বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকলেও শরিকরা জোট ছেড়ে যায়নি। হতাশার কথা জানালেও জোটে থেকেও গিয়েছিল অধিকাংশ দল। শেষ পর্যায়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে জোট বিলুপ্ত করে। শরিকরা আলাদা জোট গঠন করে বিএনপির দাবি-দাওয়া সমর্থন করে তাদে সঙ্গে থেকে যায়। জোটের অন্তত চারজন নেতার বক্তব্য অনুযায়ী, এখনো তাদের হতাশা আছে। কিন্তু অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার কারণে বিএনপির সঙ্গে তারা থাকছেন।
গত ১০ ডিসেম্বর বিএনপির গণসমাবেশের আগের দিন হঠাৎ করেই ২০ দলীয় জোট বিলুপ্তির ঘোষণা করে বিএনপি। দলটির গুলশানের কার্যালয়ে জোটের সব শরিককে ডেকে জানানো হয়, আজ থেকে যার যার মতো চলবে। দলগুলোর কেউ আজ থেকে জোটের পরিচয় দেবে না। বিএনপির পক্ষ থেকে এমন ঘোষণা আসবে-২০১৮ সালের নির্বাচনের পর থেকে আঁচ করতে পারলেও আগ বাড়িয়ে কথা বলেনি শরিকরা।
জোটের ওই বৈঠকেই শরিক নেতাদের ক্ষোভের মুখে পড়েন অনানুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্তির এ ঘোষণা দেওয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। হতাশা ব্যক্ত করে জোট নেতারা তাকে জানান, অন্তত রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় জোট বিলুপ্তির ঘোষণা আসতে পারত। অনাকাক্সিক্ষত পরিস্থিতি এড়াতে বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখতে অনুরোধ করেন নজরুল ইসলাম খান।
বিএনপির ঘোষণার পর অনেকটা কূল ছাড়া সাগরে পড়ে জোটসঙ্গীরা। উপায়ান্তর না দেখে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে নতুন জোট গঠনের তৎপরতা শুরু করেন। দুভাবে বিভক্ত হয়ে ১২ দলীয় জোট ও জাতীয়তাবাদী সমমনা জোট নামে যুগপৎ আন্দোলনে বিএনপির সঙ্গেই থাকে তারা।
জানতে চাইলে যুগপৎ আন্দোলনের লিয়াজোঁ কমিটির সদস্য ও বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল দেশ রূপান্তরকে বলেন,‘২০ দলীয় জোটকে নিয়ে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নেতিবাচক ব্র্যান্ডিং করা হচ্ছিল, সেটি ভেঙে দিতে এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। আমাদের রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেই আমরা এটি করেছি।’ তিনি বলেন, ‘এ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে আমরা দেখাতে চেয়েছি বিএনপির রাজপথে বড় একক শক্তি এবং দেশের আপামর জনগণ দলটির সঙ্গে আছে। আবার যারা বিএনপির সঙ্গে আছে, তাদেরও একক অস্তিত্ব রয়েছে। তারাও কর্মসূচি পালন করতে পারে।’
তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একাধিক নেতা জানান, গত দুই যুগে ২০ দলীয় জোটের (আদতে ২৩ দল) কর্মসূচিতে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ছাড়া মূলত কারোই সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল না। শক্তি-সামর্থ্যরে দিকে অনেক পিছিয়ে। মঞ্চে বক্তৃতার জন্য জোটের শীর্ষ নেতারা উন্মুখ হয়ে থাকলেও অধিকাংশেরই কর্মী সংকট থাকত। দেশি-আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সংখ্যার তত্ত্ব বিএনপি দেখাতে পারলেও এসব দলের দুই-একজন ছাড়া অধিকাংশেরই সর্বক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্যতার ঘাটতি রয়েছে। বিরোধীপক্ষের মুখ বন্ধ রাখতে জামায়াতের সঙ্গে সম্পর্কের বিষয়টিও এই সিদ্ধান্ত নিতে নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে।
অন্যদিকে ২০ দলীয় জোটের একাধিক নেতা বলছেন, বিএনপি না চাইলেও নানা কারণে বিএনপির সঙ্গে থাকতে চান তারা। বিএনপির নেতৃত্বে থাকা মানে মিডিয়া কভারেজ পাওয়া। দলকে টিকিয়ে রাখতে, জনগণের কাছে যেতে চাইলে মিডিয়া কভারেজের বিকল্প নেই। বিএনপির সঙ্গে বৈঠকে যে মিডিয়া কভারেজ হয়, এখন যুগপৎ আন্দোলনে তার সিকিভাগও হয় না। দ্বিতীয়ত, বিএনপির নেতৃত্ব স্থানীয় সরকার থেকে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সব জায়গায় সুবিধা মেলে। নির্বাচন এলেই জোটের শীর্ষ নেতারা সংসদ নির্বাচনের জন্য জোট থেকে মনোনয়ন চান। মনোনয়ন মিললে সংসদ সদস্য হিসেবে জয়ী হয়ে আসার সম্ভাবনা থাকে। জেলা, সিটি করপোরেশন, উপজেলা, ইউপি নির্বাচনে জোটের মনোনয়নে জনপ্রতিনিধিও হওয়ার সুযোগ রয়েছে। ফলে বিএনপি না চাইলেও নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে তাদের সঙ্গে থাকতে হচ্ছে এসব দলকে।
আবার বিএনপির একেবারে ছেড়ে দিতে চায় না দলগুলোকে। তাই প্রকাশ্যে ও পর্দার অন্তরালে নানাভাবে তাদের সহায়তা করতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে নজরুল ইসলাম খানকে। সংগঠিত হওয়া, আন্দোলনে থাকার পরামর্শ তার কাছ থেকেই আসে বলে জোটের একাধিক নেতা জানান।
বিএনপি জোট ভাঙায় কোনো ক্ষোভ রয়েছে কি না এমন প্রশ্ন ছিল বিলুপ্ত ২০ দলীয় জোটের শরিক লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপির) একাংশের মহাসচিব সাহাদাত হোসেন সেলিমের কাছে। তিনি বর্তমানে ১২ দলীয় জোটের অন্যতম নেতা। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘বলা নেই, কওয়া নেই, রাজনৈতিক প্রক্রিয়া না মেনেই গত ডিসেম্বরের ৯ তারিখ আমাদের ডেকে বলে দেওয়া হলো ২০ দলীয় জোট আজ থেকে থাকবে না। এমনটা যে হবে সেটি ২০১৮ সালের পর থেকেই জোটসঙ্গীরা ধারণা করতে পারছিলেন। কিন্তু জোট যে প্রক্রিয়ায় গঠন হয়েছিল ভেঙে দিতেও সেই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে পারত। জোট ভাঙার পেছনে তারা কোনো জোরালো যুক্তিও উপস্থাপন করেনি। ওই ঘোষণা পর জোটের সব শরিকের মধ্যেই চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। কিন্তু তারা সেটি প্রকাশ করছেন না।’
একাধিক শরিক নেতার আক্ষেপ, সারা বছর বিএনপির সঙ্গে থেকে রাজপথে সংগ্রামে থাকেন তারা। অথচ নির্বাচন এলেই বিভিন্ন নামে নতুন জোট তৈরি করে তাদের অবহেলিত রাখা হয়। বিএনপির দুর্দিনে তাদের দেওয়া কর্মসূচিতে অংশ নিতে গিয়ে অনেকে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জোট ভাঙা পর্যন্ত খেলাফত মজলিসের মহাসচিব ড. আহমদ আবদুল কাদের, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) সভাপতি প্রয়াত শফিউল আলম প্রধান, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, ডেমোক্রেটিক লীগের সভাপতি সাইফুদ্দিন আহমেদ মনিসহ কয়েকজন নেতা জেল খেটেছেন। আবার নানা চাপে জোট ত্যাগ করেন ন্যাপ ভাসানী, ইসলামী ঐক্যজোট, এনডিপি, এনপিপি, খেলাফত মজলিসের একাংশের নেতারা।
১২ দলীয় জোটের এক নেতা বলেন, ১৯৯৭ সাল থেকেই জোটের শরিকদের সঙ্গে বিমাতাসুলভ আচরণ করে আসছে। গত একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগমুহূর্তেও জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে ২০ দলীয় জোটকে নিষ্ক্রিয় রাখে বিএনপি। এবারও গণতন্ত্র মঞ্চসহ বিভিন্ন জোটের সঙ্গে যুগপৎ আন্দোলনের কথা বলে দীর্ঘ বছরের জোট বিলুপ্তি করল। বিলুপ্ত করার আগে একবারও জানানোর প্রয়োজন মনে করল না বিএনপি।
১৯৯৯ সালে বিএনপি, হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামী, অবিভক্ত ইসলামী ঐক্যজোট নিয়ে গঠন করা হয় চারদলীয় জোট। ২০০১ সালের নির্বাচনের কিছুদিন আগে এরশাদ চারদলীয় জোট ত্যাগ করেন। জাতীয় পার্টির তৎকালীন মহাসচিব নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে জাতীয় পার্টির একটি অংশ (বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি) রয়ে যায় এ জোটে। ২০০৬ সালে বিএনপি ক্ষমতা ছাড়ার পর চারদলীয় জোটের শরিক জামায়াতে ইসলামী নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার সংগ্রামে ব্যস্ত ছিল। বাতিল হয়ে যায় তাদের নিবন্ধন। আরেক শরিক ইসলামী ঐক্যজোট কয়েকটি ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। পরে চার দলকে সঙ্গে রেখেই ২০১২ সালে গঠিত হয় ১৮ দলীয় জোট। পরে জাতীয় পার্টি (জাফর) এবং বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলকে নিয়ে করা হয় ২০ দলীয় জোট।
একাদশ জাতীয় নির্বাচনের আগে গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ এবং জমিয়তে উলামায়ে ইসলামকে নিয়ে বিএনপি গঠন করে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট। জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ব্যানারেই একাদশ জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয় বিএনপি। এ অভিমানে বাংলাদেশ ন্যাপ, বাংলাদেশ লেবার পার্টি এবং এনডিপির মূল নেতারা জোট ত্যাগ করেন। পরে অবশ্য ত্যাগ করা জোটের একাংশ নেতাদের নিয়ে জোট জিইয়ে রাখে বিএনপি।
