বিনিময় হারে ধরাশায়ী বিএসআরএম গ্রুপ

আপডেট : ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১২:৪০ এএম

বিদেশি মুদ্রা বিশেষ করে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়নের ধাক্কা সামলাতে পারছে না বেসরকারি খাতের কোম্পানিগুলো। যেসব কোম্পানির বিদেশি মুদ্রায় আয় নেই তাদের জন্য সংকট আরও বেশি। কাঁচামাল আমদানিতে এসব কোম্পানিকে বিপুল লোকসান গুনতে হচ্ছে। ডলারের বিপরীতে টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়নের কোপ পড়েছে দেশের ইস্পাত শিল্পের পথিকৃৎ কোম্পানি বিএসআরএম গ্রুপে। বিনিময় হারে অস্বাভাবিক ব্যয়ের কারণে গ্রুপটির প্রধান দুই কোম্পানির একটি বড় লোকসানে পড়েছে। আর অন্যটি সামান্য মুনাফা নিয়ে কোনো রকমে টিকে আছে।

চলতি ২০২২-২৩ হিসাব বছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) অনিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বিএসআরএম গ্রুপের তালিকাভুক্ত দুই কোম্পানির মধ্যে সবচেয়ে বেশি আয় আসা বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেড চলতি প্রথমার্ধে ১১০ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। গ্রুপটির তালিকাভুক্ত অপর কোম্পানি বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড এ সময়ে মাত্র ৯ কোটি টাকা নিট মুনাফা করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৯৫ দশমিক ৫ শতাংশ কম। যদিও চলতি প্রথমার্ধে দুই কোম্পানিরই পণ্য বিক্রি থেকে আয় বেড়েছে। তবে কাঁচামালের উচ্চমূল্যের কারণে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারে ব্যাপক লোকসানের কারণে নিট মুনাফায় ধস নেমেছে।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি প্রথমার্ধে বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস লিমিটেডের পণ্য বিক্রি থেকে আয় হয়েছে ৪ হাজার ৩৬৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৬ শতাংশ বেশি। তবে আয় বাড়লেও উচ্চমূল্যের কাঁচামালের কারণে উৎপাদন ব্যয় আগের চেয়ে বেড়েছে। ২০২১-২২ হিসাব বছরে কোম্পানির উৎপাদন ব্যয় ছিল মোট আয়ের ৯০ দশমিক ৭৪ শতাংশ, যা চলতি প্রথমার্ধে ৯৪ দশমিক ৫২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। জ¦ালানি তেলের দাম বাড়ায় এ সময়ে কোম্পানির বিক্রি ও বিতরণ ব্যয়ও বেড়েছে। একই হারে বেড়েছে প্রশাসনিক ব্যয়ও। ফলে পরিচালন মুনাফা এক বছরের ব্যবধানে প্রায় ৪০ শতাংশ কমে গেছে।

তবে উচ্চ কাঁচামাল ব্যয় ও অন্যান্য খরচের পরও কোম্পানির মুনাফায় সবচেয়ে বেশি নেতিবাচক প্রভাব রেখেছে বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হার। চলতি প্রথমার্ধে বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলসের আর্থিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২২৫ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যা প্রায় ৮০ শতাংশই হয়েছে বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারের লোকসান থেকে। গত বছরের একই সময়ে আর্থিক ব্যয় ছিল মাত্র ৫ কোটি টাকা। ডলারের বিপরীতে টাকার ব্যাপক অবমূল্যায়নের কারণে আর্থিক ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বাড়ায় কোম্পানিটি ৫৯ কোটি টাকার করপূর্ববর্তী লোকসানে পড়েছে। কর পরিশোধের পর কোম্পানির সমন্বিত নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১১০ কোটি টাকা, যেখানে ২৪২ কোটি টাকা নিট মুনাফা হয়েছিল।

এ বিষয়ে বিএসআরএম গ্রুপের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক তপন সেনগুপ্ত দেশ রূপান্তরকে বলেন, আমাদের কাঁচামালের পুরোটাই আমদানি করে আনতে হয়। কাঁচামালের দাম বাড়ায় এমনিতেই উৎপাদন ব্যয় বেড়ে গেছে। কিন্তু পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে দাম পুরোপুরি সমন্বয় সম্ভব হয়নি। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়নের কারণে আর্থিক ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। এটিই লোকসানে যাওয়ার প্রধান কারণ। ডলারের সংকট এখনো শেষ হয়নি। পণ্য আমদানি করতে গিয়ে ডলারের সংকট দেখা দিচ্ছে। ব্যাংকগুলো আমাদের ডলার সংগ্রহ দিতে বলছে। কিন্তু এ সময়ে এটি খুবই কঠিন।

এদিকে বাংলাদেশ স্টিল রি-রোলিং মিলস লোকসানে পড়লেও কর পরিশোধের পরিমাণ কিছুটা কম থাকায় নামমাত্র মুনাফায় রয়েছে একই গ্রুপের বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেড। চলতি প্রথমার্ধে কোম্পানিটির নিট মুনাফা হয়েছে ৯ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে নিট মুনাফা ছিল ২০০ কোটি টাকা। পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি প্রথমার্ধে পণ্য বিক্রি থেকে বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেডের আয় হয়েছে ৩ হাজার ৭০২ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ২৮ শতাংশ বেশি। এ সময়ে কোম্পানির উৎপাদন ব্যয় ৮৭ দশমিক ৮ থেকে ৯২ দশমিক ৮ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এ সময়ে বিক্রি, বিতরণ ও প্রশাসনিক ব্যয়ও বেড়েছে। ফলে পরিচালন আয় আগের বছরের তুলনায় প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। চলতি প্রথমার্ধে কোম্পানির পরিচালন আয় হয়েছে ২০৩ কোটি টাকা, যেখানে আগের বছরের একই সময়ে ছিল ২৯৫ কোটি টাকা।

চলতি প্রথমার্ধে বিদেশি মুদ্রার বিনিময় হারের লোকসান ও ঋণের সুদ ব্যয় বাবদ বিএসআরএম স্টিলস লিমিটেডের মোট আর্থিক ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৮৭ কোটি ৭৭ লাখ টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ে ছিল ৩৫ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। মুনাফায় কর্মীর হিস্যা ও কর পরিশোধের পর নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি টাকা, যা আগের বছরের একই সময়ের চেয়ে ৯৫ শতাংশ কম।         

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত