সোমবার, ১৭ জুন ২০২৪, ৩ আষাঢ় ১৪৩১
দেশ রূপান্তর

রাজনীতি ব্যবসায়

আপডেট : ২১ জানুয়ারি ২০২৩, ১১:০২ পিএম

রাজনীতিতে একসময় আইনজীবী ও রাজনীতিবিদদের প্রাধান্য ছিল। সময়ের পরিবর্তনে রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের পদচারণা বেড়েছে। জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব বাড়ার প্রবণতা এখন আর নতুন কিছু নয়। বামপন্থিদের সভা-সমাবেশে মাঝেমধ্যে আগে শোনা যেত, এখন সেটাও কমে এসেছে। বরং এখন রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের আধিপত্য নিয়েই বিভিন্ন মহলে আলোচনা আছে। শনিবার দেশ রূপান্তরে ‘রাজনীতিতে ব্যবসায়ী রাজ’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ‘বড়, মধ্যম ও ছোট ব্যবসায়ীরা আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ ক্ষমতাকেন্দ্রিক প্রায় সব রাজনৈতিক দলেই দলীয় পদ-পদবি পাওয়া শুরু করেছেন। এ তিনটি দলে পরোক্ষ-প্রত্যক্ষভাবে ব্যবসায়ীরাই নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠতে শুরু করেছেন।’ ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের হলফনামায় উল্লিখিত পেশা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ৬১ শতাংশ সংসদ সদস্য ব্যবসায়ী। বাংলাদেশের প্রথম সংসদে এ হার ছিল ১৮ শতাংশ। একাদশ সংসদে পেশায় রাজনীতি এমন সংসদ সদস্য আছেন মাত্র ৫ শতাংশ। দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, আওয়ামী লীগ ও শরিক দলের সদস্যদের ৫৯ শতাংশ ব্যবসায়ী। অন্যদিকে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির ৫৬ শতাংশ সংসদ সদস্যই ব্যবসায়ী। অন্য সব পেশা মিলিয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করছেন ২১ শতাংশ। অন্য পেশা মানে শিক্ষক, চিকিৎসক, কৃষক, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তা, গৃহিণী ও পরামর্শক। ৭৩-এর পরের জাতীয় নির্বাচনগুলোতে সমাজসেবী, কৃষিজীবী, আইনজীবী, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, সাংবাদিক ও অন্যান্য পেশার প্রতিনিধিত্ব সংসদে কমেছে। একমাত্র ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব বেড়েছে সংসদে।

পর্যালোচনা করে দেখা যায়, রাজনীতি ও অন্যান্য পেশার সংসদে প্রতিনিধিত্ব কমতে থাকলেও ব্যবসায়ীদের সংখ্যা আনুপাতিক হারে বেড়েছে। পাশর্^বর্তী দেশ ভারতের ১৭তম লোকসভায় সংসদ সদস্যদের মধ্যে রাজনীতিক ৩৯ শতাংশ আর ব্যবসায়ী ২৩ শতাংশ। অন্যান্য পেশার সংসদ সদস্য রয়েছেন ৩৮ শতাংশ। বিভিন্ন দল ও পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, সংসদে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্ব এমন পর্যায়ে চলে গেছে, যা দেখে বলা যায় রাজনীতিকদের ভেতরে হতাশা জেঁকে বসেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে আওয়ামী লীগ-বিএনপি ও জাতীয় পার্টির একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, শুধু সংসদ সদস্যই নয়, রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে গঠিত সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্বেও থাকছেন ব্যবসায়ীরা।

প্রবীণ রাজনীতিক পংকজ ভট্টাচার্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশে ১৯৭৩ সালের প্রথম সংসদ নির্বাচনে সব পেশার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদেরও প্রতিনিধিত্ব ছিল। পার্থক্য হলো এখন রাজনীতি ও সংসদে অন্য পেশার লোকের সুযোগ কমে যাচ্ছে।’ যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টদের মধ্যে অধিকাংশই ছিলেন আইনজীবী অথবা পেশাদার রাজনীতিক। তবে ব্যবসায়ী, কৃষক, সেনা কর্মকর্তা, অধ্যাপক বা এমনকি অভিনয় পেশার লোকজনও যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। এত পেশার লোকজনের ভিড়ে কারা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ভালো করেছেন তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে জরিপ হয়েছে। এসব নানা জরিপ বিবেচনায় নিয়ে মার্কিন সেনাবাহিনীর এক সাবেক কর্নেল উইলিয়াম জি ক্যাম্পবেল জানিয়েছেন, ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় ব্যবসায়ী পেশা থেকে যারা এসেছেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে তারা খুব খারাপ করেছেন। থাইল্যান্ডের সফল ব্যবসায়ী থাকসিন সিনাওয়াত্রা দেশটির প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। কিন্তু রাজনীতিতে সফল হতে পারলেন না।

রাজনীতিতে কোনো পেশার লোকজনের দাপট বাড়ছে বা রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ কাদের হাতে চলে যাচ্ছে সেটা অবশ্যই আলোচনা, পর্যালোচনা ও গবেষণার বিষয়। দেশের গণতন্ত্রের মান, অবস্থা ও এর ভবিষ্যতের সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে। রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ সম্প্রতি বলেছিলেন, ‘রাজনীতি এখন ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে গেছে। এটি অত্যন্ত দুঃখের বিষয়।’ বিশ্বের সব দেশেই রাজনীতিবিদ ও দলগুলোর চাঁদা ও অনুদানের বড় অংশের জোগান দেয় ব্যবসায়ীরা। বাংলাদেশও এর ব্যতিক্রম নয়। রাজনীতি এভাবে ব্যবসায়ীদের দখলে চলে যাওয়া দেশ, দেশের রাজনীতি ও গণতন্ত্রের জন্য ভালো লক্ষণ নয়। নির্বাচনের খরচ দিনে দিনে যত বেড়েছে, নির্বাচনে প্রার্থী হিসেবে ব্যবসায়ীদের দামও তত বেড়েছে। দলগুলোতে মনোনয়ন-বাণিজ্যের সংস্কৃতিও শুরু হয়েছে এসব কারণেই। অন্যদিকে নির্বাচিত হওয়া মানেই ব্যাংক, বীমা ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিক হওয়ার পথ খুলে যাওয়া। রাজনীতিই এখন বিনিয়োগের বড় ক্ষেত্র ও ব্যবসায় পরিণত হয়েছে। শুধু ব্যবসায়ীরাই যে রাজনীতিতে আসছেন বা রাজনীতি দখল করে নিচ্ছেন তাই না, পেশাদার রাজনীতিকরাও রাজনীতির পাশাপাশি ব্যবসায় জড়াচ্ছেন। নির্বাচন করে জেতার পর ব্যবসা করাটা এখানে খুব সহজ হয়ে যায়। কোনো দেশে রাজনীতিই যদি একটা ব্যবসায় পরিণত হয়, তবে সে দেশের রাজনীতিকে ব্যবসায়ীদের পকেট থেকে বের করে আনা কি আদৌ সম্ভব!

সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত আলোচিত