২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে দেশের ব্যবসা পরিবেশ সূচকে সামান্য উন্নতি হয়েছে। তবে এ বছর ব্যবসায়ীদের ঋণপ্রাপ্তিতে খুব বেশি ভুগতে হয়েছে। পাশাপাশি কর দেওয়ার প্রবণতা ও ব্যবসায় জমি পাওয়াও বেশ কঠিন ছিল। জমিপ্রাপ্তিতে বিভিন্ন সরকারি কর্মকর্তাদের ঘুষ দিতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের।
গতকাল মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এমসিসিআই) প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ বিজনেস ক্লাইমেট ইনডেক্স (বিবিএক্স) ২০২২-২৩’ এর মোড়ক উন্মোচনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। বিশ^ব্যাংক ২০২১ সালে ব্যবসা সহজীকরণ সূচক প্রকাশ বন্ধ করার পর এমসিসিআই ও পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ (পিইবি) যৌথভাবে প্রতিবেদনটি তৈরি করেছে। পিইবির চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজ প্রতিবেদনটি উপস্থাপন করেন।
এমসিসিআইয়ের বিবিএক্স প্রতিবেদনে বলা হয়, এ বছর ব্যবসায় উন্নয়ন সূচকে সামান্য উন্নতি হয়েছে। ২০২২ সালে ব্যবসা সূচকের পয়েন্ট দাঁড়িয়েছে ৬১ দশমিক ৯৫, যেটি আগের বছর অর্থাৎ ২০২১ সালে ছিল ৬১ দশমিক শূন্য ১ পয়েন্ট। বিবিএক্সের এ জরিপটিতে ১০টি পিলারকে মানদ- হিসেবে ধরা হয়েছে। এ দশটি মানদ- হলো ব্যবসা শুরু করা, জমি অধিগ্রহণের সম্ভাব্যতা, সরকারি তথ্য-উপাত্তের সহজলভ্যতা, অবকাঠামো, শ্রম বিধিবিধান, বিরোধ নিষ্পত্তি, আন্তর্জাতিক ব্যবসায় সহজগম্যতা, কর আদায়, তথ্যপ্রযুক্তির ব্যবহার ও ব্যবসার জন্য ঋণপ্রাপ্তি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, একজন উদ্যোক্তা ব্যবসা শুরু করতে গেলে কমপক্ষে ২৩টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মুখোমুখি হতে হয়। এর মধ্যে ১৫০টি সরকারি বিধিবিধান মেনে চলতে হয় তাকে। বাংলাদেশে এখন কৃষি, পাইকারি ও খুচরা ব্যবসায় উদ্যোক্তা হওয়ার চেয়ে ফার্মাসিউটিক্যালস, কেমিক্যাল ও পোশাক খাতের ব্যবসা দেওয়া অনেক সহজ হয়েছে বলেও উঠে এসেছে এ প্রতিবেদনে। ২০২২ সালে এ সূচক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ দশমিক ৭৮ পয়েন্টে। ২০২১ সালে তা ছিল ৬৮ দশমিক ৯১ পয়েন্ট।
কারখানার জন্য জমি পাওয়ার ক্ষেত্রে জরিপে অংশ নেওয়া ৮৬ শতাংশ ব্যবসায়ী বলছেন, সরকারি সংস্থাগুলোকে বিপুল পরিমাণ ঘুষ দিতে হয়। দেশের আটটি বিভাগের মধ্যে তুলনামূলকভাবে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও রাজশাহীতে জমি পাওয়া কিছুটা সহজ। ২০২২ সালে এ সূচকে অবনতি হয়েছে। এ বছর সূচকটি ৫৩ দশমিক শূন্য ৭ পয়েন্টে নেমেছে, যা ২০২১ সালে ছিল ৫৮ দশমিক ৯০।
২০২২ সালে ব্যবসায়ীদের অর্থায়ন প্রায় অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। এ বছর আগের বছরের চেয়ে ঋণপ্রাপ্তির পরিমাণ কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশেরও বেশি। এ বছর সূচক অবনতি হয়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫ দশমিক ২২ পয়েন্টে। আগের বছরও তা ছিল ৫০ দশমিক ৭৮। জরিপে অংশ নেওয়া ৮৭ শতাংশ ব্যবসায়ী বলছেন, ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে গেলে বা বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে গেলে তারা অনেক জটিলতার সম্মুখীন হয়েছেন। এজন্য তারা অ-ব্যাংকিং খাত বা এনজিও থেকে ঋণ বা বিনিয়োগ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করেছেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এ ভোগান্তিতে বেশি পড়েছেন।
সরকারি তথ্য প্রাপ্তিতে ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে অনেক উন্নতি হয়েছে। এ বছর সূচক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ দশমিক ৮৫ পয়েন্টে, ২০২১ সালে তা ছিল ৫৯ দশমিক ৮৩। অবকাঠামো নির্মাণে ২০২২ সালে পয়েন্ট দাঁড়িয়েছে ৭২ দশমিক ৪৯, আগের বছরে যা ছিল ৭২ দশমিক শূন্য ২।
প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, শ্রম বিধিবিধানের ক্ষেত্রে শ্রমিকরা পোশাক ও পরিবহনের তুলনায় ফার্মাসিউটিক্যালস, কেমিক্যাল ও অবকাঠামো নির্মাণ খাতে অনেক ভালোভাবে কাজ করছেন। এ সূচকেও গত বছরের চেয়ে উন্নতি হয়েছে। ২০২২ সালে এ খাতে সূচক দাঁড়িয়েছে ৭৪ দশমিক ৪০ পয়েন্টে, ২০২১ সালে তা ছিল ৬৬ দশমিক ৩৫। ব্যবসা ক্ষেত্রে বিরোধ নিষ্পত্তিতেও উন্নতি হয়েছে ২০২২ সালে। এ বছর এ খাতে সূচক বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৪ দশমিক ২৪ পয়েন্টে, ২০২১ সালে তা ছিল ৫৭ দশমিক ৪৮।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কিছুটা উন্নতি হলেও চট্টগ্রাম বন্দরসহ বেশ কয়েকটি বন্দরে জটিলতা এখনো রয়েছে। আন্তর্জাতিক ব্যবসায় বাণিজ্য সুবিধা এ বছর সূচকে উন্নতি হয়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ দশমিক ৬১, ২০২১ সালে তা ছিল ৪৯ দশমিক ৪৩। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যবসায়ীরা দাবি করেছেন চট্টগ্রাম বন্দরে এখনো সময় অনেক বেশি প্রয়োজন হয়। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের সূচকেও ২০২২ সালে উন্নতি হয়েছে। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি বলেন, প্রতিনিয়তই ব্যবসায় পরিবর্তন আসছে। আমাদের আরও এগিয়ে যেতে হবে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো অর্থনীতিতে এসএমইর অংশগ্রহণ খুবই কম। তাদের আরও বেশি সুযোগ করে দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, দেশের সরকারি কর্মকর্তারা কথাবার্তায় যতটা স্মার্ট কাজে ততটা স্মার্ট নন। তিন বছর ধরে বলছি সাভারের ইটিপি দ্রুত ইমপ্রুভ করতে, তারা সেটাকে গুরুত্বই দিচ্ছেন না। সেটাকে ইমপ্রুভ করা গেলে কয়েক বিলিয়ন ডলার বেশি রপ্তানি হতো।
এমসিসিআই সভাপতি মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের চারপাশে একযোগে অনেক কিছু চলছে, যেমন ডলার সংকট, বিশ্বব্যাপী বিদ্যুতের দাম বেড়ে যাওয়া, সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি, মহামারী এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ বর্তমান পরিস্থিতি তৈরি করেছে।’
অনুষ্ঠানে এমসিসিআইয়ের সাবেক সভাপতি নিহাদ কবির বলেন, গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড মেনে আমাদের ব্যবসা করতে হবে। ব্যবসা কিছুটা সহজ হয়েছে। আগে ব্যবসা নিবন্ধনে ৩৯টির মতো কাগজ প্রয়োজন হতো, কিন্তু এখন ১২টার মতো প্রয়োজন।
ঢাকা চেম্বারের (ডিসিসিআই) সভাপতি ব্যারিস্টার সামীর সাত্তার বলেন, এই ইনডেক্স নিয়মিত ব্যবহার করলে আমাদের ব্যবসার আরও উন্নতি হবে। কিন্তু ঋণপ্রাপ্তিটা সহজ নয়, কারণ ব্যবসায়ীদের জামানত নেই। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম মেনে ব্যাংকগুলো সিএমএসএমইদের ঋণ দিচ্ছে কিনা, তা নজরদারি করা উচিত।
