উড়াল শেষে পাতাল জয়ে

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৬:৪৭ এএম

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের উদ্বোধন করেছেন। উত্তরা দিয়াবাড়ী থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত উড়াল মেট্রোরেল উদ্বোধনের এক মাসের মাথায় দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল নির্মাণকাজেরও উদ্বোধন করলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের পূর্বাচল ৪ নম্বর সেক্টরে ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-১ নির্মাণকাজের উদ্বোধনী ফলক উন্মোচন করেন।

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলাম, বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী, বাংলাদেশে জাপানের রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরি, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এ বি এম আমিন উল্লাহ নূরী এবং ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমটিসিএল) এম এ এন সিদ্দিক প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন। খবর বাসস।

শেখ হাসিনা এর আগে গত ২৮ ডিসেম্বর রাজধানীর দিয়াবাড়ীতে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে দিয়াবাড়ী (উত্তরা উত্তর স্টেশন) থেকে আগারগাঁও পর্যন্ত মেট্রো রেল প্রকল্পের ম্যাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন-৬ এর ১১ দশমিক ৭৩ কিলোমিটার অংশের উদ্বোধন করেন।

প্রকল্প সূত্র জানায়, সরকার ২০২৬ সালের মধ্যে আনুমানিক ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ৪৩ লাখ টাকা ব্যয়ে বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর এবং পূর্বাচল থেকে নতুন বাজার পর্যন্ত মাটির নিচ দিয়ে এবং এলিভেটেড উভয় সুবিধা সংবলিত ৩১ দশমিক ২৪২ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-১ নির্মাণ করবে। ২০৩০ সাল নাগাদ রাজধানী ঢাকায় মোট ছয়টি মেট্রোরেল রুট উদ্বোধন করা হবে এবং ডিএমটিসিএল এই মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করবে।

প্রকল্পের বিবরণ অনুযায়ী, এমআরটি লাইন-১-এর দুটি অংশ থাকবে একটি হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত (বিমানবন্দর রুট) ১৯ দশমিক ৮৭২ কিলোমিটার অংশ। এটি হবে ভূগর্ভস্থ এবং এতে ১২টি স্টেশন থাকবে। অপর অংশটি নতুন বাজার থেকে প্রায় ১১ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার এলিভেটেড লাইনসহ পূর্বাচল পর্যন্ত (পূর্বাচল রুট)। এতে সাতটি স্টেশন থাকবে। অন্যদিকে বিমানবন্দর রুটের অংশ হিসেবে নতুন বাজার এবং নদ্দা স্টেশন হবে ভূগর্ভস্থ।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশ সরকার ও উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জাইকা) এমআরটি লাইন-১-এর নির্মাণকাজের ব্যয়ভার বহন করবে। জাইকা প্রকল্প সহায়তা (পিএ) হিসাবে দেবে ৩৯ হাজার ৪৫০ কোটি ৩২ লাখ টাকা এবং বাংলাদেশ সরকার দেবে ১৩ হাজার ১১১ কোটি ১১ লাখ টাকা। জাপানি ফার্মের নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়াম বিমানবন্দর-কমলাপুর-পূর্বাচল মেট্রো লাইন নির্মাণকাজ তদারকি করবে।

প্রকল্পের বিবরণ অনুযায়ী, এমআরটি লাইন-১-এ ১২টি ভূগর্ভস্থ স্টেশনে বিরতিসহ বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর ভ্রমণ করতে লাগবে ২৪ মিনিট ৩০ সেকেন্ড এবং  সাতটি  বিরতিসহ নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল যেতে সময় লাগবে ২০ মিনিট ৩৫ সেকেন্ড। যাত্রীরা নতুন বাজার ইন্টারচেঞ্জের মাধ্যমে ১৬টি স্টেশনে বিরতিসহ মাত্র ৪০ মিনিটের মধ্যে কমলাপুর থেকে পূর্বাচলে যেতে পারবেন। এমআরটি লাইন-১ চালু হলে, এ রুটে প্রতিদিন ৮ লাখ যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন। নতুন বাজার স্টেশনে এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর রুট) দিয়ে একটি ইন্টারচেঞ্জ সুবিধা থাকবে। যেখান থেকে যাত্রীদের জন্য পূর্বাচল থেকে বিমানবন্দর রুটে অথবা পূর্বাচল রুট থেকে বিমানবন্দরে যেতে পারবেন। এর আগে ২০১৯ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) এমআরটি লাইন-১ প্রকল্প অনুমোদন দেয়।

জনগণ সঙ্গে আছে আন্দোলনে লাভ হবে না : প্রধানমন্ত্রী

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, দেশের জনগণ যতদিন আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে আছে, ততদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করে কেউ সরকারের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা আস্থা রাখতে পারেন যে জনগণ আমাদের সঙ্গে আছে। কারণ আমরা জনগণের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছি। কাজেই জনগণ যতক্ষণ আমাদের সঙ্গে থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আন্দোলন-সংগ্রাম করে কেউ কিছু করতে পারবে না।’ গতকাল মেট্রোরেল এমআরটি লাইন-১-এর নির্মাণকাজের উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত সমাবেশে প্রধান অতিথির ভাষণে এসব কথা বলেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পাতাল রেলের নির্মাণকাজের উদ্বোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় আরেকটি মাইলফলক স্থাপিত হলো এবং পাতাল রেলে বাংলাদেশের নবযাত্রা শুরু হলো। এর আগে মেট্রোরেল উপহার দিয়েছি। সেটি ওপর দিয়ে যাবে। এবার মাটির নিচ দিয়ে যাবে পাতাল রেল। বাংলাদেশে এ ধরনের আয়োজন প্রথম।’

সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন। অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী বীরপ্রতীক; বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইওয়ামা কিমিনোরি এবং বাংলাদেশে জাইকার চিফ রিপ্রেজেন্টেটিভ ইচিগুছি তোমোহাইড। সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব এবিএম আমিন উল্লাহ নূরী অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন এবং ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) ব্যবস্থাপনা পরিচালক এমএএন সিদ্দিক প্রকল্প পরিচিতি তুলে ধরেন। অনুষ্ঠানে এমআরটি লাইন-১-এর ওপর একটি ভিডিওচিত্র এবং প্রকল্পের ওপর এটুআই নির্মিত একটি ‘থিম সং’ পরিবেশিত হয়।

পাতাল রেলের নির্মাণকাজ করার সময় জনগণের চলাচলে কোনো সমস্যা হবে না জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মাটির নিচে শব্দহীন বোরিং মেশিন দিয়ে গর্ত করে টানেল করা হবে। ভূপৃষ্ঠের ১০ মিটার নিচে কাজ করা হবে। তাই ওপর থেকে বোঝা যাবে না যে মাটির নিচে কাজ চলছে। প্রকল্পটি আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারে পরিবেশবান্ধব হবে এবং জনগণের যেন কোনো অসুবিধা না হয় নির্মাণকাজে সেটিরও খেয়াল রাখা হবে।

রাজধানীতে ছয়টি মেট্রোরেল হবে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, এ লাইনগুলো করার জন্য বিভিন্ন পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সেই সঙ্গে ফিজিবিলিটি স্টাডিও শুরু হয়েছে। নারায়ণগঞ্জ শহরে তিনটি মেট্রোরেল লাইন করার পরিকল্পনা রয়েছে।

বক্তব্যের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা হলি আর্টিজান জঙ্গি হামলায় নিহত মেট্রোরেলের কাজে যুক্ত সাত জাপানি পরামর্শককে বিশেষভাবে স্মরণ করেন। ওই ঘটনার পরও জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত শিনজো আবে ও দেশটির বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের প্রতি সহযোগিতা অব্যাহত রাখায় তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান শেখ হাসিনা।

পাতাল রেলে জীবনযাত্রার মান বাড়ার আশা : গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পূর্বাচল পাতাল মেট্রোরেলের ডিপো উদ্বোধন করতে আসায় রূপগঞ্জে উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়। সরকারপ্রধান ও আওয়ামী লীগ সভাপতিকে বরণ করে নিতে প্রস্তুত ছিল রূপগঞ্জবাসী। আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে দেখা দিয়েছিল আনন্দ-উল্লাস। ৩০০ ফুট ও এশিয়ান বাইপাস সড়ক ছেয়ে গিয়েছিল ছবিসহ বিভিন্ন ব্যানার-ফেস্টুনে। প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে আগে থেকেই উপজেলা আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীসহ সমর্থকরা প্রতিটি ইউনিয়ন, পৌরসভা, ওয়ার্ডে সভা-সমাবেশ এবং ব্যানার, ফেস্টুন ও পোস্টার লাগিয়ে প্রচার চালিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীর আগমনে বহু নেতাকর্মী বুধবার গভীর রাত থেকেই পূর্বাচলের ৪ নম্বর সেক্টরের সভাস্থলে গিয়ে হাজির হন। চারদিকে যেন উৎসবমুখর পরিবেশ বিরাজ করছিল। গতকাল ভোরের আলো ফুটতেই নেতাকর্মীরা সভাবেশস্থলে জড়ো হতে থাকেন। চারদিক থেকে নেতাকর্মীরা সমাবেশস্থলে আসার কারণে এশিয়ান বাইপাস ও ৩০০ ফুট সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এতে করে ভোগান্তিতে পড়তে হয় নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষকে। সকাল থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আগমন উপলক্ষে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানাতে বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহানের পক্ষে হাজারো নেতাকর্মী বড় বড় মিছিল নিয়ে সভাস্থলে উপস্থিত হন। এর আগে গত মঙ্গলবার বসুন্ধরা কনভেনশন সেন্টারে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন বসুন্ধরা গ্রুপের চেয়ারম্যান আহমেদ আকবর সোবহান। মতবিনিময় সভাটি জনসভায় রূপ নেয়।

এদিকে রূপগঞ্জে দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেলের নির্মাণকাজের উদ্বোধন হওয়ায় উচ্ছ্বসিত উপজেলাবাসী। এ প্রকল্পের কারণে রূপগঞ্জ উপজেলা দেশের মাঝে অনন্য উচ্চতায় চলে যাবে বলে মনে করছেন তারা। পাতাল মেট্রোরেল নিয়ে রূপগঞ্জবাসী বলছে, ছোট-বড় শিল্পকারখানা ও পূর্বাচল উপশহরের কারণে রূপগঞ্জ উপজেলা সারা দেশে আগে থেকেই পরিচিত ছিল। এর সঙ্গে যোগ হলো দেশের প্রথম পাতাল মেট্রোরেল। এতে এ উপজেলার মানুষের জীবনযাত্রার মান অনেক বেড়ে যাবে। বেড়ে যাবে জমির মূল্য। রংধনু গ্রুপের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা আলহাজ রফিকুল ইসলাম রফিক বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত ছিল রূপগঞ্জবাসী। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশকে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। পাতাল মেট্রোরেল উদ্বোধনের মাধ্যমে বাংলাদেশ এক নতুন যুগে প্রবেশ করল।’

রূপগঞ্জ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান ভূঁইয়া বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ রূপগঞ্জে পাতাল মেট্রোরেলের ডিপো করার জন্য। এ পাতাল মেট্রোরেলের সুফল রূপগঞ্জবাসী খুব ভালো করে পাবে। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে মেট্রোরেলের পর এবার দেশে পাতাল মেট্রোরেল চালু হচ্ছে, যেটি অনেক আনন্দের ব্যাপার আমাদের কাছে। পাতাল মেট্রোরেলের কাজ শেষ হলে যানজটের শহর ঢাকা জাদুর শহরের পরিণত হবে বলে আমি মনে করি।’

প্রতিবেদনটিতে তথ্য দিয়েছেন রূপগঞ্জ প্রতিনিধি আতাউর রহমান সানী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত