বাগান সম্প্রসারণের নামে পরিবেশ-প্রতিবেশ ধ্বংসের অভিযোগ উঠেছে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের হাতিমারা চা বাগান কর্র্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। বাগানটির গির্জাঘর টিলায় পুরনো ও মূল্যবান প্রায় দুইশ গাছ কেটে ও জঙ্গলে আগুন লাগিয়ে জায়গাটিকে বিরানভূমিতে পরিণত করা হয়েছে। আর শেকড়সহ গাছ তোলার পর তার চিহ্ন মুছে ফেলতে খননযন্ত্র (এক্সাভেটর) দিয়ে গর্তগুলো বন্ধ করা হচ্ছে। বাগান সংশ্লিষ্ট ছাড়া অন্য কেউ যাতে সেখানে ঢুকতে না পারে সেজন্য বাগান কর্র্তৃপক্ষ দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা পাহারাদারও নিয়োগ করেছে।
চুনারুঘাটের রেমা কালেঙ্গা বন বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য। এটি বাংলাদেশের দ্বিতীয় সুন্দরবন বলে পরিচিত। এর পাশেই হাতিমারা চা বাগান। অভিযোগ উঠেছে, গত ১৬ জানুয়ারি থেকে গির্জাঘর টিলার গাছ কাটা শুরু করে জঙ্গলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে সেখানে থাকা হনুমান, বানর, মায়া হরিণ, শূকর, পাখিসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী মারা যায়। এগুলোকে মাটিচাপা দেওয়া হয় বলে জানিয়েছে ওই এলাকার লোকজন।
বাগানটির চা শ্রমিকরা চাকরি হারানোর ভয়ে বন উজাড়ের বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। তবে ঘটনাস্থল থেকে স্থানীয়দের ধারণ করা কিছু ভিডিও ও স্থিরচিত্র দেশ রূপান্তরের হাতে এসেছে। যাতে গাছ কেটে টুকরো করা ও গাছের শেকড় তুলে মেশিন দিয়ে গর্ত ঢেকে দেওয়ার চিত্র রয়েছে। কাটা গাছগুলোর মধ্যে রয়েছে আম, জাম, কাঁঠাল, আমলকী, বয়রা, বট ও সেগুনসহ নানা প্রজাতির বৃক্ষ।
বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, উজাড় করা বনের পাশেই রেমা-কালেঙ্গার বনে বিরল প্রজাতির মালায়ন বড় কাঠবিড়ালির একমাত্র বসবাস। বানর, লজ্জাবতী বানর, কুলু, রেসাস এবং কোবরা, দুধরাজ, দাঁড়াস ও লাউডগা সাপের দেখা মেলে এই অভয়ারণ্যে। এছাড়া ভীমরাজ, টিয়া, হিল ময়না, লাল মাথা কুচকুচি, সিপাহি বুলবুল, বসন্তবাউরি, শকুন, মথুরা, বনমোরগ, পেঁচা, মাছরাঙা, ইগল, চিলসহ নানা জাতের পাখির বাস এই বনে।
এলাকার লোকজন বলছে, বনে আগুন লাগানোর কারণে অনেক পশুপাখি পুড়ে মারা গেছে। আর বেঁচে যাওয়া বানর, হনুমান বাসস্থান হারিয়ে লোকালয়ে ঢুকছে। মরে যাওয়া পশুপাখিকে মাটিচাপা দেওয়া হয়েছে। মনু মিয়া নামে এক ব্যক্তি জানান আগুনে লেজ পুড়ে যাওয়া একটি বানর তার বাড়িতে ঢুকে পড়েছিল। পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর এত আঘাতের পরেও পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ কার্যত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। সর্বশেষ গত সোমবারও দূর থেকে বনের ভেতরে লোকজনকে গাছ কাটতে দেখা গেছে।
পরিবেশ বিনষ্টের অভিযোগ পেয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) একটি প্রতিনিধিদল ওই দিন বিকেলে হাতিমারা চা বাগানে যায়। তাদের বহনকারী গাড়িটি ফটকে দাঁড় করিয়ে রাখার কিছুক্ষণ পর লিটন নামে এক কর্মচারী আসেন। তিনি প্রতিনিধিদলটিকে বাগানের ব্যবস্থাপকের (ম্যানেজার) কাছে নিয়ে যান। ম্যানেজার মঈন উদ্দিন তাদের অফিসে আধা ঘণ্টা বসিয়ে রাখার পর শেষ পর্যন্ত ঘটনাস্থলে (উজাড় করা বনের জায়গা) যেতে দেবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেন। তার দাবি নতুন বাগান তৈরিতে কোনো ধরনের পরিবেশ নষ্ট করা হচ্ছে না। প্রতিনিধিদলের নেতৃবৃন্দ পরিবেশ নষ্টের অভিযোগটি সত্য কি না তা সরেজমিনে দেখতে এসেছেন জানালে ম্যানেজার বলেন, বাগানের জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) এফ এ শাহিনের নিষেধ রয়েছে। এ সময় বাপা’র নির্বাহী কমিটির সদস্য আব্দুল করিম চৌধুরী কিম জেনারেল ম্যানেজারের মোবাইল ফোন নম্বর চেয়ে কথা বলতে চান। কিন্তু ম্যানেজার মঈন তার মোবাইল নম্বর দিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পাশাপাশি তিনি একটি বেসরকারি টেলিভিশনে বাগানের পক্ষে করা (নতুন বাগান সৃজনের মাধ্যমে কথিত উন্নয়ন) সম্প্রতি প্রচারিত প্রতিবেদন বাপার নেতাদের দেখাতে বারবার চেষ্টা করেন।
পরিবেশ প্রকৃতি বিষয়ক সংগঠন মিতা ফাউন্ডেশনের সমন্বয়কারী রবি কাস্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা চা বাগান সম্প্রসারণ হোক তা চাই। তবে গাছ কেটে পরিবেশ নষ্ট করে নয়। যে তিন হেক্টর বাগান সম্প্রসারণ করা হচ্ছে সেই স্থানটিতে মায়া হরিণ বেশি চলাফেরা করে। কারণ সেখানে নানা প্রজাতির মধ্যে আউলা গাছও রয়েছে। আউলা ফল মায়া হরিণের খুব পছন্দের। সম্প্রসারণ এলাকায় ইতিমধ্যে আউলাগাছসহ প্রায় ২শ মূল্যবান গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। বিষয়টি জানাজানি হয়ে যাওয়ায় এখন আমাদেরও সেখানে যেতে দেওয়া হচ্ছে না।’
এ প্রসঙ্গে বাপার হবিগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অপকর্ম ঢাকতে হাতিমারা চা বাগান কর্র্তৃপক্ষ আমাদের সেখানে প্রবেশ করতে দেয়নি। বাধা দেওয়ার ধরন দেখেই বুঝা গেছে তারা পরিবেশ-প্রতিবেশ বিধ্বংসী কর্মযজ্ঞ চালাচ্ছে। এহেন হীন কর্মকাণ্ডে যারা জড়িত তাদের অবিলম্বে আইনের আওতার আনতে হবে।’
পরিবেশ-জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে হাতিমারা চা বাগানের ব্যবস্থাপক মঈন উদ্দিন বলেন, ‘২৫০ হেক্টর নিয়ে এই বাগান। নতুন চা গাছ লাগানোর জন্য লিজের ভূমিতে জঙ্গল সাফ করা হচ্ছে।’
তিনি গাছ কাটা ও বন্য জীবজন্তুর আগুনে মৃত্যুর বিষয়টি অস্বীকার করেন। ওই এলাকায় যেতে বাধা দেওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বাগানের ঊর্ধ্বতন কর্র্তৃপক্ষের নিষেধ থাকার কথা তিনি বলেন।
বন উজাড় রোধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাইলে বন বিভাগের সিলেট বিভাগীয় কর্মকর্তা তৌফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গাছ কাটার অভিযোগ শুনে সেখানে কালেঙ্গা রেঞ্জের কর্মকর্তা খলিলুর রহমানকে পাঠিয়েছিলাম। তিনি সেখানে পরিদর্শন করে অভিযোগ সঠিক নয় বলে জানিয়েছেন।’ যদিও একটি বেসরকারি টেলিভিশনে প্রচারিত প্রতিবেদনে খলিলুর রহমানকে চা বাগান কর্র্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে গাছ কাটার অভিযোগ করতে দেখা গেছে।
আর বিভাগীয় বন কর্মকর্তা তৌফিকুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুনামগঞ্জের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মাহমুদুল হককে তদন্ত করে রিপোর্ট দেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। জেলা প্রশাসন চা বাগানকে জমি লিজ দিয়েছে, তাদের পক্ষ থেকেও তদন্ত করা দরকার।’
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান বলেন, ‘চুনারুঘাট উপজেলার এসিল্যান্ডকে ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছিলাম। তিনি প্রাথমিকভাবে যে তথ্য দিয়েছেন তা দিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না। এখন একজন এডিসিকে দিয়ে পাঁচ সদস্যের একটি টেকনিক্যাল কমিটি করে দেব। তাদের প্রতিবেদন পাওয়ার পর পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রাকৃতিক পরিবেশ যাতে নষ্ট না করা হয় সে ব্যাপারে বাগান কর্র্তৃপক্ষকে আগেই বলা হয়েছে।’
