থিয়েটার চর্চার অগ্রগামী নাট্যদল ‘আরণ্যক’। দেশ-বিদেশের মঞ্চে গৌরবের সুদীর্ঘ ৫০ বছর পার করেছে দলটি। দলটি একের পর এক সাড়া জাগানো মঞ্চনাটক উপহার দিয়েছে। সে নাটকগুলো নির্মল বিনোদনের খোরাক তো জুগিয়েছেই। পাশাপাশি সমাজের নানা সমস্যা, সংগ্রাম, দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি তুলে ধরেছে। সুবর্ণজয়ন্তীর এই ক্ষণকে বর্ণিল ও স্মরণীয় করতে আরণ্যক আয়োজন করেছে ৮ দিনের নাট্যোৎসব। বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে আগামীকাল থেকে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ উৎসব চলবে। এই আট দিনে আরণ্যকের নতুন ও পুরনো ৯টি নাটক মঞ্চস্থ হবে। এক দলের ৯টি নাটক টানা মঞ্চস্থ করা ‘ছেলের হাতের মোয়া’ নয়। আরণ্যকের প্রধান মামুনুর রশীদ জানালেন, এই উৎসবের প্রস্তুতি তারা বিগত এক বছর ধরে নিচ্ছেন। নিয়মিত মহড়া, পরিকল্পনা ও তা বাস্তবায়নের জন্য আরণ্যক নাট্যদলের প্রত্যেকে নিরলস কাজ করেছে।
২৭ জানুয়ারি বিকেল ৪.৩০ মিনিটে উদ্বোধনী অনুষ্ঠান হবে নন্দন মঞ্চে। এরপর সন্ধ্যা ৭টায় জাতীয় নাট্যশালায় নাটক ‘ওরা কদম আলী’। ২৮ জানুয়ারি নাট্যশালার লবিতে বিকেল ৫টায় ‘নাটকসমগ্র ৪ : মামুনুর রশীদ’, ‘পাঁচটি নাটক’ ও ‘আরণ্যকের নাট্যচর্যা’ বইগুলোর প্রকাশনা অনুষ্ঠান। পরে মূল হলে নাটক ‘ইবলিশ’। ২৯ জানুয়ারি একই ভেন্যুতে বিকেলে বেহালা বাদন, পরে নাটক ‘ময়ূর সিংহাসন’, ৩০ জানুয়ারি সরদ বাদন ও নাটক ‘রাজনেত্র’, ৩১ জানুয়ারি আদিবাসী সংগীত ও নাটক ‘রাঢ়াঙ’, ১ ফেব্রুয়ারি লোকসংগীত ও নাটক ‘নানকার পালা’, ২ ফেব্রুয়ারি বাঁশি বাদন ও নাটক ‘কহে ফেসবুক’, ৩ ফেব্রুয়ারি সকালে সেমিনার : ৫০-এ আরণ্যক, বিকেল ৫.৩০ মিনিটে নাটক ‘কবর’, সন্ধ্যা ৭টায় নাটক ‘সংক্রান্তি’র পর সমাপনী অনুষ্ঠান। ১৯৭২ সালের ১ ফেব্রুয়ারি স্বাধীন বাংলাদেশে নাট্যচর্চায় যাত্রা শুরু করে আরণ্যক নাট্যদল। ওই বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি শহীদ মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’ নাটকটি দিয়ে প্রথম মঞ্চে আসে তারা। ‘নাটক শুধু বিনোদন নয়, শ্রেণিসংগ্রামের সুতীক্ষè হাতিয়ার’ স্লোগান নিয়ে বাংলাদেশের নাট্যাঙ্গনকে সমৃদ্ধ করেছে দলটি। মঞ্চনাটক, পথনাটক ও মুক্ত নাটক করে নাট্যচর্চাকে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করে যাচ্ছে দলটি। একটি নাটকের দলের সঙ্গে ৫০ বছর পার করা বড় একটি ঘটনা। এ বিষয়ে আরণ্যকের প্রধান মামুনুর রশীদের অনুভূতি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেক সংকট পার করেছি। অনেক সংগ্রাম পার করেছি। অনেক কিছুর বিনিময়ে সবার ভালোবাসার নাটকের দল আরণ্যক ৫০ বছর পার করছে। এটা আমার জীবনের বড় ঘটনা। এটা আমার জীবনের সবচেয়ে আনন্দের ঘটনা। কখনো ভাবিনি আরণ্যক নাট্যদলের ৫০ বছর দেখে যেতে পারব। সেই বিরল সুযোগ আমার জীবনে ঘটেছে। আমি সত্যি আনন্দিত। সবার ভালোবাসায় আরণ্যক ৫০ বছর পার করছে। সবার প্রতি কৃতজ্ঞ।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমরা আরণ্যকের ৫০ বছরপূর্তিকে স্মরণীয় করে রাখতে চাই নাটকের ইতিহাসে, সেজন্য সারা বছর আমরা পরিকল্পনা করেছি। আমরা আন্তর্জাতিক নাট্য উৎসব করতে চাচ্ছি। সেখানে নাট্য উৎসব ছাড়াও অনেক কিছু হবে।’ এই সময়ে এসে কাদের কথা মনে পড়ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অনেক স্মৃতি, অনেক ঘটনা, অনেক কিছুই মনে পড়ে। আরণ্যক নাট্যদলের প্রথম নাটক ছিল শহীদ মুনীর চৌধুরীর ‘কবর’। সেই নাটকটির প্রথম মঞ্চায়নে অভিনয় করেছিলেন প্রয়াত সুভাষ দত্ত, আলী যাকের, ইনামুল হক। তাদের খুব করে মনে পড়ছে। আবদুল্লাহ আল মামুনকেও মনে পড়ছে। তিনিই নামটি রেখেছিলেন। মুজিব বিন হক, নাজমুল হাসানের কথা মনে পড়ছে। অনেকের নাম মনে পড়ছে না। সব মিলিয়ে একটি বড় পথ পাড়ি দিয়ে এসেছি। সবার কথা স্মরণ করছি হৃদয় থেকে।’ শুরুর দিককার স্মৃতি হাতড়ালেন মামুনুর রশীদ, ‘তখন সদ্য দেশ স্বাধীন হয়েছে। আমি কর্মহীন। কী করব ভাবছি। দেশ স্বাধীনের আগে ভেবেছিলাম; যদি স্বাধীনতা পাই দেশে ফিরে গিয়ে নাটক করব। সেই কথা মনে করে নাটকের দল প্রতিষ্ঠা করি। আমার কাছে নাটক শুধু বিনোদন নয়। নাটক হচ্ছে শ্রেণিসংগ্রামের সুতীক্ষè হাতিয়ার।’
