এই প্রথমবারের মতো মা থেকে সন্তানের মধ্যে নিপাহ ভাইরাসের অ্যান্টিবডি পেয়েছে আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআর,বি)। প্রতিষ্ঠানটি গবেষণায় দেখেছে, নবজাতক সন্তান মায়ের কাছ থেকে নিপাহ ভাইরাসের হিউমোরাল অ্যান্টিবডি বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা পায়। এ গবেষণা প্রতিবেদনে প্রথমবারের মতো নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ থেকে সেরে ওঠা ব্যক্তি থেকে অন্যজনে সম্ভাব্য রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রবাহের নতুন তথ্য প্রদান করা হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ গবেষণার তথ্য জানায় আইসিডিডিআর,বি। গবেষণাটি সম্প্রতি ট্রপিক্যাল মেডিসিন অ্যান্ড ইনফেকশাস ডিজিজেস জার্নালে প্রকাশিত হয়েছে বলে জানানো হয়।
এ ব্যাপারে এই গবেষণার প্রধান গবেষক ও আইসিডিডিআর,বির ইনফেকশাস ডিজিজেস ডিভিশনের ইমার্জিং ইনফেকশন্স শাখার সহকারী বিজ্ঞানী ডা. সৈয়দ মইনুদ্দীন সাত্তার গতকাল রাতে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মায়ের শরীরে নিপাহ ভাইরাসের অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে এবং মা থেকে সেই অ্যান্টিবডি প্রসব করা শিশুর শরীরে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, এমন তথ্য বাংলাদেশেই প্রথম পাওয়া গেল। কারণ এখন পর্যন্ত কোথাও এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য প্রকাশ পায়নি। আমরাই প্রথম এমন তথ্য দিলাম। তাছাড়া বাংলাদেশ ও ভারত ছাড়া বিশ্বের কোথাও এখন আর নিপাহ ভাইরাসের কেস নেই।’
আইসিডিডিআর,বি জানায়, ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ফরিদপুর জেলায় পাঁচ বছরের কমবয়সী এক মেয়ে এবং তার মা নিপাহ ভাইরাসে সংক্রমিত হন। তারা দুজনই খেজুরের কাঁচা রস পান করেছিলেন। তাদের মধ্যে শিশুটি মারা যায় এবং মা গুরুতর স্নায়বিক জটিলতার শিকার হন। ২০২১ সালের নভেম্বরে তিনি আবার গর্ভধারণ করেন এবং প্রসবের আগে তাকে জাতীয় নিপাহ সার্ভেইল্যান্সের অধীনে নিবিড় তত্ত্বাবধানে রাখা হয়। ২০২১ সালের আগস্টে তিনি একটি সুস্থ ছেলে শিশুর জন্ম দেন। রুটিন সারভাইভার ফলোআপের অংশ হিসেবে নবজাতকের দেহ থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল এবং ভার্টিকেল ট্রান্সমিশন বা মা থেকে শিশুতে সংক্রমণের সম্ভাবনা বাদ দেওয়ার জন্য রেফারেন্স ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষা করা হয়েছিল।
আইসিডিডিআর,বি আরও জানায়, যদিও পরীক্ষা করে র্যাপিড ও পিসিআর টেস্টে নিপাহ সংক্রমণ পাওয়া যায়নি, কিন্তু অ্যান্টি-নিপাহ আইজিজির একটি উচ্চ টাইটার দেখতে পাওয়া যায়। এভাবেই প্রথমবারের মতো নিশ্চিত হওয়া যায় যে, মা থেকে সন্তানের মধ্যে নিপাহ ভাইরাসের হিউমোরাল অ্যান্টিবডি পৌঁছে।
এ গবেষণার প্রধান গবেষক ও আইসিডিডিআর,বির ইনফেকশাস ডিজিজেস ডিভিশনের ইমার্জিং ইনফেকশন্স শাখার সহকারী বিজ্ঞানী ডা. সৈয়দ মইনুদ্দীন সাত্তার গবেষণা প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমাদের জানামতে এ গবেষণাই প্রথম নিপাহ ভাইরাসভিত্তিক ইমিউন প্রপার্টিজের ভার্টিকেল ট্রান্সফার বা মা থেকে শিশুতে পরিবাহিত হওয়ার প্রমাণ নিশ্চিত করে। ভাইরাস নিউট্রিলাইজেশনের কার্যকারিতা এবং নবজাতকের সুরক্ষার সম্ভাব্যতার বিষয়ে আরও গবেষণা করা প্রয়োজন। এটি নিপাহ ভাইরাস প্রতিরোধে গর্ভবতী ও কমবয়সী নারীদের জন্য টিকা আবিষ্কারের ক্ষেত্রে একটি রেফারেন্স হিসেবেও কাজ করবে বলে আমি আশাবাদী।’
মানুষকে খেজুরের কাঁচা রস খেতে নিষেধ করেছেন রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) পরিচালক অধ্যাপক ডা. তাহমিনা শিরিন। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি আমরা মানুষের মধ্যে আবারও খেজুরের কাঁচা রস খাওয়ার প্রবণতা লক্ষ করছি এবং সেই উৎসবের খবর ও ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে। অথচ আমরা সবাইকে খেজুরের কাঁচা রস পান করতে নিষেধ করছি, রস সংগ্রহে যত সতর্কতাই অবলম্বন করা হয়ে থাকুক এটি অনিরাপদ।’
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, নিপাহ ভাইরাসে মৃত্যুর হার আনুমানিক ৪০ শতাংশ থেকে ৭৫ শতাংশ এবং বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ হার ৭১ শতাংশ। এ ছাড়াও নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে সুস্থ হয়ে যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে পরবর্তী সময়ে গুরুতর স্নায়ুবিক জটিলতা দেখা যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং গর্ভবতী নারীদের গর্ভাবস্থার শেষের দিকে এ জটিলতা আরও খারাপ হয়।
নিপাহ ভাইরাস সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়ে আইসিডিডিআর,বি জানায়, নিপাহ ভাইরাস একটি জুনোটিক ভাইরাস (অর্থাৎ এটি প্রাণী থেকে মানুষে সংক্রমিত হয়) এবং এটি দূষিত খাদ্য অথবা সরাসরি মানুষ থেকে মানুষে ছড়াতে পারে। টেরোপাস জেনাসের ফলখেকো বাদুড় এ ভাইরাসের প্রাকৃতিক ধারক এবং মহামারী সৃষ্টিতে সক্ষম রোগের মধ্যে এটি একটি। বাংলাদেশে ২০০১ সালে প্রথম এই ভাইরাসটির প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় এবং তখন থেকে এই জনবহুল দেশে প্রায় প্রতি বছরই অনেক মানুষ মারা যায়। আইসিডিডিআর,বির তথ্য অনুযায়ী, দেশে এ বছরের ২৪ জানুয়ারি পর্যন্ত ৩৩১ জন মানুষ নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণে আক্রান্ত হয়েছে ও মারা গেছে ২৩৬ জন।
