নগদ সহায়তা বাড়াতে হবে ছাড় দিতে হবে রাজস্বে

আপডেট : ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৩, ১১:৫৩ পিএম

বৈশ্বিক সংকটের প্রভাব বাংলাদেশেও পড়েছে। ডলার সংকটে এলসি খুলতে না পারায় দেশের শিল্প কাঁচামাল সংকটে পড়েছে। টাকার বড় ধরনের অবমূল্যায়নে অনেক শিল্প লোকসানে পড়েছে। দেশের অর্থনীতির সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে দেশ রূপান্তরের সিনিয়র রিপোর্টার ফারজানা লাবনীর সঙ্গে আলোচনাকালে এসব কথা বলেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআই সভাপতি ও বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন

করোনার আঘাত কাটিয়ে উঠতে না উঠতে বিশ্ব অর্থনীতিতে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এমন পরিস্থিতিতে ব্যবসায়ীদের টিকিয়ে রাখতে হলে নগদ সহায়তা বাড়ানোর পাশাপাশি রাজস্ব ছাড়সহ সব ধরনের নীতি-সহায়তা দিতে হবে বলে অভিমত ব্যক্ত করেছেন মো. জসিম উদ্দিন। 

ব্যবসায়ী এ নেতা বলেন, বিশ্বমন্দার মধ্যেও আমাদের দেশের অর্থনীতি একটু একটু করে এগিয়ে চলেছে। রপ্তানি আয় বাড়ছে। প্রবাসী আয় মোটামুটি হয়েছে। এখন অর্থনীতি গতিশীল রাখতে হলে কোনো একটি খাতের ওপর নির্ভরশীল থাকলে হবে না। তৈরি পোশাক শিল্পসহ শিল্পের প্রায় সব খাতে সমান গুরুত্ব দেওয়ার সময় এসেছে। কোন খাতে কী প্রয়োজন তা চিহ্নিত করতে হবে। প্রয়োজনে এসব খাতের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে হবে। শিল্পের সব খাতের সমস্যার সমাধান করতে এফসিসিআই-এর প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাখতে হবে।

আগামী বাজেট হবে আমাদের টিকে থাকার বাজেট, এমন মত জানিয়ে মো. জসিম উদ্দিন বলেন, ঋণদানকারী সংস্থার যতই সুপারিশ থাকুক না কেন ব্যবসায়ীদের মতামত গুরুত্ব দিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। আগামী বাজেটে কর অবকাশ সুবিধা ও কর অব্যাহতির আওতা বাড়াতে হবে। অর্থ সহায়তা নিতে গিয়ে আমাদের স্বার্থের বিরোধী কিছু করা যাবে না।    

বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান জুগিয়েছেন। অনেকটা শূন্য থেকে গড়ে তুলেছেন একাধিক প্রতিষ্ঠান। বাবাকে হারান মাত্র ১৩ বছর বয়সে। শুধু নিজের জন্য নয়, ব্যবসায়ী সমাজের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন। বাংলাদেশ প্লাস্টিক ও রাবার ফাউন্ডেশনের নেতৃত্ব দিয়েছেন একাধিকবার। বিভিন্ন সামাজিক কাজে নিজেকে জড়িয়েছেন বেঙ্গল গ্রুপের এই কর্ণধার। প্রায় ৩০ বছর আগে ২০/২৫ জন কর্মচারী নিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও এখন তার প্রতিষ্ঠানে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। প্লাস্টিক দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও এখন বেঙ্গল নামে ব্যাংক, কেমিক্যাল, বস্ত্র, খাদ্যসহ নানা খাতের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। বেঙ্গল গ্রুপের বার্ষিক টার্ন ওভার প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকা। স্থানীয় বাজার ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রতিষ্ঠানটির উৎপাদিত নানা পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। চীন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ ৩০টি দেশে এ গ্রুপের পণ্য রপ্তানি হয়।

জসিম উদ্দিন বলেন, প্রতি বছর দেশের শ্রমবাজারে প্রায় ২০ লাখ লোক যোগ হচ্ছে। বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটে নতুন কর্মসংস্থান নেই বললেই চলে। দেশের ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগমুখী করতে হবে। দেশের ব্যবসায়ীরা বিনিয়োগে এলে বিদেশিরা আগ্রহী হয়। দেশ-বিদেশে বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করতে সরকার থেকে বিনিয়োগ উপযোগী পরিবেশের নিশ্চয়তা দিতে গুরুত্ব বাড়াতে হবে। 

ব্যবসায়ী এ নেতা বলেন, বাংলাদেশে শিল্পায়নের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। এখন চীনসহ বিশ্বের অনেক উন্নত দেশ থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ আসছে। এখন বিনিয়োগের সবচেয়ে বাধার একটি জ্বালানি সংকট ও মূল্য। প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা তো আছেই। বিরাজমান সমস্যার সমাধান না হলে দেশে নতুন কর্মসংস্থানসহ কারখানা গড়ে উঠবে না। তবে একদিনে এসব হবে না। সময় লাগবে। তবে আশার কথা বাংলাদেশ কিন্তু আগের চেয়ে ভালো অবস্থায় আছে। 

বর্তমান প্লাস্টিক পণ্যের বাজারের ৫৫ শতাংশের বেশি বেঙ্গল গ্রুপের এমন দাবি করে বেঙ্গল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ভাইস চেয়ারম্যান বলেন, বিশ্ববাজারে এ দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তৈরি প্লাস্টিকের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। পণ্য বৈচিত্র্যকরণে এ দেশের প্লাস্টিক শিল্প ভালো অবস্থানে রয়েছে। বেঙ্গল প্লাস্টিক থেকে সর্বদাই পণ্য বহুমুখীকরণের চেষ্টা করা হয়। বাড়িঘর, অফিস-আদালত সব জায়গার প্লাস্টিক পণ্য ব্যবহার করা হয়। 

প্লাস্টিক শিল্পকে ধ্বংস করতে নানামুখী ষড়যন্ত্র চলছে অভিযোগ করে জসিম উদ্দিন বলেন, বিশ্বব্যাপী যেখানে প্লাস্টিক পণ্যের ব্যবহার বেড়ে চলছে, সেখানে আমাদের দেশে কিছু মানুষ এ ব্যবসা বন্ধ করার দাবি করে থাকেন। এটা আসলে ষড়যন্ত্র। প্লাস্টিকপণ্য আধুনিক পদ্ধতিতে তৈরি করলে মানুষের ও পরিবেশের কোনো ক্ষতি হয় না। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তার প্রমাণ মিলেছে। আমেরিকায় প্লাস্টিকের ব্যবহার প্রতিজনে ১৩০ কেজি, সিঙ্গাপুরে ৫০ কেজি। সেখানে বাংলাদেশে তিন কেজি। প্লাস্টিকের ব্যবহার বন্ধ না করে বরং তা আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া উচিত বলে মনে করেন ব্যবসায়ী এই নেতা।

এফবিসিসিআইয়ের এ নেতা বলেন, পোশাক, পাট, খাদ্যদ্রব্যসহ বিভিন্ন খাতে রয়েছে বেঙ্গল গ্রুপের বিচরণ। গুণগত মানের কারণে এ দেশের পাটের চাহিদা থাকলেও পণ্য বৈচিত্র্যকরণে এ দেশের পাট শিল্প পিছিয়ে পড়ছে। বড় অঙ্কের পাটের বস্তা অবিক্রীত পড়ে থাকে। এর মূল কারণ পণ্যে বৈচিত্র্যকরণ নেই। বহু পুরনো পাটের বস্তা এখন আর বিশ্ববাজার চায় না। দেশের মধ্যেও পাটের ব্যাগ বা বস্তা বিক্রি কমে গিয়েছে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আর বিক্রিই হবে না। আইন করা হয়েছে মোড়কীকরণে পাটপণ্য ব্যবহারে। কিন্তু আইন মানছে কই? আইন করে একটি পণ্য বাজারজাত করা সম্ভব নয়। এটা রুচি ও পছন্দের ওপর নির্ভরশীল। ভোক্তার কাছে আকর্ষণীয় করে পাটজাতপণ্য উৎপাদনে মনোযোগী হতে হবে।

জসিম উদ্দিন বলেন, স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক বাজারে বেঙ্গল গ্রুপ বিস্কুটসহ নানা জাতীয় খাদ্যদ্রব্য বিক্রি করছে। এসব পণ্যের চাহিদা বাড়ছে। দেশীয় প্রতিষ্ঠানের প্রস্তুত করা খাদ্যপণ্যের চেয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের তৈরি করা খাবারের মান ভালো এটা সব সময় ঠিক না। এখন আন্তর্জাতিক বাজারে উৎপাদিত পণ্যের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই আমাদের টিকে থাকতে হচ্ছে।

অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারান। বড় ভাই তরুণ মোর্শেদ আলম সংসারের হাল ধরেন। শুরু হয় জীবনযুদ্ধ। নোয়াখালী থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাস করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। সেখান থেকেই অনার্স ও মাস্টার্স শেষ করেন। বাবা নির্মাণ ব্যবসায়ী ছিলেন। কিন্তু বড় ভাই প্লাস্টিকের ব্যবসা শুরু করেন। ১৯৮৪ সালে অনার্সের ছাত্র থাকাকালীন জসিম উদ্দিনের বড় ভাই মোর্শেদ আলমের ব্যবসায় যোগ দেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত