ভারতের রাজনীতি সিনেমা ডকুমেন্টারি

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১০:২৪ পিএম

টানা দ্বিতীয়বারের মতো ভারত শাসনের পর তৃতীয়বার ক্ষমতায় যেতে মরিয়া হিন্দু জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক দল ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। নিজেদের রাজনৈতিক স্ট্র্যাডেজি, আত্মবিশ্বাস ও দুর্বল বিরোধী দল তাদের ক্ষমতায় আসতে রসদ জোগাচ্ছে। বিজেপির ভোট ব্যাংক কট্টরপন্থি হিন্দুরা, বিশেষ করে হিন্দুদের তীর্থভূমি উত্তর প্রদেশে দলটি এখন নিরঙ্কুশ রাজত্ব করছে। উত্তর প্রদেশসহ সারা ভারতের হিন্দুরা নানা গোত্র, বর্ণ ও জাতে বিভক্ত। কভিড-১৯, বৈশ্বিক অস্থিরতায় বেকারত্ব ও মুদ্রাস্ফীতি হানা দিয়েছে ভারতের অর্থনীতিতেও। এসব অনৈক্য ও অস্থিরতা থেকে সমর্থকদের দৃষ্টি সরাতে ভারতে ছোটখাটো ইস্যুতে রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি করা হচ্ছে প্রায়শই।

কাশ্মীরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে বানানো সিনেমা ‘দ্য কাশ্মীর ফাইলস’ নিয়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছে ভারতজুড়ে। অভিযোগ আছে সিনেমাটিতে কাশ্মীর সংঘাতকে একাধিক দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে একপাক্ষিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়েছে। বিজেপি এই সিনেমা দেখতে রীতিমতো ছুটি ঘোষণা দিয়েছে। বিরোধীরা অভিযোগ করছেন, এই সিনেমা ভারতের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করে মুসলিম বিদ্বেষ তৈরি করেছে।

কাশ্মীর ফাইলসের পরে এলো আমির খান অভিনীত ‘লাল সিং চাড্ডা’ সিনেমাটি। মুসলিম সারনেম ধারণকারী আমির খান এর আগে বহুবার বিজেপির আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হয়েছিলেন। কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ৩৭০ ধারা বাতিল ইস্যুতে ভারত-তুরস্ক সম্পর্ক যখন তলানিতে সে সময়ে লকডাউনে তুরস্কে আটকেপড়া আমির খানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন তার্কি ফার্স্টলেডি। সে সময় ‘দেশদ্রোহী’ ট্যাগ পেতে হয় আমির খানকে। চলচিত্র দর্শকদের মতে, তার লাল সিং চাড্ডার মূল গল্প ১৯৮৪ সালের শিখ দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে। এছাড়া সিনেমায় মুম্বাইয়ে বোমা বিস্ফোরণ, বাবরি মসজিদ ধ্বংস দেখানো হয়। সিনেমাটি রিলিজের পর বয়কট ক্যাম্পেইন শুরু করেন বিজেপি সমর্থকরা। পাকিস্তানি খেলোয়াড়ের সঙ্গে আমির খানের ছবি, তার মায়ের হজপালনের ছবি নিয়ে দেশদ্রোহী আখ্যা দিয়ে রাস্তায় নেমে পড়েন বিজেপি সমর্থকরা। অবশেষে সিনেমাটি ফ্লপ হয়, যদিওবা নেটফ্লিক্সের কল্যাণে সাইবার স্পেসে বাজিমাত করে ‘লাল সিং চাড্ডা’।

আমির খানের ব্যর্থতার মধ্যেই শাহরুখ নিয়ে আসেন ‘পাঠান’ সিনেমা। শাহরুখ খানের ‘খান’ নাম পূর্বে বিদেশের এয়ারপোর্টে তার জন্য বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করলেও এবার নিজ দেশে পড়েন বয়কট ক্যাম্পেইনের মুখে। অভিযোগ আনা হয় তার সিনেমার অভিনেত্রী গেরুয়া (হিন্দুদের পবিত্র রং) রঙের স্বল্প পোশাক পরে হিন্দু ধর্মের অবমাননা করেছেন।

তবে পাঠান নিয়ে মূল আপত্তি শাহরুখ খানকে নিয়ে। বিশ্বব্যাপী শাহরুখ খানের ব্রান্ডিং বিজেপির পলিসির সঙ্গে যায় না। বিজেপির অন্যতম প্রভাবশালী নেতা যোগী আদিত্যনাথ বলেছেন, তারা চায় না তাজমহল দিয়ে ভারতের ব্রান্ডিং হোক, তারা চান ভারতের ব্রান্ডিং হোক রামায়ণ, গীতা দিয়ে। মুসলিম নামের দুজন অভিনেতা একটি সিনেমার গল্পে ভারতকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে রক্ষা করবে আর সে সিনেমা নিয়ে ভারতের তারুণ্য উন্মাদ হবে সেটা বিজেপির পছন্দ না হওয়ারই কথা। কিন্তু আমির খানকে দমানো গেলেও শাহরুখের পাঠান সিনেমার বয়কট ধোপে টিকেনি।

সিনেমা নিয়ে ভারতের রাজনীতির এই প্লটে যুক্ত হয়েছে নতুন বিতর্ক বিবিসির ডকুমেন্টরি ‘দ্য মোদি কোয়েশ্চন’। ভারতের প্রধানমন্ত্রীর গুজরাট রাজত্বকাল ও দিল্লি রাজত্বকাল নিয়ে নির্মিত দুই পর্বের এই ডকুমেন্টারি প্রকাশ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইউটিউব ও টুইটার থেকে মুছে দিয়েছে ভারত সরকার। অন্যদিকে বিরোধীরা এই ডকুমেন্টারিকে নিয়েছে বিজেপির ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ হিসেবে। তারা ভিন্ন উপায়ে ভারতের নানা জায়গায় এই ডকুমেন্টারি দেখানোর ব্যবস্থা করেছে। এই নিয়ে দেশজুড়ে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। বিবিসির একটি ডকুমেন্টারিই বর্তমানে ভারতের রাজনীতি মূল আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠেছে।

চলতি বছরে ভারতে হতে যাচ্ছে জি-২০ সম্মেলন। সে সম্মেলনের মধ্য দিয়ে মোদির আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা আরও উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা দলটির। এছাড়া রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের মধ্যস্থতার একটি চেষ্টাও মোদিকে নিয়ে করা হচ্ছে দলটির পক্ষ থেকে, যাতে তিনি অপ্রতিরোধ্য আন্তর্জাতিক ফিগার হয়ে ওঠেন।

দীর্ঘদিন ধরে নরেন্দ্র মোদি দেশ-বিদেশে ঘুরে নিজের যে ইমেজ তৈরি করেছেন তা ডকুমেন্টারিটি প্রশ্নবিদ্ধ করে দেবে বলে আশঙ্কা রয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের উদ্ধৃতি দিয়ে শশী থারুর তার ‘দ্য পারাডক্সিকাল প্রাইম মিনিস্টার’ বইয়ের ৪০০ নম্বর পৃষ্ঠায় উল্লেখ করেছেন ক্ষমতায় আসার প্রথম চার বছরে নরেন্দ্র মোদি ৪১টি ট্রিপসে ৫২টি দেশ ভ্রমণ করেছেন। এশিয়া টাইমসে উদ্ধৃতি দিয়ে শশী থারুর লিখেছেন প্রথম চার বছরের প্রতি তিনদিনের একদিন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি অফিসের বাইরে ছিলেন সেটা বিদেশ ভ্রমণ বা রাজ্য ভ্রমণে। তার এতসব দেশ বিদেশ ভ্রমণ মূলত দীর্ঘ মেয়াদে মোদিকে ভারতের ইতিহাসে স্থায়ী করা ও মোদি মডেলকে জনপ্রিয় করার প্রয়াস থেকে।

২০১৪ এর নির্বাচনের সময় উন্নয়নের ‘গুজরাট মডেল’ ও বাবরি মসজিদ ছিল বড় ট্রাম্প কার্ড বিজেপির। ২০১৯ এর নির্বাচনে ‘নয়া ভারত’ ও কাশ্মীরের ৩৭০ বিশেষ মর্যাদা বাতিলের অঙ্গীকার করে। ২০২৩ সালে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ ৯টি রাজ্যে ভোট অনুষ্ঠিত হবে আর ২০২৪ এর মে’র লোকসভা নির্বাচন ইতিমধ্যে কড়া নাড়ছে দরজায়। ২০২৩-এ অনুষ্ঠিতব্য রাজ্যগুলোতে প্রায় এক-চতুর্থাংশ লোকসভা সিট রয়েছে। এই নির্বাচনে বিজেপির ট্রাম্পকার্ড নরেন্দ্র মোদি ম্যাজিক। বছরজুড়ে ৯ রাজ্যের নির্বাচনে বিজেপির ট্রাম্পকার্ড থাকবে নরেন্দ্র মোদি আর বিরোধীদের ‘দ্য মোদি কোয়েশ্চন’।

লেখক : গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত