ক্ষমতা নিরঙ্কুশে বিধির পথে ইসি

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৬:৪৫ এএম

আগামী দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে ক্ষমতা আরও পাকাপোক্ত করতে চায় নির্বাচন কমিশন (ইসি)। নির্বাচনকালীন সরকারের সময় অনেক ক্ষমতা কমিশনের হাতে থাকলেও বদলি/পদায়নের নির্দেশ বাস্তবায়নে ধীরগতি অনুসরণ করা হয়। ফলে বদলি/পদায়ন যখন নির্দেশ দেওয়া হবে কার্যকরও তখন থেকেই চায় কমিশন। এর জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের প্রয়োজন পড়বে না। অর্থাৎ বদলি/পদায়নের ক্ষমতা ইসির হাতে চায় কমিশন। এ জন্য সংবিধানের ১২৬ ধারার আলোকে একটি বিধি করার প্রয়েজনীয়তা মনে করছে সাংবিধানিক এ প্রতিষ্ঠান।

এদিকে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন চলতি বছর ২৪ ডিসেম্বর করতে চায় নির্বাচন কমিশন। একটি ঘরোয়া আলোচনায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এমন ইচ্ছার কথা বলেছেন, এমন তথ্য দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছে সরকারি দলের একটি সূত্র যার সঙ্গে কমিশনের কাজের সম্পর্ক রয়েছে।

বিধি প্রণয়নের প্রাথমিক কাজ শুরু : সংবিধানের ১২৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব পালনে সহায়তা করা সকল নির্বাহী কর্তৃপক্ষের কর্তব্য হইবে।’ এ ধারায় পুরোপুরি ক্ষমতা প্রয়োগে কিছুটা দুর্বলতা দেখছে কমিশন। তাই বিধি করার প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে নির্বাচন কমিশন। এ ধরনের বিধির ব্যাপারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্যান্য কর্মকর্তা প্রয়োজনীয় আলোচনা করে ইতিমধ্যে একমত হয়েছে। কমিশনের একটি দায়িত্বশীল সূত্র দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়েছে।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) সাখাওয়াত হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি বিধি করার পক্ষে না। ইলেকশন কমিশনকে সব ধরনের ক্ষমতা দেওয়াই আছে। এখন সেই অনুযায়ী বাস্তবায়ন করতে না পারলে বিধি করেও পারবে না। যদি তাদের আদেশ কেউ পালন না করে তাদের উচিত হবে নির্বাচন স্থগিত করে দেওয়া। এমন দু-একটি নজির স্থাপন করতে পারলে সবাই সবকিছু মানবে। এ ব্যাপারে এখনই কিছু বলতে না যাওয়াই ভালো। এমন কিছু হলে... দেখা যাক।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিধি চাইলে নির্বাচন কমিশন করতে পারে। আমার প্রশ্ন হলো বিধি করার প্রয়োজন কোথায়। সংবিধান কমিশনকে অনেক ক্ষমতা দিয়েছে। সেটাই যথেষ্ট মনে করি আমি। ভোটের সময় ইসির কোনো নির্দেশ পালন না হলে সেখানে নির্বাচন বন্ধ করে দেবে তারা। তাহলেই সবাই সবকিছু মানবে। এখানে বিধি কেন? এখনকার ক্ষমতার বাস্তবায়ন করা সম্ভব না হলে বিধি করেও বাস্তবায়ন করা যাবে না। সিইসিকে আইন বোঝানোর দরকার নেই, তিনি এগুলো সব বোঝেন।’

সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও সাবেক আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সময়ের প্রয়োজনে বিধিবিধান হয়েছে। হয়, হচ্ছে ও ভবিষ্যতেও হবে। কিন্তু কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়ে বিধি/বিধান প্রণয়ন অগণতান্ত্রিক। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিকও।’

কমিশন সূত্র জানায়, নির্বাচনের সময় বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে বদলি/পদায়ন এসব তাৎক্ষণিকভাবে করার প্রয়োজনীয়তা থাকে। নির্বাচনকালে এ ধরনের কোনো আদেশ করা হলে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বাস্তবায়ন করতে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। তাই এ ধরনের আদেশ যাতে তাৎক্ষণিক বাস্তবায়ন করা যায়, তাই এ ধরনের বিধি করে ক্ষমতা কমিশনের কাছে রাখার ব্যাপারে সরকারের কাছে পরামর্শ রাখবে নির্বাচন কমিশন। নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, নতুন নির্বাচন কমিশন দায়িত্ব নেওয়ার পর গাইবান্ধাসহ একাধিক উপনির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়েছে। করতে হয়েছে সিটি করপোরেশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ আরও কয়েকটি নির্বাচন। এসব নির্বাচন করার মধ্য দিয়ে অভিজ্ঞতা ও সৃষ্ট জটিলতা থেকে শিক্ষা নিয়ে কমিশন নির্বাচনকালীন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিজের হাতে রাখতে এ ধরনের একটি বিধির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছে।

কমিশনের ওই সূত্র আরও দাবি করে, সম্প্রতি কিছু আইনি জটিলতা নিয়ে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চিঠি চালাচালিসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যোগাযোগ করা হয়। তাতে কাক্সিক্ষত ও দ্রুত সময়ে সুফল আশা করলেও নির্বাচন কমিশন তা পায়নি। এ বিষয়টিও বিধি প্রণয়নে কমিশনকে উৎসাহিত করেছে।

নির্বাচন কমিশনের অন্য একটি সূত্র দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংবিধান ও বর্তমান আইন অনুযায়ী জাতীয় নির্বাচনের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত নির্বাহী কোনো ক্ষমতা সরকারের হাতে থাকবে না। নির্বাচনকালীন সরকার শুধু রুটিন কাজ করবে। সব ক্ষমতা কমিশনের কাছে ন্যস্ত থাকে। নির্বাচন কমিশন সব বিষয়ে অগ্রাধিকার পায় না। পুলিশের একজন ওসি বা পুলিশ সুপারকে (এসপি) বদল করতে নির্বাচন কমিশন নির্দেশ দিলেও প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে গিয়ে তাৎক্ষণিক বাস্তবায়ন সম্ভব হয়ে ওঠে না। তাতে ভাবমূর্তি নষ্ট হয় কমিশনের। তাই ভাবমূর্তির প্রশ্নেও কমিশন বিধি করে নিতে উৎসাহিত বোধ করছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সংবিধানের ১২৬ ধারার আলোকে বিধি করে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ইসির হাতে নিতে পর্যালোচনা ও প্রস্তাব প্রায় ঠিক করে ফেলেছে কমিশন। বাকিটুকু সরকারের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত করার অপেক্ষা। তবে এ ব্যাপারে রাজনৈতিক আলোচনারও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।

ক্ষমতাসীন দলের গুরুত্বপূর্ণ এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, নির্বাচন কমিশন ও সরকারের মধ্যে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা শুরু হয়েছে। গাইবান্ধা উপনির্বাচন থেকে এ ভুল বোঝাবুঝির সূত্রপাত। পরবর্তী সময় এ ভুল বোঝাবুঝি কমানো সম্ভব হয়নি। নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে পরোক্ষভাবে সম্পর্ক থাকা ওই নেতা আরও বলেন, আগামী নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগ থেকে ২০২৪ সালে নির্বাচন হবে বলে যে বক্তব্য দেওয়া হচ্ছে সেটিও ভুল বোঝাবুঝির আরেকটা কারণ। কমিশন দাবি করে, নির্বাচন কখন কবে হবে সেটা ঘোষণা করার এখতিয়ার কমিশনের। তাই সরকারি দলের বক্তব্য কমিশনকে বিব্রত করে তুলেছে। আওয়ামী লীগের ওই নেতা আরও বলেন, আওয়ামী লীগের সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের ভুল বোঝাবুঝির বিষয়টি সমাধান ভীষণ জরুরি। তা না হলে অনভিপ্রেত এ ধরনের ঘটনা আরও ঘটতে পারে।

এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা হয় দেশ রূপান্তরের। নির্বাচন কমিশনের আলাদা বিধি করার প্রয়োজনীয়তা দেখছে না তারা। আওয়ামী লীগের ওই নেতারা আরও বলেন, সংবিধানের ১২৬ ধারায় নির্বাহী সব ক্ষমতা ইসির হাতে দেওয়াই আছে। ত্বরিত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য আলাদা বিধিবিধানের প্রয়োজন নেই। ক্ষমতাসীন দলের ওই নেতারা আরও বলেন, নির্বাচন তাদের খসড়া প্রস্তাব তুলে ধরুক। তখন ভালোমন্দ বুঝে সরাকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

নির্বাচন ২৪ ডিসম্বের করার ভাবনা : আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কখন করবে এ নিয়ে ভিন্ন ভাবনা ভাবছে নির্বাচন কমিশন। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা ২০২৩ সালের শেষের দিকে অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে নির্বাচন হতে পারে এমন সম্ভাব্যতার কথা জানিয়ে আসছেন বারবার। জোড় সালে নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য সুফল এনে দেয় এমন একটি ‘মিথ’ রয়েছে। সে কারণে আগামী বছর জাতীয় নির্বাচন হবে ধরে নিয়ে তিনি এমন কথা বলছেন। দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন যাতে জোড় সালে অনুষ্ঠিত হয় সেটা নিশ্চিত করার জন্য আওয়ামী লীগ একাদশ সংসদের অধিবেশন একটু দেরিতে ৩০ জানুয়ারি শুরু করেছিল। অর্থাৎ ২৪ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত বর্তমান সংসদের মেয়াদ রয়েছে।

কিন্তু ২০২৩ সালের ডিসেম্বরেই নির্বাচন করার ব্যাপারে আগ্রহী। কমিশন ঘোষিত নির্বাচনী রোডম্যাপে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শেষের দিকে অথবা আগামী বছরের শুরুতে নির্বাচন হবে।

দায়িত্বশীল একটি সূত্র দাবি করেছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল গত মঙ্গলবার একটি ঘরোয়া আলোচনায় বলেছেন, চলতি বছর ২৪ ডিসেম্বর দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন করার কথা ভাবছে কমিশন। ওই আলোচনায় কমিশনের আরেক কর্মকর্তা অনেকটা মজার ছলে বলেছেন তাহলেও হবে, চব্বিশ তো থাকবেই। সরকার জাতীয় নির্বাচন চায় ২০২৪ সালে। কমিশন ২৪ ডিসেম্বর নির্বাচন করতে আগ্রহী। সেই চব্বিশই থাকল।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত