বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো সফলভাবে প্রতিস্থাপিত ক্যাডাভেরিক বা ব্রেইন স্টিম ডেথ রোগী সারা ইসলামের কিডনি ও কর্নিয়া কাজ করতে শুরু করেছে। মৃত্যুর আগে ২০ বছরের এই তরুণী তার দুটি কিডনি ও দুটি কর্নিয়া দান করে যান। সেই কিডনি ও কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়েছে চারজনের শরীরে। দুটি কিডনি দুই নারীর শরীরে এবং কর্নিয়া দুটির একটি পেয়েছেন এক নারী ও অন্যটি পেয়েছেন এক পুরুষ।
গতকাল শনিবার এই চারজনের স্বজন ও চিকিৎসকরা দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন, চারজনই ভালো আছেন। সারা ইসলামের প্রতিস্থাপিত কিডনি দুই নারীর শরীরে কাজ করতে শুরু করেছে। আর প্রতিস্থাপিত কর্নিয়া আলো ছড়াচ্ছে। কিডনি ও কর্নিয়া গ্রহীতার পরিবার সারা ইসলাম ও তার পরিবারে প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন তারা।
সারা’র মা শবনম সুলতানা গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি আবেগে আপ্লুত। আমার অনেক ভালো লাগছে। আমি জেনে খুশি হলাম আমার মেয়ের চোখে তারা দেখছে। আমার মেয়ের মাধ্যমে তারা দেখছে। তাদের মধ্যে আমার মেয়ে বেঁচে আছে। পাশাপাশি যারা কিডনি পেয়েছে তারাও দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুক এই কামনা রইল।’
গত বুধবার দেশে প্রথম মৃত ঘোষিত কোনো ব্যক্তির অঙ্গ অন্য কোনো রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন সারা ইসলাম। দেশের আইন মেনে চিকিৎসকরা মৃত ঘোষণার পর তার অঙ্গ ওই রোগীর দেহে প্রতিস্থাপন করেন। সারা মাত্র ১০ মাস বয়সে দুরারোগ্য টিউবেরাস স্কে¬রোসিস রোগে আক্রান্ত হন। এ রোগ নিয়ে প্রায় ২০ বছর ধরে লড়াই করেছেন তিনি। এ সময়ে সারা রাজধানীর অগ্রণী গার্লস স্কুল থেকে এসএসসি এবং হলিক্রস কলেজ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এইচএসসি পাস করেন। এরপর তিনি ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলভমেন্ট অল্টারনেটিভে (ইউডা) ফাইন আর্টসে ভর্তি হন। ফাইন আর্টসের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী সারা ছিলেন একজন দক্ষ চিত্রশিল্পী।
সারা টিউমারসহ নানা জটিল রোগ নিয়ে বিএসএমএমইউতে ভর্তি হলে তার একটি অপারেশন করা হয়। একপর্যায়ে অবস্থার অবনতি হলে তাকে আইসিইউতে নেওয়া হয়। এরপর তার অবস্থার আরও অবনতি হতে থাকলে এবং ব্রেইন স্টিম ডেথের দিকে যাচ্ছে বুঝতে পেরে সারা’র মাকে কাউন্সেলিং করেন চিকিৎসকরা। পরে মেয়ের অঙ্গদানের সম্মতিপত্রে স্বাক্ষর করেন আইসিইউতে থাকা ২০ বছর বয়সী মৃতপ্রায় কন্যার মা স্কুলশিক্ষিকা শবনম সুলতানা। পরে ব্রেইন ডেথ ঘোষণার পরপরই সারা’র দুই কিডনি প্রতিস্থাপন করা হয় এবং কিডনি প্রতিস্থাপনের পরপরই সারা’র দেওয়া দুটি কর্নিয়াও দুই রোগীর চোখে প্রতিস্থাপন করা হয়।
বিএসএমএমইউয়ের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, সারা ইসলামের একটি কিডনি দেওয়া হয় রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ এলাকার মনির মিয়ার স্ত্রী শামীমা আক্তারকে। ওই গৃহবধূর কিডনি প্রতিস্থাপনের কাজটি হয় বিএসএমএমইউতে। তার চিকিৎসা চলছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘সি’ ব্লকে। অন্য কিডনিটি প্রতিস্থাপন করা হয় রাজধানীর মিরপুরের হাসিনা আক্তারের দেহে। তার চিকিৎসা চলছে মিরপুরের বেসরকারি হাসপাতাল কিডনি ফাউন্ডেশনে।
চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, কিডনি গ্রহীতা দুই নারী ভালো আছেন। এর মধ্যে বিএসএমএমইউতে চিকিৎসাধীন শামীমা আক্তারের কিডনিতে প্রস্রাব তৈরি হচ্ছে। কিডনি ফাউন্ডেশনে চিকিৎসাধীন হাসিনা আক্তারেরও প্রস্রাব তৈরি হচ্ছে, তবে সেটা খুবই কম। তাদের পুরোপুরি সুস্থ হয়ে উঠতে সময় লাগবে।
অন্যদিকে, কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা পাবনার ঈশ্বরদীর স্কুলশিক্ষিকা ফেরদৌসী আক্তারের চিকিৎসা চলছে বিএসএমএমইউতে এবং নারায়ণগঞ্জের মোহাম্মদ সুজনের চিকিৎসা হচ্ছে রাজধানীর সন্ধানী চক্ষু হাসপাতালে। তাদের দুজনের মধ্যে সুজনের চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হয়েছে গত বৃহস্পতিবার ও ফেরদৌসীর চোখের ব্যান্ডেজ খোলা হয়েছে গত শুক্রবার সকালে। তারা দুজনই সুস্থ আছেন।
কিডনি প্রতিস্থাপন করা শামীমা আক্তারের ভাই শাহাজাদা আহমেদ গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বোন ভালো আছেন। আইউসিউতে আছেন। জ্ঞান ফিরেছে। আমার সঙ্গে কথা হয়েছে। আজ (গতকাল) আল্ট্রাসনোগ্রাম করা হয়েছে। সে আমাকে বলেছে এক পাশে থাকতে থাকতে শরীর ব্যথা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার বোন শামীমা আক্তার পাঁচ বছর ধরে কিডনির সমস্যায় ভুগছিলেন। টানা চার বছর তার ডায়ালাইসিস করতে হয়েছে কিডনি ফাউন্ডেশন হাসপাতালে। এ হাসপাতালে মুজিববর্ষের একটি প্রোগ্রামে কিডনির জন্য কাগজপত্র জমা দিই। পরে গত বুধবার এ হাসপাতালের এক চিকিৎসক ফোন করে আসতে বলেন। আমার বোনের সঙ্গে কিডনির অপেক্ষায় আরও চার নারীও ছিলেন। তার মধ্যে আমার বোন আর অন্য এক নারীর ম্যাচ করেছে। রাতেই তার আপারেশন হয়।’
কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা পাবনার ঈশ্বরদীর স্কুলশিক্ষিকা ফেরদৌসী আক্তারের বড় বোন আনজুমান আক্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গতকাল (গত শুক্রবার) চোখের ব্যান্ডজ খোলা হয়। দেড় দুই হাতের আশপাশে যা আছে তা দেখতে পাচ্ছে। ডাক্তার বলছে, কিছুদিনের মধ্যে দূরের জিনিসও দেখতে পারবে। আমার বোন চোখের আলো ফিরে পেয়েছে। সারা’র চোখ দিয়ে ও এখন দেখছে। এতে সারা’র পরিবারের ভূমিকাও অনন্য। তাদের পরিবারের এ ঋণ আমরা কখনো ভুলব না।’
বিএসএমএমইউয়ের রেনাল ট্রান্সপ্ল্যান্ট সার্জন ও ইউরোলোজি বিভাগের অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান দুলালের নেতৃত্বে সারা ইসলামের দুটি কিডনি প্রতিস্থাপন হয়েছে। গতকাল তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘প্রতিস্থাপিত কিডনি দুটি দুই রোগীর দেহে ইতিমধ্যে কাজ শুরু করেছে। কিডনি ফুল ফাংশনাল হতে কিছু সময় লাগবে। সেটা ১ মাস বা তার বেশি সময় লাগতে পারে। রোগীরা ভালো আছে। তাদের শরীরে অন্য কোনো সমস্যা নেই। তবে পুরো সুস্থতার জন্য আমাদের আরও অনেক সময় অপেক্ষা করতে হবে।’
কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা পাবনার ঈশ্বরদীর স্কুলশিক্ষিকা ফেরদৌসী আক্তারের বোন জানান, ২০১৬ সালে থেকে ফেরদৌসীর ডান চোখে সমস্যা ছিল। কিছুই দেখতে পেতেন না। সরকারি-বেসরকারিভাবে চিকিৎসা নিয়ে কোনো ফল পাননি। পরে বিএসএমএমইউর সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ শীষ রহমানের কাছে চিকিৎসা নেন। সাত বছর আগে কর্নিয়া প্রতিস্থাপনের পরামর্শ দেন এ চিকিৎসক। তবে কর্নিয়া সংকটে এটি এতদিন করা সম্ভব হয়নি। সারা’র কর্নিয়া দানের সম্মতি পেয়েই ডা. শীষ রহমান তার বোনকে ফোন করে ঢাকায় আসতে বলেন। গত বুধবার রাতেই তার কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করা হয়। গত শুক্রবার সকালে তার চোখের সাদা ব্যান্ডেজ খুলে দেন চিকিৎসক। ডান চোখে এখন দেখতে পাচ্ছেন তিনি।
সারা’র কর্নিয়া গ্রহীতা নারায়ণগঞ্জের সুজনের স্বজনরা জানান, গত তিন বছর ডোনার সংকটে কর্নিয়া প্রতিস্থাপন করতে পারেননি। সুজনের চোখে অস্ত্রোপচারে নেতৃত্ব দেন বিএসএমএমইউর চক্ষুবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. রাজশ্রী দাশ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুজন আগে কিছুই দেখতে পেত না। এখন সে দেখতে পাচ্ছে। এতে সে খুব খুশি। তার চোখের ব্যান্ডেজ গত বৃহস্পতিবারে খোলা হয়েছে। শনিবার (গতকাল) সকালে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আবার আগামী বৃহস্পতিবার হাসপাতালে আসবে। তখন সে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলবে।’
বিএসএমএমইউতে হচ্ছে ‘সারা কর্নার’, থাকছে সারার নামে ফলক : সারার এই অনন্য দৃষ্টান্ত তুলে ধরতে ও সারাকে স্মরণ করতে ছয়টি উদ্যোগ নিয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ)। উদ্যোগগুলোর ব্যাপারে ডা. হাবিবুর রহমান দুলাল দেশ রূপান্তরকে জানান ১. বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাডাভেরিক সেলের নাম পরিবর্তন করে ‘সারা ইসলাম ক্যাডাভেরিক ট্রান্সপ্ল্যান্ট সেল’ নামকরণ করা হবে। ২. সারা ইসলামের মা শবনম সুলতানাকে আজীবন বিনামূল্যে চিকিৎসা দেবে হাসপাতালটি। ৩. বিএসএমএমইউর গুরুত্বপূর্ণ সব অনুষ্ঠানে শবনম সুলতানা বিশেষভাবে আমন্ত্রিত হবেন। ৪. বিএসএমএমইউয়ের পরবর্তী সমাবর্তন অনুষ্ঠানে সারা ইসলামের নামে একটি পুরস্কার প্রদান করা হবে। ৫. বিএসএমএমইউতে ‘সারা কর্নার’ স্থাপন করা হবে। থাকবে সারার নামে ফলক। ৬. সারা ইসলামকে সরকার কর্র্তৃক মরণোত্তর জাতীয় পুরস্কার প্রদানের জন্য বিএসএমএমইউর পক্ষ থেকে সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হবে। এসব উদ্যোগ পরবর্তী সিন্ডিকেট সভায় অনুমোদনের জন্য তোলা হবে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের রেনাল ট্রান্সপ্লান্ট বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. হাবিবুর রহমান দুলাল বলেন, ‘সারার অবদানের কাছে এসব উদ্যোগ কিছুই না। গত ৩০ বছরেও আমরা এই কাজ করতে পারছিলাম না। সেই কঠিন কাজ সহজ করে গেছে সারা। ওর কাছে আমরা ঋণী।’
