ইলেকট্রনিক কোম্পানির মুনাফায় ধস

আপডেট : ২৬ জানুয়ারি ২০২৩, ১১:১৩ পিএম

আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের উচ্চমূল্য ও ডলারের বিপরীতে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের কারণে বিভিন্ন কোম্পানির উৎপাদন ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে একই হারে পণ্যমূল্য বাড়াতে পারেনি কোম্পানিগুলো। এমন পরিস্থিতিতে দেশের ইলেকট্রনিক পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিগুলোর মুনাফায় ধস নেমেছে।

চলতি ২০২২-২৩ হিসাববছরের প্রথমার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত শীর্ষস্থানীয় ইলেকট্রনিক ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স উৎপাদক ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজ পিএলসির নিট মুনাফা কমেছে ৯৭ শতাংশ। একই খাতের আরেক কোম্পানি সিঙ্গার বাংলাদেশ লিমিটেডের নিট মুনাফা ১৪ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে এসেছে। ২০২২ সালে কোম্পানিটির পণ্য বিক্রি থেকে আয় বাড়লেও নিট মুনাফা আগের বছরের তুলনায় ৮৬ শতাংশ কমে গেছে।

এদিকে চলতি ২০২২-২৩ হিসাব বছরের প্রথমার্ধে আগের হিসাব বছরের একই সময়ের তুলনায় ওয়ালটন হাই-টেকের আয় ও নিট মুনাফা দুটোই কমেছে। পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে ওয়ালটন হাই-টেক ইন্ডাস্ট্রিজের আয় হয়েছে ২ হাজার ৫৮৬ কোটি টাকা, যেখানে আগের হিসাব বছরের একই সময়ে আয় ছিল ৩ হাজার ১৫২ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির আয় কমেছে ৫৬৬ কোটি টাকা বা প্রায় ১৮ শতাংশ। তবে আগের বছরের তুলনায় চলতি বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানির উৎপাদন ব্যয় কিছুটা কমলেও ডলারের বিপরীতে টাকার বড় অঙ্কের অবমূল্যায়ন কোম্পানির মুনাফায় কুঠারাঘাত করেছে।

২০২১-২২ হিসাববছরের প্রথমার্ধে ওয়ালটনের উৎপাদন ব্যয় ছিল মোট বিক্রি থেকে আয়ের ৬৯ দশমিক ৫৪ শতাংশ, যা ২০২২-২৩ হিসাববছরের প্রথমার্ধে তা দাঁড়িয়েছে ৬৮ শতাংশে। উৎপাদন ব্যয় সমন্বয়ের পর পণ্য বিক্রি থেকে আয় কমার কারণে মোট আয় আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৪ দশমিক ৩৭ শতাংশ কমেছে। এ সময় ওয়ালটনের প্রশাসনিক, বিক্রি ও বিতরণ ব্যয়ও কমেছে। তবে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হারে ব্যাপক লোকসানের কারণে কোম্পানির নিট মুনাফা ৯৭ শতাংশ কমে গেছে।

পর্যালোচনায় দেখা গেছে, চলতি প্রথমার্ধে বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হারে ওয়ালটনের লোকসান হয়েছে ৩৩৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৩ কোটি টাকা। এ সময় বিনিময় হারে লোকসান ও সুদ ব্যয়সহ মোট আর্থিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৪৬৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৮৩ কোটি টাকা। বিনিময় হারে বড় লোকসানের কারণে চলতি প্রথমার্ধে ওয়ালটনের কর-পরবর্তী নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৪ কোটি টাকায়, যেখানে আগের হিসাববছরের একই সময়ে নিট মুনাফা ছিল ৪৪৬  কোটি টাকা। সে হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে কোম্পানিটির কর-পরবর্তী নিট মুনাফা কমেছে প্রায় ৪৩২ কোটি টাকা বা ৯৬ দশমিক ৭৮ শতাংশ। চলতি হিসাব বছরের প্রথমার্ধে কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) হয়েছে ৪৭ পয়সা, আগের হিসাব বছরের একই সময়ে যা ছিল ১৪ টাকা ৭৩ পয়সায়। সদ্যসমাপ্ত বছরের ৩১ ডিসেম্বর শেষে পুনর্মূল্যায়সহ কোম্পানিটির শেয়ারপ্রতি নিট সম্পদমূল্য (এনএভিপিএস) দাঁড়িয়েছে ৩২০ টাকা ৬ পয়সায়।

ওয়ালটন দ্বিতীয় প্রান্তিকে লোকসান কাটিয়ে উঠলেও গত বছরের জুলাইয়ের পর থেকে লোকসানে পড়েছে সিঙ্গার বাংলাদেশ। কোম্পানিটির হিসাব বছর শেষ হয় ডিসেম্বরে। সিঙ্গার হিসাব বছরের প্রথমার্ধে (জানুয়ারি-জুন) নিট মুনাফা ছিল ২৩ কোটি টাকা। কিন্তু এরপর থেকে আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম ও জাহাজভাড়া বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার বড় অঙ্কের অবমূল্যায়নের কারণে ব্যবসায় লোকসান হতে থাকে। ২০২২ হিসাববছরের দ্বিতীয়ার্ধে (জুলাই-ডিসেম্বর) লোকসানের কারণে কোম্পানির নিট মুনাফা নেমে আসে ৭ কোটি ৩০ লাখে, যা সিঙ্গারের ১৪ বছরের ইতিহাসে সর্বনিম্ন। 

ইলেকট্রনিক ও হোম অ্যাপ্লায়েন্স পণ্য উৎপাদনকারী এবং দেশের অন্যতম খুচরা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান সিঙ্গারের ৪৩৭টি আউটলেট রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, ২০২১ সালের তুলনায় ২০২২ সালে কোম্পানির মুনাফা কমেছে ৮৬ শতাংশ। এর বাইরে কোম্পানির প্রায় এক হাজার ডিলার রয়েছে। এ সময় শেয়ারপ্রতি আয় (ইপিএস) দাঁড়িয়েছে ৭৩ পয়সায়, যা আগের বছরে ছিল ৫ টাকা ২০ পয়সা। যদিও ২০২২ সালে কোম্পানির টার্নওভার বেড়েছে ৮ দশমিক ১ শতাংশ। ২০২২ সালে পণ্য বিক্রি থেকে আয় দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭১০ কোটি টাকায়। 

সিঙ্গার এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, টাকার অবমূল্যায়ন, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়ার পাশাপাশি ইফেক্টিভ ট্যাক্স রেট বেড়ে যাওয়ায় কোম্পানির মুনাফায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পণ্যমূল্য একই হারে বাড়াতে পারেনি প্রতিষ্ঠানটি। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত