দক্ষিণ এশিয়ায় চীন-যুক্তরাষ্ট্রের লড়াই

আপডেট : ২৩ জানুয়ারি ২০২৩, ১১:৫৭ পিএম

একবিংশ শতাব্দীতে চীনের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক উত্থান ও ২০১৩ সালে কাজাখস্তানে প্রস্তাবিত ও ইন্দোনেশিয়া সফরে ব্যাখ্যা করা চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের বেল্ট রোড অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভ বা ‘বিআরআই’ প্রকল্প ভারত সাগর থেকে লোহিত সাগর হয়ে ভূমধ্যসাগর পর্যন্ত ভূ-রাজনীতিতে এক অভিনব ভূমিকম্পন তৈরি করেছে। চীনের এই প্রকল্পের বিপরীতে বিশে^র প্রভাবশালী রাষ্ট্র মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘ইন্দো প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি’ বা ‘আইপিএস’ এবং যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান ও অস্ট্রেলিয়ার সমন্বয়ে একটি সামরিক জোট কোয়াড্রিল্যাটেরাল সিকিউরিটি ডায়ালগ বা ‘কোয়াড’ গঠন করে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র কেউই দক্ষিণ এশিয়ার দেশ না হলেও দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এ দেশ দুটির বর্তমান প্রভাব অনস্বীকার্য। এশিয়ার দুই শীর্ষ অর্থনীতি চীন ও ভারত। সীমান্তে নানা ইস্যুতে বিরোধ সত্ত্বেও চীন-ভারতের বাণিজ্য সম্পর্ক ঈর্ষণীয়। দুই দেশ মার্কিন বলয়ের বিকল্প ‘ব্রিকস’-এর সদস্য। ব্রিকস বিশে^র ২৩ শতাংশ জিডিপি ও ৩২ শতাংশ জিডিপি-পিপিপি নিয়ন্ত্রণ করে। ব্রিকসের নিউ ডেভেলেপমেন্ট ব্যাংকের পুঁজি ১০০ বিলিয়ন ডলার, বার্ষিক ঋণ প্রদান ৩৪ বিলিয়ন ডলার পার করছে। এ ছাড়া নিরাপত্তা সংস্থা সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা বা ‘এসসিও’র প্রভাবশালী সদস্য চীন ও ভারত। ব্রিকস ও সাংহাই করপোরেশনের কমন রাষ্ট্র হলেও চীনের প্রস্তাবিত ‘বিআরআই’ প্রকল্পে যোগ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে ভারত। যদিওবা বর্তমানে দুদেশের বাণিজ্য সম্পর্ক ১০০ বিলিয়ন ডলার পার হয়েছে। গত তিন-চার বছরে সীমান্তে বহুবার চীন-ভারত মুখোমুখি হয়ে গেলেও সীমান্তের সে উত্তেজনা দুদেশের বাণিজ্যে খুব একটা আঘাত করতে পারেনি। তবে বাণিজ্য সম্পর্কের বাইরে দুদেশের বাকযুদ্ধ রীতিমতো চলমান ছিল। তাইওয়ানের নতুন সরকারের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতীয় প্রতিনিধি পাঠিয়ে নয়াদিল্লি মূলত চীনকে ছেড়ে কথা না বলারই বার্তা দিয়েছে। ‘বিআরআই’কে এড়িয়ে ভারত বর্তমানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘আইপিএস’ এবং সামরিক জোট ‘কোয়াড’-এর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। শুধু তাই নয় ভারত মহাসাগরে চীনকে ঠেকাতে পশ্চিমাদের নির্ভরযোগ্য খুঁটিও ভারত।

তবে এরই মধ্যে ‘বিআরআই’ প্রকল্প দিয়ে চীন দক্ষিণ এশিয়াসহ এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলে নিজস্ব বলয় তৈরি করে ফেলছে। বিআরআই মূলত একটি অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প যা রেল, সড়ক ও সাগর পথে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকাকে সংযুক্ত করবে। এই প্রকল্পের অধীনে চীন আট হাজার কিলোমিটার সড়ক বা রেলপথ নির্মাণ করতে চায়, নিয়ন্ত্রণ করতে চায় বিশ্বের ৪০ শতাংশ জিডিপি। এরই মধ্যে ভারত ও ভুটান ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ার সব কটি দেশের সঙ্গেই চীন বিআরআই নিয়ে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এ ছাড়া বিআরআই প্রকল্পের ছয়টি করিডরের দুটি ‘চীন-মিয়ানমার অর্থনৈতিক করিডর’ ও ‘চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর’ যাচ্ছে দক্ষিণ এশিয়ার ওপর দিয়ে। চীন এই প্রকল্পের অধীনে হংকং, কম্বোডিয়া, মিয়ানমার, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও মালদ্বীপ হয়ে জিবুতি, সুদান পর্যন্ত সমুদ্রবন্দর নির্মাণ করে একটি সামুদ্রিক অর্থনৈতিক হাব তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে। বিনিয়োগ দিয়ে দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহে রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধি করছে। চীন শুধু ব্যবসা করছে না, করছে ভূ-রাজনীতিও। মালদ্বীপে ২০১১ সালের আগে চীনের দূতাবাস না থাকলেও এখন দুদেশের মধ্যে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি রয়েছে। মালদ্বীপে দ্বীপ কিনছেন চীনা বিনিয়োগকারীরা। রাজধানী মালের সঙ্গে বিমানবন্দর দ্বীপ হুলহুলের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনকারী ব্রিজসহ বিআরআই প্রকল্পের অধীনে বহু প্রকল্পের কর্মযজ্ঞ চলছে মালদ্বীপজুড়ে। একসময়কার ‘সিয়েনটো’ ‘সিয়েটো’-এর গুরুত্বপূর্ণ সদস্য ও মার্কিন মিত্র পাকিস্তান পিংপং কূটনীতির মাধ্যমে চীন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক স্থাপনে মধ্যস্থতা করেছিল। সে পাকিস্তান এখন বহুলাংশে চীনের দিকে ঝুঁকে আছে। বিআরআই প্রকল্পের অধীনে চীন পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডরের মাধ্যমে পাকিস্তানে চীন বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে ৬০-৯০ বিলিয়ন ডলার, যা পাকিস্তানের মোট জিডিপির ১৪-২০ শতাংশ।

বিআরআই প্রকল্পের অধীনে শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা সমুদ্রবন্দর বিনিয়োগ ফাঁদে পড়ে চীনের হস্তগত হওয়ার বিষয়টি এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে বেশ আলোচিত হয়েছে। যদিওবা এই দাবির বিপক্ষেও শক্তিশালী মত আছে। কিন্তু এত তুমুল তর্কবিতর্ক শ্রীলঙ্কায় চীনের বাণিজ্য বা বিনিয়োগকে টলাতে পারেনি। কলম্বো বিমানবন্দরের উন্নয়ন ও বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে চীনা বিনিয়োগের কর্মযজ্ঞ চলছে শ্রীলঙ্কায়। শুধু বিনিয়োগ নয় রাজনৈতিক কূটনীতিতেও চীন শ্রীলঙ্কার ছাতা হচ্ছে। যেভাবে চীন বারবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে রোহিঙ্গা ইস্যু, সামরিক সরকারের নানা ইস্যুতে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আনা সব নিন্দা প্রস্তাবকে আটকে দিয়ে মিয়ানমারকে বৈশ্বিক কূটনীতিতে চীননির্ভর করে তুলেছে শ্রীলঙ্কায়ও চীন তাই করছে।  চীন দক্ষিণ এশিয়ায় একাধিক নীতিতে কাজ করছে কখনো রাজনৈতিক কূটনীতি, কখনো অর্থনৈতিক কূটনীতি, কখনো বা সফট পাওয়ার কূটনীতি নিয়ে তার হেজেমনি প্রতিষ্ঠার কাজ করছে। চীন ও ভারতের মধ্যে ‘বাফার জোন’ হিসেবে কাজ করে ভূবেষ্টিত নেপাল। বর্তমানে নেপালে চীনের বিআরআই প্রকল্পের অধীনে ২৪টি প্রজেক্ট চলমান রয়েছে। তৃতীয় দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করতে নেপালকে চীনা বন্দর ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে পেইচিং। নেপালের সীমান্ত শহর খাসা থেকে তিব্বতের লাসা পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণ, কাঠমুন্ডু-পোখরান-লুম্বিনি রেল প্রজেক্টের মাধ্যমে নেপালের অর্থনীতি ও যোগাযোগব্যবস্থা বদলের পরিকল্পনা নিয়েছে চীন। এসব প্রকল্প নিয়ে বিতর্কের ছোঁয়া ছিল নেপালের সর্বশেষ হয়ে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনেও। যেখানে নেপালি কংগ্রেস এই ম্যারাথন রেল প্রকল্পের বিপক্ষে কথা বলছে আর বামপন্থিরা এই প্রকল্পকে ‘নতুন নেপাল’ নির্মাণের মাইলফলক বলছে। ফলে কাঠমুন্ডুর রাজনীতিতে দিল্লির পাশাপাশি পেইচিংও এখন একটি চাবি। বাংলাদেশের বহুল কাক্সিক্ষত পদ্মা বহুমুখী সেতুতে বিশ্বব্যাংক বিনিয়োগ আটকে দিলে কারিগরি সহযোগিতা নিয়ে পাশে দাঁড়ায় চীন। সেতুটির রেলসংযোগ চীনের ‘বিআরআই’ প্রকল্পের অংশ হচ্ছে বলে জানা গেছে। এ ছাড়া পায়রা বন্দর নির্মাণ প্রকল্প পেয়েছে চীন, নির্মাণ করছে কর্ণফুলীতে দেশের প্রথম টানেল। চীনের বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠান এভাবে পাকিস্তান, বাংলাদেশ, নেপাল, মালদ্বীপ ও শ্রীলঙ্কার মতো এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকার শতাধিক দেশের হাজারখানেক প্রকল্পে এক ট্রিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে ফেলেছে।

চীন বিআরআই প্রকল্পের অধীনে নিজের প্রভাব বিস্তার করতে চাইলেও কোয়াড রাষ্ট্রসমূহ চীনের রাজনৈতিক বিনিয়োগের আড়ালের ভূ-রাজনীতি মোকাবিলায় বদ্ধ পরিকর। কোয়াড ও পশ্চিমা দেশগুলো এরই মধ্যে দক্ষিণ এশিয়ার যেসব দেশে চীনের বিনিয়োগ বাড়ছে, সেখানে বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে হাজির হচ্ছে। এর ফলে বিআরআই, আইপিএস ও কোয়াডের শক্তি প্রদর্শনের সংঘাতপূর্ণ অঞ্চল হয়ে উঠতে পারে দক্ষিণ এশিয়া ও ভারত মহাসাগর সমুদ্র অঞ্চল। কেননা উভয় পক্ষ দক্ষিণ এশিয়ার দেশসমূহে প্রভাব তৈরিতে মরিয়া।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত