প্রখ্যাত ইংরেজ রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ ডেভিড রিকার্ডো ১৮১৭ সালে প্রকাশিত তার On the Principles of Political Economy and Taxation গ্রন্থে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ভিত্তি ‘তুলনামূলক সুবিধা তত্ত্ব’ উপস্থাপন করেন। এই তত্ত্বের মূল কথা হলো পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ প্রাকৃতিক, ভৌগোলিক, জনমিতিক, শিক্ষাগত, প্রযুক্তিগত, অবকাঠামোগত নানা তারতম্যের কারণে বিশেষ বিশেষ পণ্য উৎপাদনে বিশেষ পারঙ্গমতা অর্জন করে; অর্থাৎ একেক দেশ স্বল্প খরচে অন্যের তুলনায় সমমানের বা ভালো মানের পণ্য উৎপাদন করতে সক্ষম হয়। এখন যে দেশ যে পণ্য উৎপাদনে বেশি পারদর্শী, তারা যদি সেই পণ্য উৎপন্ন ও রপ্তানি করে এবং যেসব পণ্য উৎপাদনে অন্য দেশের তুলনায় তাদের খরচ বেশি হয়, সেগুলো উৎপাদনে পারদর্শী দেশগুলো থেকে আমদানি করে, তবে সবার জন্য জয়জয়কার অবস্থা (win-win situation) তৈরি হয়; মোটের ওপর গোটা বিশ্বের উৎপাদন বেড়ে যায়। মুক্তবাজারে আস্থাশীল অর্থনীতিবিদদের ধারণা এই যে, বাধাহীন বৈশ্বিক বাণিজ্যের মাধ্যমে এই ব্যবস্থার পরম বিকাশ ঘটানো সম্ভব, যার ফলে সবাই লাভবান হবেন।
বিশ্বব্যাপী অবাধ বাণিজ্য ত্বরান্বিত করার জন্য এখন গড়ে তোলা হয়েছে বিশ্ববাণিজ্য সংস্থা (World Trade Organization,WTO)। বিশ্ববাণিজ্য বাধাহীন করার প্রধান লক্ষ্য থাকলেও এ সংস্থা যত আইন-কানুন ও বিধিবিধান তৈরি করেছে, তাতে অবাধ বাণিজ্যই অনেক ক্ষেত্রে তার প্রধান শিকারে পরিণত হয়ে পড়েছে। এজন্য বাণিজ্য বৃদ্ধির লক্ষ্যে প্রতিযোগিতামূলক মূল্যে শুধু মানসম্পন্ন পণ্য উৎপাদনই যথেষ্ট নয়, বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বিপুল ও জটিল আইন-কানুন, বিধিবিধান ও চুক্তি সম্পর্কে ধারণা ও জ্ঞান থাকা প্রয়োজন। আরও প্রয়োজন এই জ্ঞান দক্ষতার সঙ্গে প্রয়োগের জন্য উপযুক্ত জনবল।
বাণিজ্যের বিশ্বায়ন নিয়ে নানা সমালোচনা থাকলেও এবং বিলম্বে হলেও বাংলাদেশ এই ব্যবস্থা থেকে সম্প্রতি বেশ ভালো সুফল অর্জন করতে সমর্থ হয়। দেশের রপ্তানি ক্রমেই বাড়ছে; macrotrends-এর তথ্য অনুযায়ী ২০০০ ও ২০১০ সালে দেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৬.৫৯ ও ১৮.৪৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এরপর ২০২১-২২ সালে রপ্তানি আয় বেড়ে দাঁড়ায় ৫২.০৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার (Dhaka Tribune, Dated 03, July, 2022)। ৫০ বিলিয়নের নিশানা অতিক্রম করলেও দেশের জিডিপির অনুপাতে এই রপ্তানি আয়ে আত্মতুষ্টির কোনো কারণ থাকতে পারে না; এখনো এটা জিডিপির ১০-১২ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, এটাকে স্বল্প মেয়াদেই অন্তত ২৫ থেকে ৩০ শতাংশে উন্নীত করা প্রয়োজন। এর জন্য রপ্তানি পণ্য যেমন বহুমুখীকরণ করতে হবে, তেমনি রপ্তানির গন্তব্যও করতে হবে বিচিত্র ও নির্বিঘœ। পরিবহন খরচ ও সময় কম লাগায় নিকট প্রতিবেশীদের মধ্যে বাণিজ্যের প্রসার ঘটলে অবস্থার দ্রুত উন্নতি ঘটে থাকে। আসিয়ান (ASEAN) ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (EU) বাণিজ্য এর প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত।
বাংলাদেশ প্রায় তিন দিক দিয়ে ভারত দ্বারা পরিবেষ্টিত। ভারত যেমন বৃহৎ এক অর্থনীতি, তেমনি বিরাট এক বাজারও বটে। এর অর্থনীতিও ক্রমোন্নতিশীল। রাজনৈতিক পর্যায়ে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক যেকোনো বিচারে তুঙ্গে। কিন্তু বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে এ সম্পর্কের প্রতিফলন দেখা যায় না। যেমন বাংলাদেশের রপ্তানির জন্য উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কাঁচামাল ও মূলধনসামগ্রী আমদানি করতে হয়। কিন্তু এই আমদানির প্রধান অংশীদার দোরগোড়ার ভারত নয়; দূরবর্তী চীন। ২০২০-২১ সালে ভারত থেকে আমদানি হয় ৮.৬ বিলিয়ন ডলারের পণ্য, আর চীন থেকে আমদানি হয় ১২.৯ বিলিয়ন ডলারের সামগ্রী (Business Inspection, August 28, 2022)। তা ছাড়া, ভারতের সঙ্গে যে বাণিজ্য হচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশের বিপক্ষে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ বিপুল; ২০২১-২২ সালে বাংলাদেশে ভারতের রপ্তানি ১৬ বিলিয়ন ডলার এবং সেখানে বাংলাদেশের রপ্তানি মাত্র ২ বিলিয়ন ডলার। দীর্ঘ মেয়াদে এই ভারসাম্যহীনতা দেশের জন্য মঙ্গলজনক নয়, কিন্তু এটা কমিয়ে আনার জন্য তেমন কোনো কার্যকর ব্যবস্থাও গ্রহণ করতে দেখা যাচ্ছে না। উল্টো ভারতীয় বাণিজ্য প্রশাসন এমন কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছে, যাতে এ দেশের রপ্তানির ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।
ভারত ২০১৭ সালে বাংলাদেশি পাটপণ্য, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ও ফিশিং নেটের ওপর ৫ বছরের জন্য প্রতি টনে ১৯ ডলার থেকে ৩৫১.৭২ ডলার অ্যান্টি ডাম্পিং ডিউটি (এডিডি) আরোপ করে। এডিডি হলো এমন এক ধরনের শুল্ক, যা আমদানিকারক দেশ সেসব পণ্যের ওপর অতিরিক্ত হিসেবে আরোপ করে থাকে, যেগুলো রপ্তানিকারক দেশ রপ্তানি-গন্তব্যে বাজার দখলের লক্ষ্যে উৎপাদন খরচের চেয়ে কমমূল্যে অথবা নিজ দেশে ওই পণ্যের বিক্রয় মূল্যের চেয়ে উল্লেখযোগ্য কম দামে রপ্তানি করে। এই অভিযোগের মধ্যে কোনো সত্যতা না থাকায় বিভিন্ন সময় বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ের সভায় বাংলাদেশ এই এডিডি আরোপের প্রতিবাদ করে আসছে। কিন্তু ভারতীয় আমলাদের বিবেচনায় বিষয়টি আধাবিচারিক হওয়ায় এ ক্ষেত্রে তাদের কিছু করণীয় নেই। বিগত ডিসেম্বর ২০২২ নয়াদিল্লিতে মন্ত্রিপর্যায়ের যে সভা অনুষ্ঠিত হয় সেখানে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি তার প্রতিপক্ষকে বিশেষভাবে অনুরোধ করে আসেন, যাতে এই এডিডির মেয়াদ আর না বাড়ে। যে হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে এই সভা অনুষ্ঠিত হয়, তাতে ধারণা করা হয়েছিল যে, এই শুল্কের মেয়াদ আর বাড়বে না। কিন্তু দেখা গেল যে, পরিস্থিতি যে তিমিরে ছিল সেই তিমিরেই রয়ে গেছে; আবারও ৫ বছরের জন্য এডিডি বাড়ানো হয়েছে।
বাংলাদেশের রপ্তানি পণ্যের ওপর ভারতের এডিডি আরোপ নতুন কিছু নয়; এর আগে ২০০১ সালে বাংলাদেশের লিড অ্যাসিড ব্যাটারির ওপর তারা এডিডি আরোপ করে। এরপর করে ক্লিয়ার ফ্লট গ্লাসের ওপর। গ্লাসের বেলায় অবশ্য ভুক্তভোগী শুধু বাংলাদেশ ছিল না; ছিল আরও অনেক দেশ। এই জাতীয় শুল্ক আরোপের ফলে বাংলাদেশের বৈচিত্র্যহীন রপ্তানি ঝুড়ির কলেবর আরও ছোট হয়ে যায়। ফলে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ আরও বেড়ে যায় এবং দেশের অভ্যন্তরে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রও তার বিরূপ প্রভাব পড়ে।
ভারত একাধারে পরম বন্ধুরাষ্ট্র, আঞ্চলিক শক্তি এবং ক্রমবর্ধমান বৃহৎ অর্থনীতি। তাই ছোট অর্থনীতির দেশ হিসেবে তার কোনো সিদ্ধান্তের আক্রমণাত্মক বিরোধিতায় স্পর্শকাতরতা থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু স্বীয় স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ ভারতের মতো শক্তিশালী দেশের সঙ্গে একাধিকবার লড়াই করে জয়লাভ করেছে। লিড অ্যাসিড ব্যাটারির শুল্ক প্রত্যাহারের জন্য বাংলাদেশ বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার বিবাদ নিষ্পত্তি প্রতিষ্ঠানে (Dispute Settlement Body, DSB) ২০০১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে মামলা করে। ভারতীয় পক্ষ তাদের অবস্থানের পক্ষে যৌক্তিকতার অপর্যাপ্ততা বিবেচনায় এই মামলা না চালিয়ে আলোচনার মাধ্যমে নিষ্পত্তির প্রস্তাব করে। আলোচনা অন্তে ২০০৫ সালে এই শুল্ক প্রত্যাহৃত হয়। একইভাবে বাংলাদেশের জল সীমান্তে বিবাদমান ২৫,৬০২ বর্গকিলোমিটার জায়গায় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠায় ভারতের বিরুদ্ধে বাংলাদেশ দি হেগের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালে মামলা করে এবং ২০১৪ সালে তাতে জয়লাভ করে; বিবাদমান জায়গার মধ্যে বাংলাদেশ ১৯,৪৬৭ বর্গকিলোমিটারের অধিকার পায়। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে এসব মামলা-মোকদ্দমা রজ্জু করা সত্ত্বেও কিন্তু দুদেশের মধ্যে সুসম্পর্কের কোনো অবনতি ঘটেনি; বরং তা উত্তরোত্তর সুসংহত হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে এটা নিশ্চিত যে, ভারত দ্বিতীয়বারের মতো পাটপণ্য, হাইড্রোজেন পার-অক্সাইড ও ফিশিং নেটের ওপর আরও ৫ বছরের জন্য যে এডিডি আরোপ করেছে, তা প্রত্যাহারের জন্য বিশ্ববাণিজ্য সংস্থার ডিএসবিতে আপিল করা হলে আগের মতোই প্রতিকার পাওয়া যাবে। এজন্য এখনই আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। বাণিজ্যমন্ত্রী অবশ্য সে রকম কাজেরই ইঙ্গিত দিয়েছেন। তবে এর জন্য প্রয়োজন বিবাদমান বিষয়ের গুণাগুণ বিচার-বিশ্লেষণ অন্তে তা সঠিকভাবে আদালতে উপস্থাপন করা। আর এখানেই প্রয়োজন দক্ষ ও কুশলী এক কর্মীবাহিনীর। বর্তমানে এটার অভাব অনুভূত হলে বিশেষজ্ঞদের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
অনেকে মনে করেন, বর্তমানে ভারতের সঙ্গে বিস্তীর্ণ অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (CEPA) সম্পাদনের যে আলোচনা চলছে, সেটা কার্যকর হলে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্য ঘাটতি কমে যাওয়ার ক্ষেত্র উন্মোচিত হবে। ক্রমবর্ধমান চীনা বিনিয়োগের প্রেক্ষাপটে ২০১৮ সালে ভারত-সূচিত এই ধারণার কার্যকর বাস্তবায়নে সে সম্ভাবনা অবশ্যই রয়েছে; ধারণা করা হচ্ছে যে, এ চুক্তি বাস্তবায়িত হলে ২-৩ বছরের মধ্যে দুদেশের বাণিজ্য ৪০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হতে পারে। কিন্তু দেশের রপ্তানি পণ্যের ঝুড়ি বৈচিত্র্যপূর্ণ ও গন্তব্যে সেগুলোর অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত না করতে পারলে ঘাটতি আরও বেড়েও যেতে পারে। এজন্য নতুন নতুন মানসম্পন্ন পণ্য যেমন নিয়ে আসতে হবে, তেমনি যেসব পণ্যের প্রতিযোগিতামূলক বাজার সেখানে রয়েছে, সেগুলোর শুল্ক ও অশুল্ক বাধা চিহ্নিত এবং দূর করার ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু আলোচনার টেবিলে ভারতের মতো শক্তিশালী ও অভিজ্ঞ আলোচকদের কাছে এ দেশীয় প্রতিপক্ষ কি সমকক্ষতা প্রদর্শন করতে পারবে?
সামনে বাণিজ্য-অংশীদারদের অনেকের সঙ্গেই বিবাদ নিষ্পত্তিতে আইনি ও বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইয়ের প্রয়োজন হবে। ভারতের পাশাপাশি বাংলাদেশি তৈরি-পোশাকের ওপর ২০২১ সালে ইন্দোনেশিয়া কর্র্তৃক আরোপিত রক্ষাকবচ শুল্ক আরোপের আরেকটি ইঙ্গিত। ২০২৬ সালে বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের ক্লাব থেকে যখন স্নাতক হয়ে বেরিয়ে আসবে, তখন আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা ও অগ্রাধিকারের পরিবর্তে কঠিন প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হতে হবে। এই পটভূমিতে অচিরেই অনেক দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, মুক্ত ও অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষর করতে হবে। এসব চুক্তিতে দেশের স্বার্থ যাতে সমুন্নত থাকে, তার জন্য প্রয়োজন ভূ-রাজনীতি, অর্থনীতি, বিশ্ববাণিজ্য, আইন ও চুক্তি প্রভৃতি শাস্ত্রে বিদগ্ধ ও ভূয়োদর্শী এক নিয়মিত কর্মীবাহিনী। ভূতপূর্ব পাকিস্তানে দক্ষ ও চৌকস লোকবল গড়ার লক্ষ্যে সিএসপি ও পিএফএস অফিসারদের অক্সফোর্ড, কেমব্রিজ ও ফ্লেচারস স্কুল অব ল অ্যান্ড ডিপ্লোমেসির মতো স্বনামধন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হতো। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে এ ধরনের বিশেষভাবে প্রশিক্ষিত জনবলের স্থায়ী কাঠামো গড়ে তোলা দরকার। তবে কিছুটা সময়সাপেক্ষ হওয়ায় এ কাজে এখনই মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। তার আগে বিশেষজ্ঞদের দ্বারা অ্যাডহক ভিত্তিতে জরুরি কাজ চালিয়ে নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আশা করি কর্র্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনায় নেবে।
লেখক: খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কলামিস্ট
