চুক্তিতে বিমানবন্দর পার

আপডেট : ০৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ০৭:০০ এএম

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে জাল বিস্তারকারী মানব পাচারকারী চক্রে জড়িয়ে পড়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কিছু অসাধু কর্মচারী। তারা ভুক্তভোগীদের ভ্রমণ ভিসায় নির্বিঘে্ন বিমানবন্দর পার করে দেওয়ার কাজে সহায়তা করছে। এর জন্য জনপ্রতি নিচ্ছে ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। এসব টাকার ভাগ বিমানবন্দরের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিভাগের অনেকেই ভাগ পাচ্ছে।

এ চক্রে সরাসরি জড়িত রয়েছে বেবিচকের বেশ কয়েকজন নিরাপত্তা প্রহরী। তারা ইতিমধ্যে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারিতে রয়েছে। এছাড়া বিমানবন্দরে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া কর্মীরাও জড়িত রয়েছে মানব পাচার চক্রে।

মানব পাচার নিয়ে কাজ করতে গিয়ে পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে এসব তথ্য। তদন্তকারী পুলিশের একাধিক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, যে কেউ চাইলেই ভ্রমণ ভিসায় যে কোনো দেশে যেতে পারেন না। ফলে মানব পাচার চক্রগুলো ভ্রমণ ভিসায় ভুক্তভোগীদের বিভিন্ন দেশে পাঠাতে গেলে বাধার মুখে পড়ে। সেই সব বাধা অতিক্রম করতে চক্রগুলো বিমানবন্দরের কর্মীদের ব্যবহার করছে।

সম্প্রতি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) মানব পাচারে জড়িত থাকার অভিযোগে বেবিচকের এক নিরাপত্তা প্রহরী ও অগ্রগামী ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিস নামের একটি প্রতিষ্ঠানের এক কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে। এ কর্মী আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া।

জানতে চাইলে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (সিরিয়াস ক্রাইম) মো. নজরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘মানব পাচার চক্রে বিমানবন্দরের দুই কর্মীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। তাদের গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। গত দুই বছরে তারা অসংখ্য বাংলাদেশিকে পাচার করেছে বলে স্বীকারও করেছে। এই চক্রের সদস্যরা ইরান, দুবাই, তুরস্ক, আরব আমিরাত, ওমানসহ বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘বিমানবন্দরের সিভিল এভিয়েশন ও আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে কাজ করা বেশ কিছু কর্মীর জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তদন্তের স্বার্থে তাদের নাম প্রকাশ করা যাচ্ছে না।’

এদিকে বিভিন্ন সময় মানব পাচার চক্রের অনেকে গ্রেপ্তার হলেও অধরা থাকছে হোতারা। আবার বিমানবন্দরের নিম্ন পদের কর্মীরা গ্রেপ্তার হলেও ধরা পড়ছে না রাঘব-বোয়ালরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বলছে, চক্রের বেশিরভাগ হোতাই দেশের বাইরে অবস্থান করে মানব পাচার করছে। এমনই একজন আব্দুল হান্নান। দুবাইতে পাচারকারী হিসেবে তাকে সবাই এক নামে চেনে। তার চক্রের নেটওয়ার্ক রয়েছে বিভিন্ন দেশে।

সিআইডির তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সম্প্রতি গ্রেপ্তার হওয়া বেবিচকের নিরাপত্তা প্রহরী লালমনিরহাটের বাসিন্দা মো. জাহাঙ্গীর আলম বাদশা (৪১) মানব পাচার চক্রে জড়িয়েছেন প্রায় দুই বছর। তিনি ভুক্তভোগীদের ভ্রমণ ভিসায় বিমানবন্দর পার করে উড়োজাহাজে ওঠা পর্যন্ত সার্বিক কাজ করে থাকেন। তার সঙ্গে আরও অনেকে জড়িত রয়েছেন।

ভুক্তভোগীদের একজন লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থানাধীন পশ্চিম লতিফপুরের বাসিন্দা মিনহাজুর রহমান ফাহিম। তিনি গ্রিসে যাওয়ার চেষ্টা করে মানব পাচারকারী চক্রের ফাঁদে পা দেন। টাকা খোয়ানোর পাশাপাশি জীবনই হারাতে বসেছিলেন তিনি। তাকেও ভ্রমণ ভিসায় দুবাই পাঠাতে বিমানবন্দর পার করে দিয়েছিল জাহাঙ্গীর।

ফাহিম দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল তিনিসহ চারজনকে ভ্রমণ ভিসায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে দুবাই পাঠায় মানব পাচারকারী একটি চক্র। সে সময় দালাল চক্রটি বিমানবন্দরে গিয়ে এক নিরাপত্তা প্রহরীর কাছে বুঝিয়ে দেয় তাদের। ওই প্রহরীই সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে তাদের বিমানে তুলে দেন। দুবাইতে গিয়ে ছয় থেকে সাত দিন রাখার পর সমুদ্র ও স্থলপথে ইরানে নেওয়া হয় ফাহিমকে। এ সময় বিভিন্ন স্থানে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন চালিয়ে তার পরিবারের কাছ থেকে প্রায় ৬ লাখ টাকা আদায় করে মানব পাচারকারী চক্রটি। নির্যাতনে গুরুতর অসুস্থ হয়ে ফাহিম হাসপাতালেও ভর্তি থাকেন কিছুদিন। এরপর চক্রের হাত থেকে পালিয়ে দেশে ফেরার উদ্দেশ্যে তুরস্ক যান। সেখানে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে জেল খেটে অবশেষে বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায় গত বছরের ২৮ এপ্রিল দেশে ফেরেন তিনি। পরে রাজধানীর বিমানবন্দর থানায় একটি মামলাও করেন ফাহিম।

মামলার এজাহার সূত্রে জানা গেছে, বিদেশ যাওয়ার জন্য ফাহিম গ্রিসে থাকা তার পাশের মো. শাহাদাৎ হোসেনের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। শাহাদাৎ সুনামগঞ্জের আলী হোসেনের সঙ্গে তার যোগাযোগ করিয়ে দেন। আলী হোসেন সাড়ে ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে ফাহিমকে তুরস্ক পর্যন্ত নিতে পারবে বলে জানান। তার মাধ্যমেই দুবাই অবস্থানকারী আব্দুল হান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ হয় ফাহিমের। আব্দুল হান্নানের কথামতো ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল ভ্রমণ ভিসায় দুবাই যান তিনি।

ফাহিমের মতো অসংখ্য ভুক্তভোগী রয়েছেন। তবে তাদের বেশিরভাগই মামলার ঝামেলায় যেতে চান না। এমনকি ফাহিমও প্রথম পর্যায়ে চক্রের ভয়ে মামলা করতে রাজি হচ্ছিলেন না।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, চক্রটি বিদেশগামীদের প্রলোভন দেখিয়ে প্রথমে বাংলাদেশ থেকে দুবাইয়ের শারজাহতে নিয়ে যায়। সেখান থেকে হরমুজ প্রণালী দিয়ে ইরানের বন্দর আব্বাসে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ইরানের সিরাজ এলাকা হয়ে নিয়ে যায় তুরস্কে।  আর সেখান থেকেই গ্রিসে নেওয়ার চেষ্টা চলে।

সিআইডি বলছে, এই মানব পাচার চক্রের প্রধান সুনামগঞ্জের আব্দুল হান্নান। তার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য পেয়েছে সিআইডি। হান্নান দীর্ঘদিন দুবাইতে থেকে মানব পাচার করে আসছেন। তার সহযোগী আব্দুস সালামকে গ্রেপ্তার করলেও তাকে ধরা যাচ্ছে না। এই সালামকে দিয়ে হান্নান বিমানবন্দরের কর্মীদের সঙ্গে চুক্তি করত।

তদন্তকারী কর্মকর্তারা বলছেন, আব্দুস সালাম চক্রের অন্যদের সহায়তায় ভুক্তভোগীদের দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সংগ্রহ করে। তাদের বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে ভ্রমণ ভিসায় অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে দুবাই পাঠায়। দুবাইয়ে নিয়ে মারধর করে কাগজপত্র কেড়ে নিয়ে ইরানের দালাল চক্রের কাছে তুলে দেয়। ইরানের ওই চক্র বাংলাদেশের দালালদের সহযোগিতায় সমুদ্রপথে ভুক্তভোগীদের ইরানে নিয়ে একইভাবে আটকে রেখে মারধর করে এবং দেশে তাদের আত্মীয় স্বজনকে মারধরের ছবি ও ভিডিও দেখিয়ে টাকা দিতে বাধ্য করে। 

আব্দুল হান্নানের আরেক সহযোগী সুনামগঞ্জের আলী হোসেন বর্তমানে গ্রিসে আছেন। দেশে থাকা তার স্ত্রী রশিয়া বেগমের মাধ্যমে টাকা নিতেন হান্নান। রশিয়া বেগমকেও সম্প্রতি গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত