান্ত, নাম-যশ-খ্যাতি বিস্তারে ব্যতিব্যস্ত সুদূর ভূ-খণ্ড থেকে আগত ক্ষমতা ও অর্থলিপ্সু রাজা-বাদশাহদের কে কার বাবা, কে কার দাদা, কে কোথায় যুদ্ধ করলেন, কত সালে কোন যুদ্ধ হলো, সেনাপতির নাম, কোন বংশ কোথা থেকে এলো, কোথায় তারা বৈবাহিক সম্পর্ক স্থাপন করলেন ইত্যাদি এমন সব তথ্য দিয়ে বইগুলো লেখা ছিল যে আমাদের শিশুদের কাছে ইতিহাসকে আতঙ্কের জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এটা বিগত ৫০/৬০ বছর ধরে বাংলাদেশের পাঠ্যপুস্তকে চলেছে। এই প্রক্রিয়াটাকে এবারই সম্ভবত প্রথম যে একটু কিছুটা পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাওয়ার চিন্তা এনসিটিবি করেছে বলে আমার মনে হয়েছে। আমার ভূল হতে পারে। কিন্তু পাঠ্যক্রম এবার যেভাবে ঢেলে সাজানো হয়েছে সেই প্রক্রিয়াটা কিন্তু খুব গুরুত্বপূর্ণ। যে নতুন ধরণের শিখন, পঠন-পাঠন, পরীক্ষা পদ্ধতি চালু করা হয়েছে, যার একটা পরীক্ষামূলক সংস্করণ এখন চলছে বলে এনসিটিবি জানিয়েছে, তা নিয়ে অবশ্যই সামগ্রিক একটা আলোচনা হতে পারে। বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কী সমস্যা আছে, স্কুলগুলো তৈরি কিনা, শিক্ষকরা তৈরি কিনা; সেই জায়গাটাতে কিন্তু আমাদের আলোচনাটা হচ্ছে না।আমাদের আলোচনা যেটা হচ্ছে, আমি বলছি না যে সেটার গুরুত্ব নেই, ইতিহাসের যে কোনো আলোচনাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ইতিহাসের তথ্যগুলোর ব্যাখ্যা নানা ধরনের হতে পারে। পাশাপাশি, আমি মনে করি আমাদের গুরুত্ব দেওয়া দরকার নতুন পাঠ্যসূচি, নতুন পাঠ্যক্রম পদ্ধতিগুলো নিয়ে। ইতিহাস গবেষক এবং বিদ্যৎ সমাজের সকলেরই এটা নিয়ে কথা বললে ও পরামর্শ দিলে ভালো হয়। একইসঙ্গে পাঠবইয়ে আমাদের ইতিহাসের বয়ান এমন হওয়া প্রয়োজন যাতে করে শিক্ষার্থীরা বিশ^জনীন, উদার, অসাম্প্রদায়িক, মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে পারে।

দেশ রূপান্তর : এ ক্ষেত্রে নতুন বইয়ে কোন কোন বিষয়গুলো গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে, এবং কেন? বয়ানের পার্থক্যটা ঠিক কী রকম?

ড. আকসাদুল আলম : বাংলার ইতিহাস বলতে আমরা আসলে কার বিবরণকে বুঝব? আগ্রাসী শাসকদের রাজনীতি, ধর্ম ও ভাষার শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠার ইতিহাস নাকি স্থানীয় প্রাকৃতজনের জীবন-জীবিকা-নির্মাণ-ধ্বংস-দুঃখ-সুখ, একইসঙ্গে নানাবিধ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে টিকে থাকা এবং সমাজ-সংস্কৃতি (বি)নির্মাণের অভিজ্ঞতার বিবরণ? আবেগ, বর্ণ, ধর্ম ও জাতিগত পক্ষপাতের বাইরে এসে ভিন্ন ভিন্ন স্থানিক-ভৌগোলিক বাস্তবতায় প্রাকৃতিক এবং মনুষ্যসৃষ্ট প্রতিকূলতা জয় করে সাধারণ মানুষের টিকে থাকার সামষ্টিক ও সামগ্রিক অভিজ্ঞতার বয়াণ আমাদের ইতিহাস পঠন-পাঠনে এবং গ্রন্থে কবে স্থান পাবে? এবারের বইতে রাজা-বাদশা, উচ্চাকাঙ্ক্ষী সেনা নায়কদের বদলে সাধারণ মানুষকে ইতিহাসে সামনে আনা হয়েছে বলে আমার মনে হয়েছে।

সাক্ষাৎকারের বাকি অংশ আগামীকাল প্রকাশিত হবে।

   
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত